আওয়ামী লীগের নেতারাও নির্বাচন নিয়ে অন্ধকারে

সংবিধান অনুসারে আগামী ২৫ অক্টোবর থেকে ২৪ জানুয়ারির মধ্যে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন হওয়ার কথা। কিন্তু নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থা নিয়ে সরকারি ও বিরোধী দলের বিপরীতমুখী অবস্থানের কারণে নির্বাচন নিয়ে নানা শঙ্কা ও সংশয়ের মধ্যে আছে মানুষ।শেষ পর্যন্ত কী হবে? বিরোধী দলের সঙ্গে সরকার সমঝোতায় যাবে কি না, নির্বাচনের সময় সরকারপ্রধান কে থাকবেন, জাতীয় সংসদ বহাল থাকবে, নাকি ভেঙে দেওয়া হবে—এসব বিষয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের বেশির ভাগ নেতা ও মন্ত্রী অন্ধকারে আছেন।এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের পাঁচজন জ্যেষ্ঠ নেতার সঙ্গে এ প্রতিবেদকের কথা হয়। তাঁরা জানান, যা কিছু করছেন, প্রধানমন্ত্রী এককভাবেই করছেন। তাঁরা তেমন কিছু জানেন না। এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী কোনো পর্যায়ে এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক কোনো আলোচনা হয়নি। জানতে চাইলে সরকারের তিনজন মন্ত্রীও একই কথা জানান। তাঁরা বলেন, ‘যেহেতু সংবিধানে নির্বাচনের কথা লেখা আছে, তাই কেবল এতটুকুই জানি, নির্বাচন হবে। কিন্তু নির্বাচন নিয়ে সৃষ্ট জটিলতা নিরসনে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হবে কি না, বা এ ব্যাপারে দলীয় অবস্থান কী, সে বিষয়ে কিছু জানি না। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এ নিয়ে কোনো কথা হয়নি। তিনিও আমাদের কিছু বলেননি।’

অবশ্য প্রতিদিন সভা-সমাবেশ ও গণমাধ্যমে আওয়ামী লীগের নেতা ও মন্ত্রীরা নির্বাচন নিয়ে নানা বক্তব্য দিচ্ছেন। তাঁরা বলছেন, যেকোনো মূল্যে সংবিধান অনুযায়ী, অর্থাৎ দলীয় সরকারের অধীনেই নির্বাচন হবে। নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি মানা হবে না। সর্বশেষ গতকাল শনিবার ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মোহাম্মদ নাসিম বলেছেন, বিএনপি না এলে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে আওয়ামী লীগ একাই নির্বাচন করবে।

আর প্রধান বিরোধী দল বিএনপির নেতারা অভিযোগ করছেন, বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিক, সেটা প্রধানমন্ত্রী চান না। তিনি একদলীয় নির্বাচনের পাঁয়তারা করছেন। বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া ঘোষণা দিয়েছেন, দলীয় সরকারের অধীন কোনো নির্বাচনে তাঁর দল যাবে না এবং ওই নির্বাচন হতেও দেবে না। তাঁরা ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত অপেক্ষা করবেন।

এই অবস্থায় আগামী নির্বাচন নিয়ে সংঘাতময় পরিস্থিতির আশঙ্কার কথা বলা হচ্ছে বিভিন্ন মহল থেকে। তাই একটা সমঝোতায় আসার জন্য জাতিসংঘের মহাসচিবসহ বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকেরা প্রধান দুই দলকে সংলাপে বসার তাগিদও দিয়ে আসছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত সংলাপের কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না।

এ নিয়ে সরকারি দলের পক্ষ থেকে কোনো উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত নেওয়া হবে কি না, সেটাও বলতে পারছেন না দলের নেতারা। জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য নূহ-উল-আলম লেনিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘কেউ কিছু জানি না। দলের কোনো পর্যায়ে এসব বিষয়ে আলোচনা হয়নি। কেবল আমরা জানি, নির্বাচন হবে।’

এদিকে মাস খানেক ধরে দলীয় প্রার্থী নির্বাচনের লক্ষ্যে আওয়ামী লীগের তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ধারাবাহিক বৈঠক করছেন। আগামী ১২ অক্টোবরের মধ্যে দলের ৭৩টি সাংগঠনিক জেলার সঙ্গে তিনি বৈঠক শেষ করবেন। এরই মধ্যে প্রায় অর্ধেক সাংগঠনিক জেলার নেতাদের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে। কিন্তু চূড়ান্তভাবে প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে তৃণমূল নেতাদের মতামত কতটা বিবেচনায় নেওয়া হবে, সেটাও নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারছেন না। কেন্দ্রীয় কয়েকজন নেতা জানান, প্রার্থী বাছাইয়ের জন্য তৃণমূলের সঙ্গে বৈঠক করার ব্যাপারে দলীয় কার্যনির্বাহী কমিটি বা সভাপতিমণ্ডলীতে কোনো আলোচনা হয়নি। দলের শীর্ষ পর্যায়ের নির্দেশে দলীয় দপ্তর থেকে জেলা-উপজেলায় চিঠি দিয়ে নেতাদের প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে ডেকে আনা হচ্ছে।

এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মাস খানেক ধরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে জনসভা করে দলীয় প্রতীক নৌকায় ভোট চাইছেন। প্রধানমন্ত্রীর পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় আগামী নির্বাচনের দলীয় প্রচারের দায়িত্ব নিয়েছেন বলে জানা গেছে। তিনি সম্প্রতি ঢাকায় সাংবাদিকদের সঙ্গে এক মতবিনিময়ে দলীয় প্রচার নিয়ে চমক দেখানোর কথাও বলেছিলেন। কিন্তু তেমন কোনো চমক শেষ পর্যন্ত দেখা যায়নি। ওই ঘোষণার পর তিনি গাজীপুর, ময়মনসিংহ ও টাঙ্গাইল এলাকায় দুই দিন সফর করেন এবং বিভিন্ন সমাবেশে নৌকায় ভোট চান। এরপর জয় যুক্তরাষ্ট্রে চলে গেছেন। তিনি আগামী ১৯ অক্টোবর আবার দেশে ফিরবেন। তাঁর উদ্যোগে আগামী নির্বাচনে দলীয় প্রচারে সহায়তার জন্য যুক্তরাষ্ট্র থেকে একজন প্রচার বিশেষজ্ঞ আনা হবে বলে জানা গেছে।

আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া না হলেও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম ইতিমধ্যে দলের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির কো-চেয়ারম্যান হিসেবে কাজ করছেন। পদাধিকারবলে দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনা এ কমিটির চেয়ারম্যান। ধানমন্ডির দলীয় কার্যালয়ের তৃতীয় তলায় আওয়ামী লীগের নির্বাচনী পরিচালনা কমিটির কার্যালয় রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র থেকে জানা গেছে, আগামী ডিসেম্বরের শুরুতে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে ১০ জানুয়ারি ভোট করার একটা সম্ভাবনা রয়েছে। তার আগে সংসদ ভেঙে দেওয়ার চিন্তাও রয়েছে। অবশ্য এ নিয়ে দলের কোনো ফোরামে এখনো আলোচনা হয়নি।

নিয়মিত সভা-সমাবেশ ও গণমাধ্যমে কথা বলে যাচ্ছেন—আওয়ামী লীগের এমন একাধিক গুরুত্বপূর্ণ নেতা প্রথম আলোকে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর প্রকাশ্য বক্তব্য অনুসরণ করে তাঁরা বিভিন্ন সভা-সমাবেশে বক্তব্য দিচ্ছেন। কিন্তু আসলে কী হচ্ছে বা আগামী দিনের দলীয় কৌশল কী, সে বিষয়ে তাঁরাও নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারছেন না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এসব নেতারা আরও বলেন, কোথায় সিদ্ধান্ত হয়, প্রধানমন্ত্রী কাদের নিয়ে আলোচনা করেন, সেটা দলের বেশির ভাগ নেতা জানেন না।

দলের বেশির ভাগ নেতাই মনে করেন, সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন হওয়া দরকার। বিএনপিকে ছাড়া নির্বাচন হলে তা প্রশ্নবিদ্ধ হবে। আওয়ামী লীগকেও একদলীয় নির্বাচন করার দুর্নামের ভাগীদার হতে হবে। এর আগে বিএনপি ও জাতীয় পার্টি একদলীয় নির্বাচন করলেও আওয়ামী লীগের এমন দুর্নাম নেই। এ জন্য আওয়ামী লীগের নেতাদের বড় অংশ মনে করেন, আলোচনা করে বিরোধী দলের সঙ্গে সমঝোতা জরুরি। কিন্তু দলীয় কোনো ফোরামে এ বিষয়ে খোলামেলা আলোচনা না হওয়ায় তাঁরা মত প্রকাশ করতে পারছেন না।