আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নেই

নারায়ণগঞ্জ শহরে ছোট-বড় সব দলের কার্যক্রম থাকলেও আওয়ামী লীগের কোনো কার্যক্রম দেখা যায় না। নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সর্বশেষ সম্মেলন হয়েছিল ১৯৯৭ সালের ২০ ডিসেম্বর।১৬ বছর আগের ওই সম্মেলনে নাজমা রহমান সভাপতি ও শামীম ওসমান সাধারণ সম্পাদক হয়েছিলেন। এরপর আর দলটির সম্মেলন হয়নি। ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনে ভরাডুবির পর ২০০২ সালের ২৭ মার্চ নারায়ণগঞ্জ-৫ (সদর-বন্দর) আসনের সাবেক সাংসদ এস এম আকরামকে আহ্বায়ক করে কেন্দ্র থেকে ৬১ সদস্যের একটি আহ্বায়ক কমিটি করে দেওয়া হয়। এই কমিটি যখন দায়িত্ব নেয়, তখন পরিস্থিতি ছিল আওয়ামী লীগের জন্য প্রতিকূল। শামীম ওসমান তখন দেশ ছেড়ে পলাতক।পরে শামীম ওসমান ও নাজমা রহমানকে সদস্য করা হলে আহ্বায়ক কমিটির সদস্যসংখ্যা হয় ৬৩। ওই কমিটির ছয়জন ইতিমধ্যে মারা গেছেন। দলের আহ্বায়ক এস এম আকরাম পদত্যাগ করে যুক্ত হয়ে পড়েছেন নাগরিক ঐক্যের সঙ্গে। যুগ্ম আহ্বায়ক মফিজুল ইসলাম শারীরিক অসুস্থতার কারণে নিষ্ক্রিয়। আহ্বায়ক কমিটি ১২ বছর পার করলেও সম্মেলন করতে পারেনি।এরই মধ্যে নারায়ণগঞ্জ পৌরসভা সিটি করপোরেশনে উন্নীত হলেও ১১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আওয়ামী লীগ পরিচালিত হচ্ছিল বিগত হয়ে যাওয়া শহর কমিটি দিয়ে। ওই দিন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে স্বয়ং শেখ হাসিনা শহর কমিটির সাবেক সভাপতি আনোয়ার হোসেন ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক খোকন সাহাকে মহানগর কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দিয়ে এক সপ্তাহের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কমিটি করার নির্দেশনা দেন। তবে পূর্ণাঙ্গ কমিটি হয়নি, ঘোচেনি সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের দূরত্ব।গত সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আনোয়ার হোসেন ও খোকন সাহার মধ্যে দূরত্ব প্রকাশ্য হয়। আনোয়ার হোসেন ওই নির্বাচনে দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে দল-সমর্থিত প্রার্থী শামীমের বিরুদ্ধে গিয়ে আইভীর পক্ষে নির্বাচন করেন।দল ছাড়ার কারণ জানতে চাইলে এস এম আকরাম বলেন, ‘নারায়ণগঞ্জে আইভীর ভাবমূর্তি অনেক ভালো। কিন্তু সিটি করপোরেশন নির্বাচনে শামীমের মতো বিতর্কিত একজনকে দল সমর্থন দেয়। শামীমের পক্ষে নির্বাচন করতে কেন্দ্র থেকে অনেক নেতা এসেছিলেন, কিন্তু তাদের কেউ আমার সঙ্গে এ বিষয়ে আলাপ  করেননি। দলে গণতন্ত্রহীনতায় অত্যন্ত মর্মাহত হই এবং সিটি করপোরেশন নির্বাচন শেষে পদত্যাগ করি।’আহ্বায়ক কমিটিকে নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের দায়িত্ব দেওয়ার বছর খানেক পর ২০০৩ সালে তৎকালীন নারায়ণগঞ্জ পৌরসভা নির্বাচনে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত প্রার্থী হিসেবে সেলিনা হায়াৎ আইভী চেয়ারম্যান পদে বিজয়ী হন। ওই নির্বাচনকে কেন্দ্র করেই তখন সারা দেশে আওয়ামী লীগ প্রথম উল্লেখযোগ্য বিজয় পায়। পরে ২০০৮ সালের নির্বাচনে মহাজোট নারায়ণগঞ্জের পাঁচটি আসনেই বিজয়ী হয়।নারায়ণগঞ্জ-৫ (শহর-বন্দর) আসনের মনোনয়ন নিয়ে জেলা কমিটির আহ্বায়ক এস এম আকরামের সঙ্গে দলের দূরত্ব তৈরি হয়। ওই আসনে মহাজোটের শরিক জাতীয় পার্টির প্রার্থী হিসেবে বিজয়ী হন শামীমের বড় ভাই নাসিম ওসমান। আসনটিতে মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন জনাব আকরাম। শামীম ওসমান পলাতক অবস্থায় দেশের বাইরে থাকার কারণে নির্বাচন করতে পারেননি। নারায়ণগঞ্জ-৪ (ফতুল্লা) আসন থেকে চলচ্চিত্রাভিনেত্রী সারাহ্ বেগম কবরী নির্বাচন করে বিজয়ী হন।আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর দেশে ফিরে শামীম ওসমান আওয়ামী লীগকে নিজের পকেটে নেওয়ার চেষ্টা শুরু করেন। তত দিনে সাধারণ নেতা-কর্মীরা নারায়ণগঞ্জের সিটি মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভীকে কেন্দ্র করে নিজেদের অবস্থান তৈরি করে নিয়েছেন।

সিটি মেয়র আইভী অবশ্য উপদলীয় কোনো কোন্দলে যুক্ত থাকার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেন, দলে তাঁর তেমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ পদ নেই এবং পদ-পদবি পাওয়ার ব্যাপারে কোনো মোহও নেই। তিনি বলেন, ‘দলের নেতাদের কারও সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত বিরোধ নেই। তবে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও ভূমিদস্যুতা না করলে যাদের চলে না, তাদের সঙ্গে আমার নীতিগত বিরোধ রয়েছে।’

শামীম ওসমান দলে দ্বিধাবিভক্তির কথা স্বীকার করলেও এর জন্য তাঁর নিজের দায় অস্বীকার করেন। তাঁকে কোণঠাসা করার জন্য দলে কোন্দল জিইয়ে রাখা হচ্ছে বলেও মনে করেন তিনি।

সাংসদ কবরী বলেন, শামীম আওয়ামী লীগের জেলা কমিটির একজন সদস্য মাত্র। দলের কেন্দ্রীয় কমিটি কখনো বলেনি যে দলীয় নির্দেশনার জন্য শামীমের মতামত নিতে হবে। তার পরেও শামীম দলের ভেতরে কতিপয় অনুগত ব্যক্তির ওপর নির্ভর করে নিজেকে টিকিয়ে রেখেছেন এবং জনগণের কাছে নিজেকে প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় সভানেত্রীর একান্ত প্রিয়ভাজন হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

ত্বকী হত্যার পর ওসমান পরিবারের দিকে সন্দেহের তির বিদ্ধ হলে শামীম আওয়ামী লীগে তাঁর রাজনীতি স্থগিত করার কথিত ঘোষণা দিয়েছিলেন। পরে আবার ত্বকী হত্যা মামলার অন্যতম সন্দেহভাজন জহিরুল ইসলাম পারভেজ ওরফে ক্যাঙ্গারু পারভেজ নিখোঁজ হওয়ার পর তাঁকে ফিরিয়ে না দিলে আওয়ামী লীগ থেকে বিদায় নেওয়ার ঘোষণাও দিয়েছিলেন। ক্যাঙ্গারু পারভেজ জেলা যুবলীগের বহিষ্কৃত প্রচার, তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক। তিনি সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিত।

প্রথম আলোর সঙ্গে আলাপকালে শামীম ওসমান বলেছেন, বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায় এলে তাঁকে আবার আত্মগোপনে যেতে হবে।

এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে একাধিক দলীয় নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, দল ক্ষমতায় থাকলে যিনি নেতিবাচক কর্মকাণ্ড করে দলকে ক্ষতিগ্রস্ত করেন এবং অন্য দল ক্ষমতায় এলে পালিয়ে যেতে হয়, এমন নেতার পেছনে আওয়ামী লীগের মতো সংগঠন সময় নষ্ট করবে কেন? এই নেতারা দাবি করেন, কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা নানা ধরনের সুবিধার জন্য সব সময় শামীম ওসমানের পক্ষে কথা বলেন।

জানতে চাইলে ঢাকা বিভাগের দায়িত্বে থাকা আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আহম্মদ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, নারায়ণগঞ্জে আওয়ামী লীগের মহানগর কমিটি গঠিত হয়েছে এবং জেলা কমিটি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। শামীম ওসমান বর্তমান আহ্বায়ক কমিটির সদস্য। নারায়ণগঞ্জের আওয়ামী রাজনীতিতে তাঁর নিয়ামক একটি ভূমিকা আছে। যে কারণে বিএনপি জামায়াত তাঁকে টার্গেট করেছিল।

 

নারায়ণগঞ্জের রাজনীতি-১ : ওসমান পরিবারের রাজনীতি সংকটে

নারায়ণগঞ্জের রাজনীতি-২ : ওসমান-আতঙ্ক এখনো কাটেনি