আওয়ামী লীগকে হারানো অসম্ভব?…আসিফ নজরুল

প্রধানমন্ত্রীপুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় বলেছেন, আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে হারানো অসম্ভব। তবে এ জন্য তিনি দুটো শর্তের কথা বলেছেন। এক: আওয়ামী লীগের ভোটার এবং সমর্থকদের এগিয়ে আসতে হবে। দুই: আওয়ামী লীগকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।
জয় বাংলাদেশে এসেছেন আওয়ামী লীগের সমর্থকদের উজ্জীবিত করার জন্য। এই উজ্জীবনের প্রয়োজন ছিল। পর পর পাঁচটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে, বিশেষ করে গাজীপুরে পরাজয়ের পর দলটির মনোবল ভেঙে পড়েছিল। গোপালগঞ্জের পর দেশে আওয়ামী লীগের সবচেয়ে বড় ঘাঁটি ছিল গাজীপুর। এই নির্বাচনে স্বয়ং দলটির সভানেত্রীসহ বহু কেন্দ্রীয় নেতা এবং প্রায় অর্ধশত সাংসদ দলের প্রার্থীর হয়ে নানাভাবে প্রচারাভিযান চালান। তবু আওয়ামী লীগের প্রার্থী সেখানে বিপুল ভোটে পরাজয় বরণ করেন। দলের কয়েকজন নেতা এরপর প্রকাশ্যে তাঁদের হতাশা প্রকাশ করেন। আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তায় ধস নেমেছে—এমন একটি ধারণা দেশে ও বিদেশে আরও সোচ্চার হয়ে ওঠে।
জয়ের আগমন এসব পরাজয়ের অল্প দিন পরে। তিনি সুদর্শন, শিক্ষিত এবং সবচেয়ে যা উল্লেখযোগ্য, তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অনুমিত উত্তরসূরি। দলকে ঘুরে দাঁড় করানোর মরিয়া প্রচেষ্টা হিসেবে হয়তো সে কারণে আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকেরা তাঁর শরণাপন্ন হয়েছেন। তবে তাঁর বিভিন্ন বক্তব্যে দল কতটা উপকৃত হচ্ছে বা কর্মীরা কতটা উজ্জীবিত হচ্ছেন, তা নিয়ে নানা প্রশ্ন তোলার অবকাশ রয়েছে। আওয়ামী লীগকে হারানো অসম্ভব বলে তিনি যে তত্ত্ব দিয়েছেন, তাতেও আশাবাদী হওয়ার যৌক্তিকতা নেই। কারণ, এ জন্য তিনি নিজে যে দুটো শর্তের কথা বলেছেন তা পূরণ করা সহজ নয়, হয়তো সম্ভবও নয়।

দুই
জয় আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংকের কথা বলেছেন। ১৯৯০ সালের পর বিভিন্ন নির্বাচনের ফলাফলের হিসেবে সাধারণভাবে ধরে নেওয়া হয় যে দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ আওয়ামী লীগ ও তার মিত্রদের ভোটার বা সমর্থক, ৪০ শতাংশ তার বিরোধী এবং কমবেশি ২০ শতাংশ সুইং ভোটার, যাঁরা প্রধানত সর্বশেষ সরকারের প্রতি ক্ষুব্ধ হয়ে বিরোধী দলকে ভোট প্রদান করেন। প্রশ্ন হচ্ছে, আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক যদি ৪০ শতাংশও হয়, এঁরা কি সবাই আওয়ামী লীগকে ভোট দিতে এগিয়ে আসবেন? নাকি তাঁদের একটি ক্ষুদ্র অংশ হলেও নানা কারণে বিরক্ত হয়ে ভোটদানে বিরত থাকবেন?
আওয়ামী লীগ সরকারের দলীয়করণ, দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের (যেমন শেয়ার মার্কেট দুর্নীতি বা ছাত্রলীগের সন্ত্রাস) শিকার এই ৪০ শতাংশের কেউ যদি হয়ে থাকেন, তাহলে আওয়ামী লীগকে তাঁদের ভোট দেওয়ার কথা নয়। বিএনপিকে ভোট না দিলেও এঁদের অনেকে আগামী নির্বাচনে ভোটদানে বিরত থাকতে পারেন। আবার আওয়ামী লীগ-সমর্থকদের মধ্যে যাঁরা ধর্মীয় বা ভারতনীতির কারণে বা গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতি অন্যায় আচরণে ক্ষুব্ধ হয়েছেন, তাঁদের অনেকেরও দলটির পক্ষে আগামী নির্বাচনে ভোটদানে আগ্রহী থাকার কথা নয়। এসব হতাশা বা ক্ষোভ ভুলে আওয়ামী লীগ সরকারের জঙ্গিবিরোধী ভূমিকা, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে সাফল্য এবং উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের কথা মনে রেখে এই ৪০ শতাংশ ভোটার ভোট দিলেও শুধু এঁদের ভোটে আগামী নির্বাচনে জিততে পারার কথা নয়।
আওয়ামী লীগের প্রয়োজন দেশের মধ্যপন্থী ২০ শতাংশ ভোটারের অন্তত সংখ্যাগরিষ্ঠের সমর্থন। এই সমর্থন বাংলাদেশের কোনো সরকার তার মেয়াদান্তে পায়নি, আওয়ামী লীগেরও পাওয়ার কথা নয়। সরকারের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড বা বিএনপির মৌলবাদপ্রীতির প্রচারণায় দেশ সয়লাব করে দিলেও তা সম্ভব নয়। ফিরিস্তি দেওয়ার মতো উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড সব সরকার করে থাকে, নির্বাচনের সময় এসব জোরেশোরে প্রচারও করা হয়, কিন্তু তাতে লাভ হয় না। মানুষ বরং অনেক বেশি করে মনে রাখে কুশাসনের নজিরগুলো এবং নিজের ব্যক্তিজীবনের ভোগান্তির কথা।
শেয়ারবাজার, হল-মার্ক, রেল বা পদ্মা সেতুর দুর্নীতি, পুলিশ ও ছাত্রলীগ-যুবলীগের তাণ্ডব, সাগর-রুনি ও বিশ্বজিতের হত্যা,
গুম-ক্রসফায়ার, বিভিন্ন ব্যবসা, চাকরি ও সুযোগ কুক্ষিগতকরণ, দ্রব্যমূল্য ও বিদ্যুতের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, বিরোধী দল, গণমাধ্যম ও ভিন্নমতের প্রতি চরম অসহিষ্ণুতা, সীমান্তে হত্যাকাণ্ড, তিস্তা চুক্তিসংক্রান্ত ব্যর্থতা, মন্ত্রী ও সরকারি দলের নেতাদের অসংযত বক্তব্যসহ বিভিন্ন কারণে মধ্যপন্থী ভোটারের বিশাল একটি অংশ সরকারের প্রতি যেভাবে রুষ্ট রয়েছে, তা আগামী মাস কয়েকের কোনো প্রচারণাতেই মুছে যাওয়ার কথা নয়। বরিশাল, রাজশাহী ও গাজীপুরে বহু উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড করার পরও আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের শোচনীয় পরাজয় এর একটি বড় প্রমাণ। জয় যে দ্বিতীয় শর্তের কথা বলেছেন, তা হচ্ছে আওয়ামী লীগের ঐক্য। আওয়ামী লীগ পুরোনো দল, এ দলের অন্তত সুবিধাভোগীরা জানেন, আগামী নির্বাচনে পরাজয়ের মানে কী হতে পারে তাঁদের জন্য। কিন্তু এই সুবিধাভোগী বা তাঁদের অনুসারীরা সংখ্যায় খুব বেশি নয়। এ ধরনের সুবিধাভোগীদের কাছে ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত সুবিধা দলের স্বার্থের চেয়ে বড় বলে বিবেচিত হয়। এক-এগারোর ঘটনার পর যাঁরা আওয়ামী লীগে নানাভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন, তাঁদের সঙ্গে এই সুবিধাভোগী অংশের দ্বন্দ্ব মেটানো সহজ হবে না। দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ সুউচ্চ নৈতিক মান বজায় রাখলে, দলের সাংগঠনিক তৎপরতা সচল থাকলে এবং দলের সকল স্তরে নিয়মিত নির্বাচিত প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থা থাকলে দলের ভেতর অনেক বিভেদ ম্লান করা সম্ভব হতো। শেষ সময়ে এখন তা করা প্রায় দুঃসাধ্য বিষয় হতে পারে।

তিন
আওয়ামী লীগ সভানেত্রী, সজীব ওয়াজেদ জয় এবং দলের আরও কেউ কেউ বলে থাকেন যে আওয়ামী লীগ বিভিন্ন নির্বাচনে হেরেছে অপপ্রচারের কারণে। এটি কিছুটা হলেও সত্যি হতে পারে। তবে এই অপপ্রচারের অনেকাংশ আসলে যুক্তিসংগত সমালোচনা (যেমন: দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের ঘটনাগুলো), কিছু অংশ হয়তো কেবলই অপপ্রচার (যেমন: হেফাজতের সমাবেশে হামলায় নিহতের সংখ্যা)। আর এ ধরনের অপপ্রচার বাংলাদেশসহ তৃতীয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সরকার এবং তার বিরোধী পক্ষ—উভয়ের ক্ষেত্রেই হয়ে থাকে। পার্থক্য হচ্ছে, এমন অপপ্রচারে বিরোধী দল যতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, দেশ পরিচালনায় ক্ষুব্ধ মানুষের কারণে তার চেয়ে অনেক বেশি হয় সরকারি দল।
সরকারি দলের জন্য এসব প্রতিকূলতা নতুন বা ব্যতিক্রমী কিছু নয়। অনুন্নত গণতন্ত্রে সব সরকারকেই এসব প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়। আর তাই এসব দেশে সুষ্ঠু নির্বাচন হলে সরকারি দল জিতে এসেছে—এই নজির খুবই বিরল। বাংলাদেশেও ১৯৯০ সালে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর থেকে কোনো সরকারি দল নির্বাচনে জিততে পারেনি। কিন্তু সেটি কিছুটা কেবল অপপ্রচারের কারণে। প্রধানত কুশাসনের ফল হিসেবেই তারা পরাজিত হয়।
নির্বাচনে জেতার জন্য প্রয়োজন সুশাসন, মানবাধিকার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা। ১৯৯০ সালের পর প্রতিটি সরকারের আমলে জিডিপি, রপ্তানি-আয়, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং জীবনযাত্রার মান কমবেশি বেড়েছে, সামাজিক উন্নয়ন সূচকগুলোতে অগ্রগতি হয়েছে এবং অবকাঠামো উন্নয়ন ঘটেছে। সজীব ওয়াজেদ জয় এ ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ আমলের বাড়তি সাফল্যের যে কথা বলছেন, তা কিছু ক্ষেত্রে সঠিকও নয়। যেমন তিনি বলেছেন, বর্তমান সরকারের আমলে বাংলাদেশ অর্থনীতির ক্ষেত্রে আগুয়ান শক্তির মর্যাদা পেয়েছে। কিন্তু পৃথিবীর ১১টি নতুন এমার্জিং টাইগারের একটি দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা হয় আসলে ২০০৫ সাল থেকে, যখন দেশে ক্ষমতায় ছিল বিএনপি সরকার।
গ্লোবাল ইকোনমিকস পেপার ১৫৩ অনুসারে, এই ১১টি দেশ ছিল বাংলাদেশ, মিসর, ইন্দোনেশিয়া, ইরান, কোরিয়া, মেক্সিকো, নাইজেরিয়া, পাকিস্তান, ফিলিপাইন, তুরস্ক ও ভিয়েতনাম। এর মধ্যে আবার তুলনামূলকভাবে কম সম্ভাবনাময় দেশ হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল যে তিনটি দেশ, তার একটি ছিল বাংলাদেশ (অপর দুটো নাইজেরিয়া ও পাকিস্তান)। বাংলাদেশের প্রত্যাশিত উন্নয়নের একটি বড় শর্ত হিসেবে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার কথা বলা হয়েছিল, যা ২০০৫ সালের পর থেকে রক্ষার তেমন কোনো প্রচেষ্টা দেশে লক্ষ করা যায়নি। অযৌক্তিক ও একতরফাভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে আওয়ামী লীগ দেশকে বরং গভীরতর অনিশ্চয়তা ও সংঘাতের দিকে ঠেলে দিয়েছে।

চার
সার্বিক বিচারে সুষ্ঠু নির্বাচন হলে বরং আওয়ামী লীগকে জিতিয়ে আনা অসম্ভব মনে হতে পারে। তবে এমন একটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পরাজিত হলে তাতে বিরোধী দলের কৃতিত্ব আছে তা বলা যাবে না। বিরোধী দল এমন কোনো আশাবাদ দেশে সৃষ্টি করতে পারেনি, যার কারণে তাকে মানুষ নির্বাচিত করতে উদ্গ্রীব হয়ে যাবে। মানুষ এ দেশে বিরোধী দলকে ভোট দেয় সরকারি দলের কুশাসনে ক্ষিপ্ত হয়ে তাদের শিক্ষা দেওয়ার জন্য। এবারও তা-ই হওয়ার কথা।
বাংলাদেশে সরকারি দলগুলোর পরাজয় তাই হয়ে ওঠে আত্মঘাতী পরাজয়। নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে ক্ষমতায় এসে আত্মঘাতী প্রবণতার (স্বেচ্ছাচার, চরম অসহিষ্ণুতা, অবাধ দুর্নীতি, সন্ত্রাস) বলি হয়েছে উপমহাদেশের সব সরকার। তুলনায় কিছু ক্ষেত্রে বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের আত্মঘাতী প্রবণতা আরও ব্যাপক। আওয়ামী লীগের কোনো প্রয়োজন ছিল না গ্রামীণ ব্যাংক ও ড. ইউনূসকে অপদস্থ করার, শেয়ার মার্কেট ও রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক লুটপাটকারীদের রক্ষা করার, জননিন্দিত আবুল হোসেনকে দেশপ্রেমিক আখ্যায়িত করার, দেশে জামায়াতবিরোধী ইসলামি দলগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বৈরী করার, আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে শীতল আচরণ করার। আওয়ামী লীগের কোনো লাভ হয়নি সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের প্রতি অবিরাম কুৎসা রটনা করে বা দলের চৌকস নেতাদের দূরে ঠেলে নব্য আওয়ামী লীগপ্রেমী বা আনাড়ি নেতাদের ক্ষমতায়িত করে।
আওয়ামী লীগকে ঘুরে দাঁড়াতে হবে আত্মপ্রচারে শুধু নয়, আত্মসমালোচনার মাধ্যমেও। তাতে নির্বাচনে জয় না হোক, অন্তত মানুষের সম্মান ও আস্থা ফিরে আসবে অনেকাংশে।
আসিফ নজরুল: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।