আগে পরিবর্তন, তারপর বিপ্লব…হাসান ফেরদৌস

‘বিপ্লব কী?’ শিরোনামে তারিক আলী সম্প্রতি ‘গের্নিকা’ অনলাইন ম্যাগাজিনে একটি আগ্রহোদ্দীপক প্রবন্ধ লিখেছেন (httt://www.guernicamag.com/daily/tariq-ali-what-is-a-revolution/)। আরব বিশ্বে ফুরফুরে বিপ্লবী হাওয়া বইছে—এমন ধারণার ওপর ঠান্ডা জল ঢেলে দিয়েছেন তিনি সে লেখায়। অনেকের ধারণা, সিরিয়ায় চলমান আন্দোলনের চরিত্র বৈপ্লবিক। তারিক আলী বলছেন, মোটেই না। সেখানে দুটো পরস্পরবিরোধী পক্ষ হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে লিপ্ত। এর ফলে কোনো বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে—এমনটি ভাবার কোনো কারণ নেই। আসাদ হয়তো রক্তচোষা একনায়ক, কিন্তু তাঁর বিরুদ্ধে যে সিরিয়ান জাতীয় ঐক্যজোট লড়ছে, তা যে একেবারে ধোয়া তুলসীপাতা, তা ভাবারও কোনো কারণ নেই। আসাদের লক্ষ্য যেকোনো মূল্যে ক্ষমতায় টিকে থাকা। বিরোধীপক্ষও যেকোনো মূল্যে সে ক্ষমতা দখল করতে চাইছে। এই গৃহযুদ্ধের ফলে যে পক্ষই জিতুক, সিরিয়ার রাজনৈতিক সমীকরণে কোনো তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন আসবে না। বড়জোর ক্ষমতার হাতবদল হবে। কিন্তু ক্ষমতার হাতবদলের নাম আর যা-ই হোক, বিপ্লব নয়।
আরব বিশ্বের গত তিন-চার বছরের অবিশ্বাস্য গণজাগরণের যে একটি বৈপ্লবিক চরিত্র ছিল, তারিক আলী মানুন বা না মানুন, সে কথা অস্বীকার করা যাবে না। প্রকৃত পরিবর্তনের লক্ষ্য নিয়েই মানুষ রাস্তায় নেমেছিল। বিপ্লব বলতে যা বোঝায়, তার সব ক্ল্যাসিকাল বৈশিষ্ট্য তার ছিল। একদিকে জনসাধারণ যেমন পুরোনো ব্যবস্থা মেনে নিচ্ছিল না, তেমনই শাসকদের পক্ষেও সম্ভব হচ্ছিল না পুরোনো ব্যবস্থার অধীনে ক্ষমতা ধরে রাখা। এ দুই অবস্থার কারণেই সৃষ্টি হয় বৈপ্লবিক পরিস্থিতি। কিন্তু সে পরিস্থিতি সৃষ্টি হলো মানে এই নয় যে বিপ্লব হয়ে গেল। প্রকৃতপক্ষে তিউনিসিয়া, ইয়েমেন, মিসর ও লিবিয়ায় যা ঘটল, তা একধরনের প্রতিবিপ্লব। যারা বিপ্লবের নামে ক্ষমতা দখল করে নিল, তাদের একটাই উদ্দেশ্য—যেকোনো মূল্যে বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঠেকানো।
ওই চার দেশের কোনোটাতেই শাসকগোষ্ঠীর কোনো গুণগত পরিবর্তন হয়নি। তিউনিসিয়ায় একটি গণতান্ত্রিক, জনকল্যাণমুখী ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রব্যবস্থা পত্তনের লক্ষ্যে যে বিপ্লবের সূচনা, এখন তার ফল ভোগ করছে ইসলামপন্থী দল এন্নাহদা। সেখানে রাষ্ট্রের হাতে নির্যাতন হয়তো কমেছে, কিন্তু বামপন্থী রাজনীতিক ও কর্মীদের ওপর আক্রমণ অব্যাহত আছে। দুই মাস আগে দিনে-দুপুরে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে দেশের অন্যতম জনপ্রিয় নেতা মোহাম্মদ ব্রাহমিকে। অর্থনৈতিক অবস্থারও কোনো বদল হয়নি। জনগণ এখন বলছে, আরেকটি বিপ্লব চাই, নইলে এসব আবর্জনা দূর করা যাবে না।
একই চিত্র ইয়েমেনে। এক একনায়কের প্রস্থান ঘটেছে, তাঁর জায়গায় এসেছেন নতুন শাসক, যাঁর একমাত্র লক্ষ্য শাসনক্ষমতার রশি যেন কোনোক্রমেই শাসকগোষ্ঠীর হাত ফসকে না যায়। জনসাধারণের আশা-আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে এই শাসকগোষ্ঠীর কোনো যোগাযোগ নেই। মানুষের অর্থনৈতিক ভাগ্যের পরিবর্তনের লক্ষণমাত্র নেই, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ-প্রক্রিয়ায় তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার কোনো চেষ্টাও নেই। মিসরের অবস্থা আরও করুণ। যে হোসনি মোবারকের বিরুদ্ধে বিপ্লব, তিনি এখন মুক্ত। উল্টো নির্বাচনে বিজয়ী ইসলামিক ব্রাদারহুডের নেতারা শুধু ক্ষমতাচ্যুতই হননি, তাঁদের কেউ কেউ এখন জেলের ঘানি টানছেন। মোবারকের সময় সামরিক বাহিনী যেমন পেছন থেকে সব কলকাঠি নাড়ত, এখনো তারাই সে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। চোখের সামনে ‘প্রতিবিপ্লব’ ঘটে গেল, অথচ মিসরের গণতান্ত্রিক বিপ্লবের স্বপ্ন যারা দেখেছিল, তারা ইসলামিক ব্রাদারহুডকে সরানো যাবে ভেবে খোলামেলা এক সামরিক অভ্যুত্থানকেও সমর্থন জানিয়ে বসে। ফলে তাদের আমও গেল, ছালাও।
বাংলাদেশেও সাম্প্রতিক গণজাগরণকে একটি বিপ্লবী মুহূর্ত ভেবে, কেউ কেউ ‘দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধ’ ভেবে উল্লসিত হয়েছিলেন। স্বতঃস্ফূর্ত কিন্তু রাজনৈতিকভাবে অসংগঠিত সে গণজাগরণ আর কিছু না হোক আমাদের এ কথা জানান দিয়ে গেছে যে, আজকের নতুন প্রজন্ম চলমান অবস্থা (স্ট্যাটাস কো) মানতে আর রাজি নয়। তিউনিসিয়া, মিসর বা ইয়েমেনের যুবক-যুবতীদেরও একই দাবি ছিল। আশঙ্কার কথা হলো, তাদের গণ-উত্থানের ফলে ক্ষমতার হাতবদল হলেও বস্তুত চলমান অবস্থা অপরিবর্তিত থেকে গেছে। বাংলাদেশের চিত্রও তা থেকে খুব ভিন্ন নয়।
বিশ-একুশ শতকের জাতিরাষ্ট্রের চরিত্র সর্বত্রই অভিন্ন। জামার ছাঁট, টুপির সাইজ বদলিয়ে যারাই ক্ষমতায় বসুক, তাদের মৌল চরিত্রে তেমন ভিন্নতা নেই। সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রশ্নে কেউ হয়তো অধিক উদারনৈতিক, কেউ অধিক রক্ষণশীল। কিন্তু রাষ্ট্রকাঠামো রক্ষার ব্যাপারে তাদের কর্মসূচির কোনো ভিন্নতা নেই। প্রত্যেকেই বৃহৎ পুঁজি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ও বৃহৎ পুঁজির স্বার্থে নিবেদিত। রাষ্ট্রকাঠামোর প্রধান কাজ, তার ‘সোশ্যাল ফাংশন’ হলো, বৃহৎ পুঁজির স্বার্থ যাতে বিন্দুমাত্র বিঘ্নিত না হয়, সে উদ্দেশ্যে সর্বশক্তি নিয়োগ করা। ক্ষমতা ধরে রাখার ব্যাপারে মধ্যযুগীয় শাসনব্যবস্থার সঙ্গে আজকের একুশ শতকীয় রাষ্ট্রব্যবস্থার মৌলিক তফাত নেই। তখন যেমন, এখনো তেমনি ক্ষমতায় আসামাত্র শাসকগোষ্ঠী নজর দেয় নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করতে। তার মানে সেনাবাহিনী, নিরাপত্তা বাহিনী, গোপন পুলিশ ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন নিবর্তনমূলক কলকব্জা নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে ও ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য তার ব্যবহারে। শাসকগোষ্ঠী অবশ্য একটি ভিন্ন যুক্তি দেয়। ‘দেশের মানুষের স্বার্থে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যেতে দেওয়া যায় না।’ অতএব, দরকার হলে গুলি চলবে, কেউ ভিন্নমত প্রকাশ করলে গ্রেপ্তার হবে, পত্রিকা বন্ধ হবে, টিভি নেটওয়ার্ক নিষিদ্ধ ঘোষিত হবে। আজকের মিসরের কথা ভাবুন। আইনশৃঙ্খলার অজুহাতে সামরিক বাহিনীকে হস্তক্ষেপ করতে হলো, এ কাজ তাদের অনিচ্ছা সত্ত্বেও শুধু জাতীয় স্বার্থে করতে তারা বাধ্য হয়েছে, জেনারেল সি সি জানিয়েছেন। জাতীয় স্বার্থ বলতে কী বোঝায়, এত দিনে সে কথা বুঝতে-জানতে আমাদের কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়।
মিসর বা তিউনিসিয়ার আন্দোলনের চরিত্র তৃণমূলভিত্তিক ছিল, কিন্তু তা সত্ত্বেও সে আন্দোলন প্রকৃত পরিবর্তন আনতে ব্যর্থ হলো কেন? এ প্রশ্নের জবাবে আমরা লেনিনের কাছে পরামর্শের জন্য হাত বাড়াতে পারি। রাষ্ট্র ও বিপ্লব গ্রন্থে ১৮৭১-এর প্যারিস কমিউনের উদাহরণ টেনে লেনিন জানিয়েছেন, পুরোনো রাষ্ট্রব্যবস্থা টিকিয়ে রেখে প্রকৃত পরিবর্তন সম্ভব নয়, রাষ্ট্রব্যবস্থার ‘ফাংশন’ কেবল তখনই বদলাবে, যখন সে রাষ্ট্রব্যবস্থার কাঠামোগত পরিবর্তন অর্জিত হবে। আর এই পরিবর্তন অর্জিত হয় ক্ষমতার জন্য দুই ভিন্নমুখী লড়াইয়ের ফলাফল থেকে। তৃণমূল থেকে পরিবর্তনের দাবি ওঠে, তাকে ঠেকানোর চেষ্টা হয় ওপর থেকে। কখনো কখনো ক্ষমতায় আকৃষ্ট হয়ে তৃণমূলভিত্তিক নেতৃত্ব পুরোনো শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে হাত মেলায়। কখনো কখনো ঘটে উল্টো, শাসকগোষ্ঠীর কেউ কেউ নতুন জামা গায়ে চাপিয়ে তৃণমূলের সঙ্গে যুক্ত হয়। উভয় ক্ষেত্রে বিপ্লব ‘চুরি’ হয়ে যায়, হতাশা ও নতুন নিবর্তনের মুখে পড়ে পরিবর্তনপ্রত্যাশী মানুষ।
পরিবর্তন বা বিপ্লব—যে নামেই তাকে ডাকি না কেন, তা নিয়ে এই চলছে ১০০ বছর ধরেই। খোদ লেনিনের রাশিয়াতেই দেখেছি শাসকগোষ্ঠীর কারসাজিতে কীভাবে জনগণের বিপ্লবী অর্জন চুরি হয়ে যায়। ক্ষমতা নিজের প্রয়োজনে ব্যবহার করাই শাসকগোষ্ঠীর ধর্ম। অতএব, ব্যর্থতার আসল দায়ভার আমাদের, সাধারণ মানুষের। আমরা নেতা চিনতে ভুল করি, দল চিনতে ভুল করি, রাজনৈতিক কর্মসূচির সম্যক মূল্যায়ন করতে ব্যর্থ হই। সবচেয়ে বড় কথা, পরিবর্তন যে ঘটনা নয় বরং একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া—আমরা সে কথা ভুলে যাই। একটি লড়াইয়ে জয় মানে যুদ্ধজয় নয়, সে কথা আমরা মনে রাখি না। রাজনৈতিক আন্দোলনের তীব্রতা যে মুহূর্তে শিথিল হয়, পুরোনো কায়েমি স্বার্থবাদ তার ফাঁক গলে মধ্যমঞ্চে ফেরত আসে।
একুশ শতকে রাজনৈতিক পরিবর্তন আর উনিশ শতকীয় বৈপ্লবিক পরিবর্তন অভিন্ন নয়। সামরিক পথে ক্ষমতা অর্জন এখন তত সহজ নয়। সম্প্রতি লিবিয়ায় সে চেষ্টা হয়েছে। ‘ব্রাদার’ গাদ্দাফিকে বন্দুকের বেয়নেটে কুপিয়ে বিপ্লবের ঝান্ডা তোলা হয়েছে বটে, কিন্তু আজকের লিবিয়ার দিকে তাকিয়ে তাকে কেউ বিপ্লবী রাষ্ট্র বলবে না। এক দেশ এখন ভাগ হয়ে পড়েছে ছোট ছোট ক্ষমতার বিভিন্ন কেন্দ্রে। জনগণের সম্মিলিত স্বার্থের বদলে এসব ‘ক্ষমতাকেন্দ্র’ অনেক বেশি ব্যস্ত নিজেদের ও নিজেদের গোত্রের/দলের/গ্রামের স্বার্থ টিকিয়ে রাখতে।
আমরা জানি, এখন ক্ষমতার পরিবর্তন হয় ব্যালটে, বুলেটে নয়। এই আপাত পরিবর্তনকে কীভাবে বিপ্লবে পরিণত করা যায়, এই সময়ের সেটাই আসল চ্যালেঞ্জ। এর জন্য সবচেয়ে বেশি যা দরকার তা হলো পরিবর্তনের পক্ষের সব শক্তির ন্যূনতম কর্মসূচির ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ হওয়া। পরিবর্তনের চরিত্র বহুমুখী, শুধু রাজনৈতিক নয়, তাতে সামাজিক, সাংস্কৃতিক, পরিবেশগত ইত্যাদি নানা বিষয়ের সমন্বয় ও সংযোগ থাকতে হবে। শ্রমিক চায় তার শ্রমের ন্যায্য মজুরি, কৃষক চায় তার ফসলের ন্যায্য দাম, নারী চায় সমতার ভিত্তিতে তার সামাজিক মর্যাদার স্বীকৃতি, পরিবেশবাদী চায় পরিবেশগত ভারসাম্যের নিশ্চয়তা, ছাত্র চায় শিক্ষার অধিকার ও শিক্ষা শেষে কর্মের নিশ্চয়তা। যে যার মতো এগোলেও তারা সবাই একটি মৌল দাবি দ্বারা চালিত। আর তা হলো এখন দেশ যেভাবে চলছে, সেভাবে আর চলতে দেওয়া যায় না।
এই সাধারণ সত্যটি যদি আমরা সবাই মানি এবং সে লক্ষ্যে একজোট হই, তাহলে পরিবর্তন আসবেই। সে পরিবর্তনকে ‘বিপ্লব’ বলা যায় কি না, সে বিচারের ভার না হয় ইতিহাসের হাতেই ছেড়ে দেওয়া যাক।

নিউইয়র্ক
হাসান ফেরদৌস: প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক।