আদালত অবমাননা আইন

আটটি ধারা বাতিলের রিটের বিষয়ে তদন্ত চান ড. কামাল

২০১৩ সালের আদালত অবমাননা আইনের আটটি ধারা বাতিল চেয়ে করা রিটের পেছনে সংশ্লিষ্ট আইনজীবীর প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ড. কামাল হোসেন। তিনি এ বিষয়ে আদালতের তরফে তদন্তেরও দাবি জানান।গতকাল বুধবার বিচারপতি রেজা-উল হক ও এ বি এম আলতাফ হোসেনের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চে রিটের শুনানি হয়।শুনানিতে ড. কামাল বলেন, সংসদে আইন পাসের মাত্র ১৩ দিনের মধ্যে এই আইনজীবী যে উপায়ে আইনের আটটি ধারা বাতিল বা প্রত্যাহার করে নিতে সরকারের পাঁচ সচিবের ওপর নোটিশ জারি করেছেন, তা নজিরবিহীন। এ ধরনের নোটিশকে তিনি ‘মার্শাল লর বাপ’ উল্লেখ করে বলেন, জেনারেল জিয়ার উত্তরসূরিরাও এভাবে কোনো আইনের বাতিল চাইতে কুণ্ঠিত হতেন। আইনজীবী মনজিল মোরসেদ গত ৬ মার্চ আদালত অবমাননা আইনের ৪, ৫, ৬, ৭, ৯, ১০, ১১ ও ১৩(২) ধারার বাতিল চেয়ে ডিমান্ড অব জাস্টিস নোটিশ জারি করেন। এর মধ্যে পাঁচটি ধারাই সরাসরি গণমাধ্যম তথা বাকস্বাধীনতা এবং দুটি ধারা সরকারি কর্মকর্তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট। তবে প্রথা অনুযায়ী, মনজিল মোরসেদ নোটিশে তিনি কার পক্ষের আইনজীবী, তা প্রকাশ করেননি। গতকাল আদালতে তিনি অবশ্য বলেন, আইনজীবী আসাদুজ্জামান সিদ্দিকীর পক্ষে জনস্বার্থে দায়ের করা এক রিটে তিনি আইনজীবী নিযুক্ত হন। তাঁদের যুক্তি, উচ্চ আদালতের মর্যাদা সমুন্নত রাখতেই তাঁরা এই রিট করেছেন। ওই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট গত ৩ এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদ সচিব, রাষ্ট্রপতির সচিব, প্রধানমন্ত্রীর সচিব, আইনসচিব ও জাতীয় সংসদ সচিবের ওপর রুল জারি করে ১৩ এপ্রিলের মধ্যে জবাব দেওয়ার নির্দেশ দেন। এ পর্যন্ত কেবল মন্ত্রিপরিষদ সচিব একটি হলফনামা পেশ করেছেন। অ্যাটর্নি জেনারেলের দপ্তরও কার্যত নিষ্ক্রিয় ভূমিকায় বলে অভিযোগ উঠেছে। এই প্রেক্ষাপটে কামাল হোসেন ২৪ সেপ্টেম্বর প্রথম আলো এবং বাংলাদেশ প্রশাসনিক সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনকে মামলাটির গুরুত্ব বিবেচনা করে পক্ষভুক্ত করতে আবেদন করেন। আদালত তা নামঞ্জুর করলেও কামাল হোসেনকে বক্তব্য রাখতে এক ঘণ্টা সময় দেন।

কামাল হোসেন গতকাল আদালত অবমাননা আইনের দীর্ঘ ইতিহাস ও বিবর্তন উল্লেখ করে বলেন, এটা কোনো জমি দখল বা কারও আর্থিক লাভ-লোকসানসংক্রান্ত মামলা নয়। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এবং আদালতের মর্যাদা রক্ষা করা—এই দুয়ের ভারসাম্য বজায় রাখতে এই মামলার রায়ের অসামান্য তাৎপর্য রয়েছে। তিনি বলেন, আইনজীবীর সক্রিয়তা প্রশংসনীয় কিন্তু তা মাত্রাতিরিক্ত হলে ক্ষতিকর।

ড. কামাল আশঙ্কা প্রকাশ করেন, ‘১৯২৬ সালের পর ২০১৩ সালে আমরা একটি আদালত অবমাননা আইন পেলাম। এটা কোনো তত্ত্বাবধায়ক সরকার পাস করেনি। আইনটির যেসব ধারা সংবিধান পরিপন্থী বলে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে, তা ভারত ১৯৭১ সালে এবং ব্রিটেন ১৯৮১ সালে আইনে পরিণত করেছে। এ জন্য সেসব দেশের উচ্চ আদালতের মর্যাদা হুমকিগ্রস্ত হয়নি।’

সংবাদপত্র ও আদালতের পরিপূরক ভূমিকার দৃষ্টান্ত তুলে ধরে কামাল হোসেন বলেন, মাগুরার (উপনির্বাচন) মতো, ফয়জী (সাবেক বিচারপতি ফয়সল মাহমুদ ফয়জী) বললে যে চিত্র ভেসে ওঠে, তা সংবাদপত্রের কারণেই সম্ভব হয়েছে। ফয়েজি যদি তাঁর সনদ দেখাতে পারতেন, তাহলে সংবাদপত্রের দণ্ড প্রাপ্য ছিল। তিনি বলেন, সংবিধান প্রত্যেকের ক্ষমতা ও এখতিয়ারের সীমা বেঁধে দিয়েছে। রাষ্ট্রের কোনো অঙ্গই অসীম ক্ষমতা দাবি করতে পারে না।

আদালত অবশ্য বলেন, বিচারক ও আদালতের মর্যাদা দুটো আলাদা বিষয়। বিচারকের ব্যক্তিগত বিষয় যখন আদালতকে স্পর্শ করে না, তখন তা আদালত অবমাননা নয়। কিন্তু বিচারকের ব্যক্তিগত বিষয় হলেও যখন তার উদ্দেশ্য থাকে আদালতকে খাটো করা, তখন তা অবমাননাকর।

আজ এই রিটের বিষয়ে রায় হতে পারে।