আদালতে হাজিরা থেকে বিরত থাকতে পারেন বিএনপি নেতারা

বিএনপির ভাষায় ‘জুলুম-নির্যাতন’ অব্যাহত থাকলে পবিত্র ঈদুল আজহার পর আর কোনো মামলায় আদালতে হাজিরা দেবেন না দলের নেতারা। ‘অব্যাহত মিথ্যা মামলায়’ হাজিরা দিতে দিতে তাঁরা ধৈর্য হারিয়েছেন মন্তব্য করে দলটির নেতারা জানিয়েছেন, এ অবস্থা চলতে থাকলে তাঁরা ‘সাময়িক আদালত বর্জনে’ যেতে পারেন। দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াও এ বিষয়ে একমত পোষণ করে নেতা-কর্মীদের আদালতে হাজিরা দেওয়ার চেয়ে আন্দোলনের মাঠে থাকার নির্দেশ দিয়েছেন বলে একটি সূত্র দাবি করেছে।
ওদিকে দল থেকে সারা দেশে বিএনপি নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলার তালিকা তৈরি করা হচ্ছে বলে একটি সূত্র জানিয়েছে। ঈদুল আজহার পর এই তালিকা বই আকারে চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কাছে পেশ করা হবে। জানা গেছে, বাংলাদেশে নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের হাইকমিশনার, রাষ্ট্রদূত, মানবাধিকার সংগঠনগুলোসহ বিভিন্ন জায়গায় ওই তালিকা দেওয়া হবে।
সূত্রগুলোর দাবি, খালেদা জিয়ার সিঙ্গাপুর সফরের আগে দলের চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে যান অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের শীর্ষ কয়েকজন নেতা। তাঁদের ২৪ অক্টোবরের পর মাঠে থাকার কঠোর নির্দেশ দেন খালেদা জিয়া। তখন দলের কয়েকজন নেতা মামলা ও আদালতে হাজিরার ঝামেলার কথা তোলেন। খালেদা জিয়া এ সময় কিছুটা উষ্মা প্রকাশ করে তাঁদের স্পষ্ট জানিয়ে দেন, প্রয়োজনে সাময়িক আদালত বর্জন করে হলেও সরকারবিরোধী আন্দোলনে মাঠে সক্রিয় হতে হবে। তিনি দলের অনুগত আইনজীবী নেতাদের নির্দেশ দেবেন যাতে আন্দোলনের সময় আদালতে হাজির হতে না হয় তার ব্যবস্থা করতে। কিন্তু কোনোভাবেই মাঠ ছাড়া যাবে না।
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন এমন এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে এসব তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, সরকারের ‘জুলুম-নির্যাতন’ অব্যাহত থাকলে স্বেচ্ছায় কারাবরণের মতো কর্মসূচির বিষয়ও ভাবছেন বিএনপিপ্রধান। তবে সব কিছু নির্ভর করবে পরিস্থিতির ওপর।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আদালতের প্রতি আমাদের সম্মান আছে, থাকবে। কিন্তু বর্তমান সময়ে সরকারি দলের চাপের কারণে আদালত কিছুটা পক্ষপাতিত্ব আচরণ করতে বাধ্য হচ্ছে। আমরা এখন সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের মধ্যে আছি। আন্দোলন ও আদালতে হাজিরা একসঙ্গে চলতে পারে না। যাকে যে দায়িত্ব দেওয়া হয়, সে রাজপথে থেকে সে দায়িত্ব পালন করবে। তাই আদালতে হাজিরার চেয়ে আমাদের কাছে জনগণের যৌক্তিক দাবি আদায়ই মুখ্য।’
স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘একটি বেলুন নির্দিষ্ট পরিমাণে ফোলানো যায়। ওই পরিমাণের বেশি ফোলানোর চেষ্টা করলে তা ফেটে যায়। আমাদের ক্ষেত্রেও সে অবস্থার উপক্রম। জুলুম-নির্যাতনের চূড়ান্ত পর্যায়ে নেতা-কর্মীরাই বা কত ধৈর্য ধরবেন? ২৪ অক্টোবরের পর নৈতিকভাবে সরকারের ক্ষমতায় থাকার কোনো অধিকারও নেই। সরকার জোর করে ক্ষমতায় থেকে যদি বিরোধী দলের ওপর জুলুম-নির্যাতন অব্যাহত রাখে, তাহলে আমাদের বিকল্প কোনো পথ খোলা থাকবে না। আদালতে হাজিরার চেয়ে আন্দোলনই মুখ্য হবে।’
স্বেচ্ছায় কারাবরণ করবেন কি না এমন প্রশ্নের জবাবে রফিকুল ইসলাম মিয়া বলেন, ‘বিএনপি আন্ডারগ্রাউন্ডের দল নয়, জনগণের দল। সরকারের অত্যাচারে আমরা টিকতে না পারলে তো কারাগারে যাওয়াই নিরাপদ। দলীয় নয়, এটি আমার ব্যক্তিগত মত।’
মামলার তালিকা প্রায় চূড়ান্ত : সরকারবিরোধী আন্দোলনের সময় নানা ঘটনায় নেতা-কর্মীদের নামে রুজু হওয়া মামলার সঠিক হিসাব নেই বিএনপির দপ্তরে। তবে তালিকা তৈরির কাজ চূড়ান্ত। জানা গেছে, মামলার সঠিক হিসাব জেনে তার তালিকা তৈরির জন্য খালেদা জিয়া পবিত্র ঈদুল ফিতরের আগেই নির্দেশ দিয়েছিলেন। ওই নির্দেশের পর বিএনপির দপ্তর সারা দেশে কতগুলো মামলা হয়েছে তার তালিকা তৈরির কাজ শুরু করে। তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে তালিকা তৈরির কাজ প্রায় চূড়ান্ত করে এনেছে। শিগগিরই চার বছরের মামলার ওই তালিকা বই আকারে ছাপানো হবে এবং তা ঈদুল আজহার পর বিএনপি চেয়ারপারসনের কাছে তুলে দেওয়া হবে।
এ কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক নেতা জানান, সারা দেশের মামলাগুলোকে বিভাগ ও জেলা অনুসারে বিন্যস্ত করা হয়েছে। বর্তমান সরকার গত সাড়ে চার বছরে কতগুলো মামলা দিয়েছে এবং এগুলো কোন অভিযোগের ভিত্তিতে সেসবও তালিকায় উল্লেখ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে বিএনপি দপ্তরের দায়িত্বে নিয়োজিত যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী জানান, প্রতিদিন নানা অজুহাতে বিএনপি নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে সরকার মামলা দিচ্ছে। এসব মামলার তালিকা করার কাজ চলছে।
মামলার তালিকা বই আকারে চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কাছে দেওয়ার পর ওই তালিকা বাংলাদেশে নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের দূতাবাস, হাইকমিশন, বিশ্বের বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনগুলোসহ সংশ্লিষ্ট অফিসগুলোতে পাঠানো হবে। মামলার তালিকা তৈরির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ওই নেতা আরো জানান, কূটনীতিকদের সঙ্গে বৈঠকে বিএনপির পক্ষ থেকে মামলা ও হয়রানির বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চেয়েছিলেন তাঁরা। তখন তাঁদের কাছে বিস্তারিত তুলে ধরা যায়নি। মামলার তালিকা হাতে থাকলে বিস্তারিত তুলে ধরতে অনেক সুবিধা হয়। সে জন্যই তালিকা তৈরির বিষয়ে জোর দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া এই তালিকা বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হবে। একই সঙ্গে আগামী দিনে বিএনপি ক্ষমতায় এলে নেতা-কর্মীদের হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহারের সময় এ তালিকা কাজে লাগানো হবে বলেও জানান ওই নেতা।
জাতীয় লিগ্যাল এইড কমিটি : চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ভাইস প্রেসিডেন্ট অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেনকে চেয়ারম্যান করে বিএনপি জাতীয় লিগ্যাল এইড কমিটি গঠন করেছে। এই কমিটির কাজ হচ্ছে বিএনপি নেতা-কর্মীদের আইনি সহায়তা দেওয়া। কমিটির চেয়ারম্যান বলেন, যাঁরাই আবেদন করছেন, তাঁদেরই সর্বোচ্চ সহায়তা করা হচ্ছে।