পোশাকশ্রমিকদের বিক্ষোভ, ভাঙচুর, অবরোধ

আগুনে ঘি ঢেলেছে বিজিএমইএর প্রস্তাব

ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে গতকাল সোমবার আবারও রাস্তায় নেমে এসেছেন পোশাকশ্রমিকেরা। গত দুই দিন বিচ্ছিন্নভাবে বিক্ষোভ হলেও গতকাল তা কার্যত শ্রমিক অসন্তোষে রূপ নেয়।মজুরি বোর্ড গঠনের পরও এমন মারমুখী অবস্থানের মূল কারণ হিসেবে সাধারণ শ্রমিকেরা তৈরি পোশাকমালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর ৬০০ টাকা মজুরি বাড়ানোর প্রস্তাবকে দায়ী করেছেন। তাঁরা বলেছেন, এর মাধ্যমে মালিকপক্ষ শ্রমিকদের মানবিক সত্তাকে চরমভাবে অপমানিত করেছে। শ্রমিকেরা এখন তিন হাজার টাকা নূন্যতম মজুরি পান।পাশাপাশি নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খানের ডাকা গত শনিবারের শ্রমিক সমাবেশও হঠাৎ পরিস্থিতি উত্তপ্ত করার পেছনে কাজ করেছে বলে মনে করেন মালিকপক্ষসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।গতকাল সকাল থেকে রাজধানীর একাধিক এলাকা এবং পাশের সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর, কালিয়াকৈর ও টঙ্গীতে বিক্ষোভ, কারখানা ও যানবাহন ভাঙচুর এবং সড়ক অবরোধ করেছেন শ্রমিকেরা। গাজীপুরে আনসার ক্যাম্পে হামলা চালিয়ে চারটি রাইফেল ছিনিয়ে নিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছেন তাঁরা। পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে আহত হয়েছেন শতাধিক শ্রমিক।রাস্তায় যখন শ্রমিক অসন্তোষ চলছে, তখন সচিবালয়ে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে সরকার, মালিক ও শ্রমিকনেতারা বৈঠক করেছেন। বৈঠকে বিজিএমইএর নেতারা মজুরি বোর্ডের নির্ধারিত ‘যৌক্তিক ও বাস্তবসম্মত’ দাবি তাঁরা মেনে নেবেন বলে জানান। শ্রমিকনেতারা দাবি পূরণ না হলে সর্বাত্মক ধর্মঘটের হুমকি দিয়েছেন। তবে সরকারসহ সব পক্ষ শ্রমিকদের শান্ত থেকে কাজে ফিরে যাওয়ার জন্য আহ্বান জানিয়েছে। বলেছে, ভাঙচুর গ্রহণযোগ্য নয়। আবার এ পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গে নৌমন্ত্রীর সংশ্লিষ্টতা নিয়েও এ খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। গতকাল সরকারের পক্ষে তিনিই ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে সভাপতিত্ব করেছেন। সাংবাদিকেরা এ নিয়ে তাঁকে প্রশ্নও করেছেন। জবাবে তিনি বলেছেন, শ্রমমন্ত্রী রাজিউদ্দিন আহমেদ বিদেশে থাকায় তিনি তাঁকে এ দায়িত্ব দিয়েছেন।

তবে মালিক, শ্রমিকনেতাসহ সরকারের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে শাজাহান খানকে এ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। সড়ক পরিবহনশ্রমিকদের নেতা শাজাহান খান সম্প্রতি পোশাকশ্রমিকদের নেতা হিসেবে সক্রিয় হয়েছেন।

এ খাতের সঙ্গে সরাসরি সংশ্লিষ্ট বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। জানতে চাইলে বাণিজ্যমন্ত্রী গোলাম মোহাম্মদ কাদের প্রথম আলোকে বলেন, তৈরি পোশাক খাতের রপ্তানি অংশের দেখভালের দায়িত্ব বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের। আর শ্রম অধিকারের বিষয় দেখবে শ্রম মন্ত্রণালয়। নৌ মন্ত্রণালয় কীভাবে এ বিষয় নিয়ে কথা বলছে, তা তাঁর জানা নেই।

‘তৈরি পোশাক খাতের চলমান পরিস্থিতি নিয়ে আমি চিন্তিত’—এ মন্তব্য করে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, বহির্বিশ্ব আজ জানে, বাংলাদেশে শ্রমিকেরা অধিকারবঞ্চিত। এ কারণেই যুক্তরাষ্ট্র অগ্রাধিকারমূলক বাজার-সুবিধা (জিএসপি) স্থগিত করেছে। শ্রমিকদের অধিকার পূরণ না হলে ডিসেম্বরে যে পর্যালোচনা করবে যুক্তরাষ্ট্র, তাতে জিএসপি-সুবিধা ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা কমে যাবে।

৬০০ টাকা থেকে শুরু: আশুলিয়ায় তাজরীন ফ্যাশনসে আগুন আর সাভারে রানা প্লাজায় ধসের পর দেশীয়-আন্তর্জাতিকভাবে শ্রমিকের নিরাপত্তা, বেতন, জীবনমান বাড়ানোর দাবি জোরালো হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে গঠিত হয় মজুরি বোর্ড। বোর্ডে শ্রমিকনেতারা সর্বনিম্ন আট হাজার ১১৪ টাকা মজুরি দাবি করেন। বিপরীতে মালিকপক্ষ ৬০০ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব দেয়। শ্রমিকেরা এখন ন্যূনতম মজুরি পান তিন হাজার টাকা।

গতকাল বেশির ভাগ শ্রমিক এ নিয়ে বিজিএমইএর ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করেন। পোশাকশ্রমিক ওয়াসিম হোসেন বলেন, ‘বিজিএমইএ কোন আক্কেলে ৬০০ টাকার মজুরি বৃদ্ধির প্রস্তাব দিল? ঘরভাড়া আর খাওয়ার খরচেই তো বেতনের সব টাকা চলে যায়। অমানুষিক পরিশ্রম পর এই বেতন কোনো অবস্থাতেই মেনে নেওয়া যায় না।’ তাঁর কথায় যেন সায় দেন গাজীপুর সদর, টঙ্গী, চন্দ্রা, বোর্ডবাজার, নাওজোড়, কোনাবাড়ী এলাকায় প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলা ২১-২২ জন শ্রমিক। তাঁদের অধিকাংশেরই বক্তব্য, সরকার মজুরি বাড়াতে চায় কিন্তু বিজিএমইএ চায় না। ৬০০ টাকা বৃদ্ধির প্রস্তাব করে তারা শ্রমিকদের সঙ্গে ঠাট্টা করেছে।

বিক্ষুব্ধ হওয়া প্রসঙ্গে শ্রমিক সাগরিকা খাতুন বলেন, ‘পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। বিক্ষুব্ধ না হয়ে তো আর কোনো উপায় নাই। তিন হাজার টাকায় তো এই বাজারে সংসার চলে না রে ভাই।’

নাওজোড় এলাকার শ্রমিক আলতাফ হোসেন, রবিউল ইসলাম, মরিয়ম বেগম বলেন, মালিকেরা কারখানার জায়গা বাড়াচ্ছেন, কারখানা বাড়াচ্ছেন, কিন্তু বেতন বাড়াচ্ছেন না। তাঁদের অভিযোগ, মালিকদের রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করছে বিজিএমইএ। শ্রমিকদের জীবন বা বাস্তবতা দেখে না।

বিজিএমইএর সহসভাপতি শহিদুল্লাহ আজিম বলেন, ঢাকা ও চট্টগ্রামে মালিকদের সঙ্গে মতবিনিময়ে অধিকাংশ মালিক ৬০০ টাকা বাড়ানোর পক্ষে সিদ্ধান্ত দেন। সেটাই মজুরি বোর্ডে প্রস্তাব করা হয়েছে।

জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক কর্মচারী লীগের সভাপতি ও মজুরি বোর্ডের সদস্য সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা আগেই বিজিএমইএর প্রস্তাবকে অযৌক্তিক, অমানবিক বলে প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছি।’ শ্রমিকদের ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, মালিক ও শ্রমিকসহ সব পক্ষের দর-কষাকষির পর মজুরি চূড়ান্ত হবে। সে পর্যন্ত সবাইকে অপেক্ষা করতেই হবে।

গাজীপুর পুলিশের পক্ষ থেকে গতকাল এলাকায় শ্রমিকদের শান্ত করতে মাইকিং করা হয়। এতে বলা হচ্ছে, বেতন বৃদ্ধির বিষয়টি সরকার বিবেচনায় নিয়েছে। কোনো অবস্থাতেই ভাঙচুর করা যাবে না।

ত্রিপক্ষীয় বৈঠক: বৈঠক শেষে নৌপরিবহনমন্ত্রী বলেন, সভার পর্যালোচনায় এসেছে, বাইরে থেকে কয়েকজন লোক প্রথমত গোলযোগ শুরু করে। তারাই শ্রমিকদের উসকে দিয়ে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটাচ্ছে।

শাজাহান খান বলেন, ‘শ্রমিকদের শান্ত হওয়ার আহ্বান জানাব। সামনে ঈদ আছে, বকেয়া পাওনা, বেতন ও বোনাস পেয়ে যেন তাঁরা পরিবারের সঙ্গে আনন্দ করতে পারেন, এটা যেন তাঁরা নষ্ট না করেন।’ তিনি বলেন, ‘যাঁরা কাজে যাবেন না, ধরে নেব তাঁরা ষড়যন্ত্রকারীদেরই অংশ, কারখানা ধ্বংস করার জন্য তাঁরা চেষ্টা করছেন।’

কারখানাগুলোতে মালিক-শ্রমিকদের পক্ষে যৌথভাবে কিছু কর্মী নিয়োগ করা হবে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, তাঁরা গোলযোগকারীদের চিহ্নিত করবেন। ইতিমধ্যে সাভারে এ রকম কিছু ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

মন্ত্রী বলেন, ‘মজুরি বোর্ডের প্রতি আহ্বান জানাব, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব রোয়েদাদ ঘোষণা করুন। শ্রমিকেরা যেন বাঁচার মতো মজুরি পান, সেটাই আমরা আশা করছি।’

সর্বনিম্ন মজুরি তিন হাজার ৬০০ টাকা করার প্রস্তাবের বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নে বিজিএমইএর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এস এম মান্নান বলেন, ‘এটা প্রস্তাব। মজুরি বোর্ড যৌক্তিক ও বাস্তবসম্মত যে সিদ্ধান্ত নেবে, সেটা আমরা মেনে নেব।’ তিনি বলেন, ‘আমরা সরকারের কাছে নিরাপত্তা চেয়েছি, আগামীকাল (আজ) থেকে কারখানা খুলব। এ জন্য শ্রমিকনেতাদেরও সহযোগিতা চাই।’

গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়নের সভাপতি মন্টু ঘোষ বলেন, ‘ভাঙচুর গ্রহণযোগ্য নয়। তবে মালিকেরা যদি আমাদের দাবি পূরণ না করেন, তাহলে আমরা সর্বাত্মক ধর্মঘট করব।’

স র্ব শে ষ

গভীর রাতে নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খানের দপ্তরে জরুরি বৈঠকে চারটি সিদ্ধান্ত হয়েছে। আজ সব কারখানা খুলে দেওয়া হবে। নৈরাজ্য হলে কঠোর ব্যবস্থা। ঈদের আগে বেতন-বোনাস দেওয়া হবে। নভেম্বরের মধ্যে ন্যূনতম মজুরি ঘোষণার জন্য মজুরি বোর্ডকে অনুরোধ করা হবে। বৈঠকে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী, মালিক-শ্রমিক প্রতিনিধি, আইজিপি ও র‌্যাবের ডিজি ছিলেন।