গার্মেন্ট শ্রমিক বিক্ষোভে উত্তাল গাজীপুর

অবরোধ, সংঘর্ষ-গুলি দুই কারখানায় আগুন

ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধিসহ কয়েক দফা দাবিতে পোশাক শ্রমিকরা গত-কাল রবিবার গাজী-পুরের টঙ্গী, কালিয়া-কৈর, কোনাবাড়ী, ভোগড়া ও হোতাপাড়ায় বিক্ষোভ, ভাঙচুর, মহা-সড়ক অবরোধ করে। টঙ্গীতে পুলিশের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ হয়। এতে ওসিসহ শতাধিক আহত হয়েছে। পুলিশ শতাধিক রাউন্ড গুলি ও টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। শ্রমিকরা কোনাবাড়ীর যমুনা ডেনিমস ও নগরের সাইনবোর্ড এলাকার এলিট গার্মেন্ট কারখানায় আগুন ধরিয়ে বিক্ষোভ করে। এ ছাড়া কালিয়াকৈরে সংঘর্ষে পুলিশসহ ৩০ জন আহত হয়েছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ন্যূনতম মজুরি আট হাজার টাকা করার দাবিতে সকালে গাজীপুরের হোতাপাড়ার গিভেন্সি গ্রুপের শ্রমিকরা প্রথমে বিক্ষোভ শুরু করে। পরে মহানগরের ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট-সংলগ্ন তিন সড়ক এলাকার ইন্টারমেক্স গ্রুপ, স্প্যারো অ্যাপারেল, এএসটি নিটওয়্যার লিমিটেড বাইপেড সোয়েটার ও ইন্টার্ন ক্রাফট সোয়েটার কারখানার শ্রমিকরা কর্মবিরতি শুরু করে। একপর্যায়ে তারা কারখানার কাচ ভাঙচুর এবং নিরাপত্তাকর্মীদের মারধর করে। পরে তারা ঢাকা-ময়মনসিংহ, ঢাকা-জয়দেবপুর ও ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করে বেশ কিছু গাড়ি ভাঙচুর করে। পুলিশ লাঠিপেটা করে তাদের মহাসড়ক থেকে সরিয়ে দিলে যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক হয়। ভাঙচুর ও ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে ওই এলাকার অধিকাংশ পোশাক কারখানায় গতকাল ছুটি ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ।
এদিকে সকাল ১১টার দিকে একই দাবিতে টঙ্গীর বিভিন্ন গার্মেন্টের শ্রমিকরা ভাঙচুর ও সড়ক অবরোধ করে আগুন ধরিয়ে বিক্ষোভ শুরু করে। বিসিক এলাকার উইন্ডো গ্রুপ ও জাবের অ্যান্ড যোবায়ের কারখানার শ্রমিকরা প্রথমে এক হয়ে মিছিল বের করে। পরে অনন্ত, শিশির, হামিদ টেক্সটাইলের শ্রমিকরা তাদের সঙ্গে যোগ দেয়। এ সময় হাজার হাজার শ্রমিক এক হয়ে আশপাশের বিভিন্ন গার্মেন্টে ভাঙচুর শুরু করে। একপর্যায়ে তারা বিসিক অবরোধ করে। টঙ্গী থানা ও শিল্প পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে অবরোধ তুলে নেওয়ার অনুরোধ করে। কিন্তু শ্রমিকরা অবরোধ তুলে না নেওয়ায় পুলিশ লাঠিপেটা শুরু করে। এতে শ্রমিকরা উত্তেজিত হয়ে পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করতে থাকে। এ সময় পুলিশ পরিস্থিতি শান্ত করতে শতাধিক রাউন্ড টিয়ার শেল ও শটগানের ফাঁকা গুলি ছোড়ে। পুলিশ-শ্রমিক ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষে টঙ্গী থানার ওসি আবুল কালাম আজাদসহ শতাধিক ব্যক্তি আহত হয়। বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে আবারও টঙ্গীবাজার এলাকার সেনাকল্যাণ ভবনের সামনের থ্রি স্টার কারখানার শ্রমিকরা ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করে। এ সময় সেনাকল্যাণ ভবনের এভা গ্রুপের শ্রমিকরাও তাদের সঙ্গে যোগ দেয়। পরে পুলিশ শ্রমিকদের মহাসড়ক থেকে সরিয়ে দিলে যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক হয়।
দুপুর ১২টার দিকে গাজীপুর শহরের কোনাবাড়ী এলাকায় যমুনা ডেনিমস কারখানায় আগুন ধরিয়ে দেয় শ্রমিকরা। এ সময় তারা ব্যাপক ভাঙচুর চালায়। পুলিশ জানায়, লাঠিসোঁটা সহকারে মিছিল নিয়ে এসে বহিরাগত শ্রমিকরা ওই কারখানায় হামলা চালায়। তারা কারখানার বাউন্ডারি ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে ফেব্রিকস স্টোরে আগুন ধরিয়ে দেয়। পরে কারখানার অগ্নিনির্বাপণের কর্মীরা আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করেন। খবর পেয়ে কালিয়াকৈর ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে এসে আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনেন।
সন্ধ্যায় গাজীপুর নগরের সাইনবোর্ড এলাকায় এলিট গার্মেন্টের কর্মীরা বিক্ষোভ শুরু করে। তারা কারখানায় ব্যাপক ভাঙচুর চালায়। একপর্যায়ে নিরাপত্তারক্ষী ও অভ্যর্থনা কক্ষে আগুন ধরিয়ে দেয়। কারখানায় থাকায় একটি পিকআপ ভ্যান, একটি মাইক্রোবাস, একটি প্রাইভেট কার, পাঁচটি মোটরসাইকেল ও ১৫টি বাইসাইকেলে আগুন দেওয়া হয়। গাজীপুর ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা যাওয়ার আগেই গাড়িগুলো পুড়ে যায়। এ সময় ১১ জনকে আটক করা হয়।
জয়দেবপুর থানার ওসি কামরুজ্জামান জানান, আটককৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
এদিকে একই দাবিতে দ্বিতীয় দিনের মতো গতকাল সকালে কালিয়াকৈরের পল্লীবিদ্যুৎ এলাকার ডিবাইন, ইন্টারস্টফসহ শ্রমিকরা সকালে কাজে যোগ না দিয়ে কারখানার সামনে বিক্ষোভ শুরু করে। এ সময় ছয়-সাতটি কারখানার সহস্রাধিক শ্রমিক ওই এলাকার ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করে। একপর্যায়ে তারা সড়কে থাকা ১৫-২০টি যানবাহন ভাঙচুর ও সড়কের ওপর টায়ারে আগুন ধরিয়ে বিক্ষোভ করতে থাকে। এতে ওই মহাসড়কে সকাল ৮টা থেকে ১১টা পর্যন্ত যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। কালিয়াকৈর থানা ও গাজীপুর শিল্প পুলিশ সকাল ৯টার দিকে ঘটনাস্থলে গিয়ে শ্রমিকদের সড়ক থেকে সরানোর চেষ্টা করে। এ সময় শ্রমিকরা পুলিশে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করতে থাকে। পুলিশ তাদের লাঠিপেটা করলে সংঘর্ষ শুরু হয়। টিয়ার শেল ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে সকাল ১১টার দিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে পুলিশ।
পরে ছত্রভঙ্গ শ্রমিকরা লাটিসোঁটা সহকারে মিছিল নিয়ে চালু থাকা কারখানায় গিয়ে হামলা শুরু করে। তারা পল্লীবিদ্যুৎ এলাকার ইকোটেক্স ও ইউরোপা কারখানায় হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করে। পূর্ব চান্দরা এলাকার অ্যাপেক্সহোল্ডিং কারখানায় হামলার আগেই ওই কারখানায় ছুটি ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ। এ সময় ফেয়ারটেড কারখানায় কর্মরত শ্রমিকদের সঙ্গে আন্দোলনরত শ্রমিকদের সংঘর্ষ বাধে। দুই পক্ষের সংঘর্ষে ১৫ জন আহত হয়। পরে আন্দোলনরত শ্রমিকরা বোর্ডমিল এলাকার লিজ ফ্যাশন, মোয়াজুদ্দিন, অ্যাপেক্স ফুটওয়ার, স্টারলিংসহ ১০-১২টি কারখানায় ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে ভাঙচুর করে। পুলিশ বোর্ডমিল এলাকায় শ্রমিকদের ধাওয়া দিলে তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে সফিপুর এলাকায় মহাসড়কে অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করে। পুলিশের বাধায় তাদের সে চেষ্টা ব্যর্থ হয়। দুপুর ১২টার দিকে সড়কে যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক হলেও দুপুর দেড়টার দিকে উপজেলার মৌচাক তেলিরচালা এলাকার চার-পাঁচটি কারখানার শ্রমিকরা আবার ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করে যানবাহন ভাঙচুর করে। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করলে শ্রমিকদের সঙ্গে ফের সংঘর্ষ বাধে। সংঘর্ষে মৌচাক পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ আজারসহ অন্তত ১৫ জন আহত হয়। এদিকে শ্রমিকদের দফায় দফায় হামলার ঘটনায় ওই এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। আশপাশ এলাকার দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়। বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়। শ্রমিক অসন্তোষের ঘটনায় কালিয়াকৈরের সব কারখানায় গতকাল ছুটি ঘোষণা করা হয়।
কালিয়াকৈর থানার ওসি ওমর ফারুক বলেন, বেতন বৃদ্ধির দাবিতে শ্রমিকরা গতকাল মিছিল, ভাঙচুর ও মহাসড়ক অবরোধ করে। মহাসড়ক থেকে সরানোর চেষ্টা করলে শ্রমিকরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। পরে লাঠিপেটা, টিয়ার শেল ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করা হয়।