আইনপ্রণেতাদের উল্টো পথে যাত্রা…কামাল আহমেদ

রাষ্ট্র এবং সরকারের গোপনীয় তথ্য ফাঁস করার কারণে ভিনদেশি একজন এমপির বিচার করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের আদালত। আর তাতে ওই এমপির মৌলিক অধিকার, বিশেষত মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হয়েছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করে এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে এমপিদের আন্তর্জাতিক সংগঠন ইন্টার পার্লামেন্টারি ইউনিয়ন (আইপিইউ)। যুক্তরাষ্ট্রের যে গোপন তথ্য ফাঁসের মামলায় এই এমপি ফেঁসে গেছেন, সেটি হচ্ছে এই শতাব্দীর সবচেয়ে সাড়া জাগানো দুটি তথ্য ফাঁসের একটি—উইকিলিকস। অপরটি হচ্ছে দুনিয়াজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের নজরদারির বিষয়ে এডওয়ার্ড স্নোডেনের তথ্য ফাঁস। উইকিলিকসের জন্য অবশ্য বিশ্ববাসীর কাছে সবচেয়ে বেশি পরিচিতি পেয়েছেন দুজন—অস্ট্রেলীয় সাংবাদিক জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ এবং যুক্তরাষ্ট্রের মেরিনসেনা ব্রাডলি ম্যানিং। যে এমপির কথা দিয়ে লেখাটি শুরু করেছি তিনি হলেন আইসল্যান্ডের ব্রিজিটা জন্সদোত্তির। উইকিলিকসে ফাঁস হওয়া একটি ভিডিও তৈরির সঙ্গে তিনি জড়িত থাকায় যুক্তরাষ্ট্র তাঁর বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ নিয়েছে।
আইসল্যান্ডের এমপি ব্রিজিটা জন্সদোত্তির মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষে দাঁড়িয়েছে আইপিইউ। জেনেভায় ৯ অক্টোবর সমাপ্ত আইপিইউয়ের মানবাধিকারবিষয়ক কমিটির তিন দিনের বৈঠকে গৃহীত প্রস্তাবে আইপিইউ বলেছে, জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক আইনগত কাঠামোতে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমসহ ইলেকট্রনিক মাধ্যমে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, তথ্য জানার অধিকার এবং ডিজিটাল জগতে ব্যক্তির গোপনীয়তার ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত সুরক্ষার ব্যবস্থা নেই। অথচ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা একজন এমপির এবং গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি। আইসল্যান্ডের আইনে এমপি জন্সদোত্তির যে অধিকার রয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে তিনি সেই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।
এমপিদের বৈশ্বিক সংগঠন যখন ডিজিটাল জগতে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্যোগ এবং ঐক্য গড়ে তোলায় তৎপর, তখন বাংলাদেশের এমপিরা নির্দ্বিধায় ডিজিটাল জগতের জন্য একটি কালো আইন পাস করে ফেললেন। আইপিইউতে বাংলাদেশের সাংসদেরা নিয়মিত অংশ নেওয়ায় অভ্যস্ত হলেও বাকি বিশ্বের পার্লামেন্টারিয়ানরা যখন ডিজিটাল জগতে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষে দাঁড়িয়েছেন, তখন তাঁরা শুরু করলেন উল্টো দিকে হাঁটা। এই আইনটা পাস করার আগে আইপিইউ থেকে তাঁরা পদত্যাগ করলে অন্তত বলতে পারতেন যে তাঁরা তাঁদের বৈশ্বিক সংগঠনের ভাবনা বা আদর্শের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করেন। ক্ষমতালিপ্সু ও দাপুটে বর্তমান আমলাদের বুদ্ধি-পরামর্শ রাজনীতিতে নবাগত সাবেক আমলাদের প্রভাবিত করবে, সেটা স্বাভাবিক; কিন্তু সংসদের অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদেরা তা কীভাবে মেনে নেন, সেটা বোঝা দুষ্কর।
গত ৩০ সেপ্টেম্বর, লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব কমনওয়েলথ স্টাডিজের এক অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত আলোচক হিসেবে অংশ নিতে গিয়ে বাংলাদেশ-সম্পর্কিত অসংখ্য প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছি, যেগুলোর মধ্যে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা খর্ব হওয়ার বিষয়টিতে অনেকের উদ্বেগ ছিল লক্ষণীয়। কয়েকজন ব্লগারের গ্রেপ্তার এবং বিচার-প্রক্রিয়ায় উদ্বিগ্ন এসব বিদেশি পর্যবেক্ষকের উৎকণ্ঠায় যোগ হয়েছিল এই তথ্যপ্রযুক্তি আইন সংশোধনের প্রস্তাব। আইনটি পাস হওয়ার পর এসব বিদেশি বন্ধুর উদ্বেগ বাড়বে ছাড়া কমবে না।
কোনো রকম গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ছাড়াই সন্দেহভাজন যেকোনো ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের ক্ষমতা ও অধিকার পুলিশকে দিয়ে ৬ অক্টোবর জাতীয় সংসদে পাস হলো তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (সংশোধন) বিল, ২০১৩ (প্রথম আলো, ৬ অক্টোবর ২০১৩ [অনলাইন সংস্করণ])। যে এমপিরা পুলিশকে সন্দেহের বশে মামলা করার অধিকার দিয়ে দিয়েছেন, তাঁদের তখন সম্ভবত একবারের জন্যও মনে হয়নি যে সন্দেহবশত হাজার হাজার অজ্ঞাতনামাকে মামলায় আসামি করায় অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের পুলিশ। আগের আইনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমতি ছাড়া মামলা হতো না। আগের আইনে সব অপরাধ জামিনযোগ্য থাকলেও সংশোধনীতে বেশ কিছু অপরাধকে জামিন-অযোগ্য করা হয়েছে। সংশোধিত আইনে শাস্তির মেয়াদ বাড়িয়ে কমপক্ষে সাত এবং সর্বোচ্চ ১৪ বছর করা হয়েছে।
এই আইনের খসড়া নিয়ে নাগরিক সমাজ এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতের বিশেষজ্ঞ ও ব্যবহারকারীদের সঙ্গে সরকার বেশ কয়েক দফা মতবিনিময় করেছে বলে সংবাদমাধ্যমে খবর বেরিয়েছে। কিন্তু, দুর্ভাগ্যজনকভাবে ওসব স্বার্থসংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীর মতামত পুরোপুরি উপেক্ষিত হয়েছে। মনে হচ্ছে, জনমত যাচাইয়ের প্রক্রিয়াটির অপব্যবহারে সরকার বেশ সিদ্ধহস্ত হয়ে উঠেছে। গত এপ্রিলে জাতিসংঘ মানবাধিকার সংস্থায় অনুষ্ঠিত ত্রিবার্ষিক পরিবীক্ষণ বা ইউনিভার্সাল পিরিয়ডিক রিভিউয়ের (ইউপিআর) ক্ষেত্রেও আমরা এমনটিই দেখেছি। যে কারণে বাংলাদেশের মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সবাই ইউপিআরের পর এক যৌথ বিবৃতিতে সরকারের বিরুদ্ধে জাতিসংঘে অসত্য তথ্য দেওয়ার অভিযোগ করেছিল।
জাতীয় সংসদে আইনটি পাস হওয়ার এক দিন পর জানা গেল, এই নতুন আইনে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপকের বিরুদ্ধে এই আইনে মামলা হয়েছে। বিএনপি-জামায়াত ঘরানার বলে পরিচিত এই অধ্যাপকের বিরুদ্ধে অবশ্য পুলিশ মামলা করেনি, মামলা করেছেন ক্ষমতাসীন দলের সমর্থক এক ব্যক্তি এবং আদালত অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন বলে ফেসবুকে খবর রটেছে। প্রধানমন্ত্রী এবং রাজনীতিতে তাঁর সম্ভাব্য উত্তরাধিকারী ছেলে ও মেয়ের বিরুদ্ধে কথিত অবমাননাকর মন্তব্যের জন্য এই মামলা। রাজনীতিকেরা তাঁদের নীতি ও কাজের জন্য যেমন প্রশংসা প্রত্যাশা করেন, তেমনি ক্ষুব্ধ সমালোচকদের গালি বা নিন্দাটাও অপ্রত্যাশিত নয়। সম্ভবত সে কারণেই বলা হয়, রাজনীতিকদের গায়ে থাকে গন্ডারের চামড়া। এ ক্ষেত্রে পরিবারকে টেনে আনা সমর্থনযোগ্য না হলেও বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তরাধিকারের ধারা যেসব পরিবারে চালু রয়েছে, সেসব পরিবারের সদস্যদের প্রতিপক্ষের বাক্যবাণের শিকার হওয়ার ঝুঁকি কিছুটা থাকবেই। সাইবার জগতে নেতা-নেত্রীদের মানরক্ষায় হয়রান যেসব ভক্ত যখন-তখন প্রতিপক্ষকে আদালতে টেনে নিয়ে যান, তাঁরা যদি দুনিয়ার একটু খোঁজখবর করতেন, তাহলে হয়তো এতটা আদালতমুখী হতেন না।
বাংলাদেশে যেদিন তথ্যপ্রযুক্তি সংশোধনী আইন, ২০১৩ পাস হলো, তার পরের দিন ৭ অক্টোবর ব্রিটেনে প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রিসভায় এবং বিরোধী নেতা তাঁর ছায়া মন্ত্রিসভায় রদবদল ঘটান। কিছুক্ষণ পর পর প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরনের একেকটি টুইটে এসব পরিবর্তনের ঘোষণা আসছিল প্রায় সারা দিন ধরে। সুতরাং, সেদিকে স্বাভাবিকভাবেই আমার আগ্রহ ছিল। তবে বাংলাদেশের নতুন আইনের কারণে কৌতূহলটা আরেকটু বাড়ল। আমি দেখতে চাইলাম, প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন কিংবা বিরোধী নেতা এড মিলিব্যান্ডের টুইটার অ্যাকাউন্টে কেউ কোনো ধরনের আপত্তিকর মন্তব্য করছেন কি না। তাঁদের টুইটের নিচে সংলাপের (কনভারসেশন) ট্যাবটা চেপে দেখা গেল অসংখ্য শালীন-অশালীন সমালোচনা। সে জন্য অবশ্য তাঁদের কোনো ভক্ত ওই সমালোচকদের তাড়িয়ে ভাগিয়েছেন এমন কোনো খবর কোথাও চোখে পড়ল না। তাই বলে কেউ যদি এই মাধ্যমে হত্যা বা অপহরণের হুমকি দেওয়ার মতো কোনো অপরাধ করে, সেই অপরাধ উপেক্ষা করার কারণ নেই। ব্রিটেনে এ বছরেই একাধিক নারী সাংবাদিককে টুইটারে ধর্ষণের হুমকির ঘটনায় পুলিশ কিন্তু নিশ্চুপ থাকেনি। সাধারণ ফৌজদারি আইনেই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এ জন্য তাদের কোনো কালাকানুনের প্রয়োজন হয়নি। সাইবার জগতে প্রত্যেকের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা যাতে লঙ্ঘিত না হয়, সেটা নিশ্চিত করতে তথ্যপ্রযুক্তি আইনের যে প্রয়োজন রয়েছে, সেটা কেউই অস্বীকার করবে না। কিন্তু সেখানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা খর্ব করার সব ব্যবস্থা পাকাপাকি হবে, এটা কোনোভাবেই সমর্থন করা যায় না।
নতুন আইনের প্রতিক্রিয়ায় ফেসবুকের মতো সামাজিক যোগাযোগ নেটওয়ার্কের প্ল্যাটফর্মগুলোতে তিন ধরনের পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। সরকার-সমর্থকদের একটি অংশ উৎফুল্ল হয়েছে এই ভেবে যে যাক, সমালোচকদের মুখ বন্ধ করা গেছে। আরেকটি দল সাবধানতার পথ নিয়েছে। তবে, তৃতীয় আরেকটি পক্ষ সরকারের ত্রুটিগুলো বেশি করে প্রচারের লক্ষ্যে সেগুলোকে নানা কৌশলে আলোচনায় জিইয়ে রাখছে। ‘আমি বলছি না উনি মিথ্য বলায় অভ্যস্ত’ ধরনের কথা বলে এই তৃতীয় পক্ষটি সরকারের খুঁত ধরছে। সেদিনই চোখে পড়ল ফেলানী রোড, গুলশান ছদ্মনামের একজনের ফেসবুক স্ট্যাটাস, যাতে লেখা ছিল ‘ফেলানী ইস্যু চুলায় যাক, বন্ধুরাষ্ট্র স্বস্তি পাক’। কঠোর নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও সরকারের সমালোচনা এবং সরকারবিরোধী কার্যক্রম যে চালানো যায়, তার স্মৃতি আওয়ামী লীগ নিশ্চয়ই ভুলে যায়নি। বর্তমানে তাদের ক্ষমতার ভাগীদার সাবেক স্বৈরশাসক এরশাদের সামরিক শাসনামলে নিষিদ্ধ শব্দ ‘হরতাল’-এর প্রতিশব্দ হয়েছিল ‘কর্মসূচি’। সাইবার জগতেও যে সে রকম বিকল্প উদ্ভাবিত হবে, তাতে সন্দেহ নেই। তবে, যে কালাকানুনটি ক্ষমতাসীন দল করে গেল, তার জন্য ভবিষ্যতে হয়তো তাদেরই এর মাশুল দিতে হবে। বাংলাদেশে স্থান-কাল-পাত্রভেদে আইন প্রয়োগে যে ভিন্নতা আছে, সেই কথা ক্ষমতায় থাকাকালে রাজনীতিকেরা যতটা বিস্মৃত হন, তার জ্বালা ঠিক ততটাই টের পান যখন তাঁরা ক্ষমতা হারান।
কামাল আহমেদ: প্রথম আলোর বিশেষ প্রতিনিধি, লন্ডন।