অতিমুনাফার লোভ ছাড়তে হবে…মো. স্বপন হোসেন

পোশাকশিল্পে শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি মানবিক ও যুগোপযোগী করতেমজুরি বোর্ডের শ্রমিকদের আট হাজার ১১৪ টাকা দাবির বিপরীতে ৬০০ টাকা বাড়িয়ে তিন হাজার ৬০০ টাকা করার প্রস্তাব দিয়েছে মালিকপক্ষ। এ বিষয়ে একজন মালিক ও একজন শ্রমিকের অবস্থান তুলে ধরা হলো। বাংলাদেশের মতো এত সস্তা শ্রম আর কোথাও নেই। আমাদের মালিকদের মধ্যে রাতারাতি বড় লোক হওয়ার অভ্যাস তৈরি হয়েছে। এ জন্য মুনাফার অঙ্কটা কমাতে তাঁরা কোনোভাবে রাজি নন। তাঁদের মধ্যে মানবতা, দেশপ্রেম ও শিল্পপ্রেম—সবকিছুরই অভাব রয়েছে। মিথ্যা ও বানোয়াট তথ্য হাজির করে এবং সরকারের ওপর বিভিন্নভাবে চাপ সৃষ্টি করে তাঁরা সরকারকে দিয়ে মজুরি কমিয়ে রাখতে পারছেন, আবার জনগণকেও ভুল বোঝাচ্ছেন। বায়াররা কম টাকা দেয় বলে প্রচার করে মালিকেরা জনগণকে ভুল বোঝান। আজকে শ্রমিকেরা ন্যূনতম মজুরি আট হাজার টাকা, মাতৃত্বকালীন ছুটি ছয় মাস এবং ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার দাবি করছেন। এগুলো দয়ার দাবি নয়, শ্রমিকের শ্রমের প্রতিদান। আমি মরিশাসে শ্রমিকের কাজ করতাম, সেখানকার অবস্থা আমাদের থেকে অনেক ভালো। মালিকেরাই আগ্রহ করে সেখানে শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন করতে শেখান। মজুরিও বাংলাদেশের থেকে অনেক ভালো। তাঁরা শুধু সেলাইয়ের কাজ করেন না, কাপড়, বোতাম, লেবেল ইত্যাদি সহায়ক কাঁচামালের শিল্পও তৈরি করেছেন। মরিশাস গরিব দেশ হয়েও যদি পারে, তাহলে আমাদের মালিকেরা পারবেন না কেন?

আমি ১৩-১৪ বছর বয়সে পোশাক কারখানায় কাজ নিই। তখন বেতন পেতাম মাসে ৩৫০ টাকা। তখন বস্তির একটা ঘর ৫০ টাকায় ভাড়া মিলত, চালের কেজি ছিল ১০ টাকার মতো। এখন বস্তির ৫ ফুট বাই ৮ ফুট যে ঘরে থাকি, তার ভাড়া তিন হাজার ৫০০ টাকা, চালের কেজি ৫০ টাকা। ঘরভাড়া ১০ গুণ বাড়লেও বেতন তো বেশি বাড়েনি। সরকার বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ করে না, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করে না, শুধু নিয়ন্ত্রণ করে শ্রমিকের মজুরি। এটা কি মানুষের জীবন? প্রতিবাদ করলে চাকরি চলে যায়। তার ওপর আছে ভয়ভীতি ও মাস্তানদের সন্ত্রাস।
গত ১৭ জুলাই সংসদে শ্রম আইন পাস করে সরকার, বিজিএমইএ অভিনন্দন জানায়। ৪০ লাখ শ্রমিকের মতামত না নিয়েই সরকার মালিকের পক্ষে আইন পাস করে দিল! সরকার কি মাত্র তিন হাজার মালিকের প্রতিনিধিত্ব করে? এই ৪০ লাখ লোকের সঙ্গে তাঁদের পরিবারে আরও তিনজন করে যোগ করলে সোয়া এক কোটি মানুষ। এত মানুষকে না দেখে তিন হাজার মালিককে দেখে যে সরকার, তারা জনগণের সরকার হয় কী করে?
মালিকদের রাতারাতি বড় লোক হওয়ার স্বপ্ন আমাদের জন্য দুঃস্বপ্ন। ভারতের অনেক বড় প্রতিষ্ঠানও শ্রমিকদের শোষণ করে, কিন্তু তাদের দেশপ্রেম আছে। আমাদের মালিকেরা স্বয়ংসম্পূর্ণ শিল্প করার চেষ্টা করেন না। তাঁরা শুধু সেলাই কাজ করাতে চান আমাদের দিয়ে। এতে শ্রমিকদের দক্ষতার বিকাশ হয় না। পোশাকশিল্পের সহায়ক টেক্সটাইল, লেবেল, বোতাম ইত্যাদি তৈরির শিল্প হলে পোশাক খাত স্বয়ংসম্পূর্ণ হতো। উৎপাদন খরচও কমত। আরও শ্রমিক কাজ পেতেন। শ্রমিকের বেতন বাড়লে, সেই বাড়তি টাকা তাঁরা বাজারে খরচ করতেন। এতে পণ্যের চাহিদা বাড়ত। তাতে করে দেশীয় শিল্প শক্তিশালী হতো। শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি ছাড়া বাংলাদেশের পক্ষে শিল্পে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়া সম্ভব নয়, দেশকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়।
ঢাকার মোহাম্মদপুরে আমি যেখানে কাজ করতাম, সেখানে দেড় হাজার লোকের জন্য ৫০ জন বসার ক্যানটিন। সেখানে সিঁড়িতে কার্টন রাখত। আমার ভয় হতো। আমি স্যাম্পলম্যান, যখন আন্ডারগ্রাউন্ডে মাল আনতে যেতাম, তখন আমার রানা প্লাজার কথা মনে হতো। ভয় পেতাম। বিকল্প সিঁড়ি ও দরজা যখন বন্ধ থাকে, তখন মনে হয় মৃত্যুকূপে বসে আছি। প্রতিবাদ করি বলে গত ৩১ আগস্ট তারা আমাকে প্রাপ্য সুবিধা না দিয়েই বরখাস্ত করে।
অনেক পোশাকশিল্পে এখনো শিশুশ্রমিক আছে। তাদের অসহায় ও অসচেতন করে রাখায় তারা সব সময় দাবি জানাতে পারে না। তারা বলে না, বলে না, যখন বাধ্য হয় তখন ফেটে পড়ে। দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে শ্রমিকেরা বিদ্রোহ করেন। আন্দোলন করারও পদ্ধতি আছে, সে জন্য ট্রেড ইউনিয়ন করতে দিতে হবে। আমরা সচেতন নই বলে, আমাদের সঙ্গে রাজনীতিবিদেরা না থাকায় শ্রমিকদের ইচ্ছেমতো ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে। শ্রমিকের সন্তানেরা পড়ালেখা করতে পারে না, তাদের ভাড়া করে জনসভায় নেওয়া হয়, মারামারিতে ব্যবহার করা হয়, তারা মারা যায়। শ্রমিকেরা যেখানে নিজের অধিকারই প্রতিষ্ঠা করতে পারেন না, তাঁদের জাতীয় রাজনীতি নিয়ে মাতিয়ে রাখা পরিহাস। জাতীয় রাজনীতি তো শ্রমিকের রাজনীতি নয়।
আমরা বস্তিতে থাকি। সেখানে আমাদের মেয়েরা নিরাপদ নয়। আমাদের ছেলেদের মাফিয়ারা বাধ্য করে মাদক ব্যবসা করতে। আমরা এভাবে বাঁচব কীভাবে? শ্রমিক না বাঁচলে, তাঁদের স্বার্থ রক্ষা করা না হলে পোশাকশিল্পও তো টিকবে না।
মো. স্বপন হোসেন: পোশাকশ্রমিক, স্যাম্পলম্যান।