আন্দোলনে জামায়াত ও হেফাজতকে পাশে চায় বিএনপি

নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের দাবি আদায়ে রাজপথে কঠোর আন্দোলনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি। অন্যদিকে বিরোধী দলের এ দাবিকে আমলেই নিচ্ছে না সরকার। এ অবস্থায় লাগাতার আন্দোলন ছাড়া কোনো বিকল্প নেই বিএনপির সামনে। তাই দলটি এ মুহূর্তে আন্দোলনেরই ছক কষছে। তবে সাংগঠনিক অবস্থা কিছুটা দুর্বল থাকায় দলের নেতারা অন্যতম শরিক জামায়াতে ইসলামী এবং জোটের বাইরে হেফাজতে ইসলাম, কয়েকটি রাজনৈতিক দল ও সংগঠনকে আগামী দিনের আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে কাজে লাগাতে চান। বিএনপির বিভিন্ন সূত্রের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
দলীয় সূত্র জানায়, বর্তমানে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিভাগীয় জনসভার কর্মসূচি চলছে। এই কর্মসূচি শেষে কোরবানির ঈদের পর ২৫ অক্টোবর থেকে কঠোর আন্দোলনের ডাক দিতে পারেন বিরোধীদলীয় নেতা। এ আন্দোলনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোটের শরিক দলগুলোর পাশাপাশি জোটের বাইরে থাকা হেফাজতে ইসলামও সক্রিয় থাকবে বলে তাঁরা আশাবাদী।
বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার ৯০ দিন আগে নির্বাচন হতে হবে। সে ক্ষেত্রে আগামী ২৫ অক্টোবর থেকে ২৪ জানুয়ারির মধ্যে নির্বাচন করতে হবে। ওই সময়ে সংসদের অধিবেশন বসবে না। মন্ত্রিসভা রুটিন ওয়ার্কের বাইরে কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেবে না। বিএনপির একজন সিনিয়র নেতা জানান, ২৫ অক্টোবরের মধ্যে নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে সরকারের সঙ্গে কোনো সমঝোতা না হলে বিরোধী দলকে মাঠে নামতেই হবে। তখন টানা হরতাল, সারা দেশে সড়ক, রেল ও নৌপথে সর্বাত্মক অবরোধ কর্মসূচির ডাক দেওয়া হবে। পর্যায়ক্রমে সচিবালয় ও নির্বাচন কমিশন ঘেরাও কর্মসূচি দেওয়া হতে পারে। এ সময় প্রশাসনের বিএনপি সমর্থক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদেরও কাজে লাগাবে দলটি। নেতারা মনে করেন, আওয়ামী লীগের হাতে ক্ষমতা থাকলেও ২৫ অক্টোবরের পর প্রশাসনের ভেতর তাদের প্রভাব সেই অর্থে একচ্ছত্র থাকবে না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও এ সময় লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরিতে অনেকটাই সহায়ক হিসেবে কাজ করবেন। আন্দোলন যত জোরদার হতে থাকবে ততই বিএনপির সাংগঠনিক অবস্থাও শক্তিশালী হয়ে উঠবে।
সূত্র জানায়, শেষ সময় পর্যন্ত সরকারের সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা করবে বিএনপি। কিন্তু তাতে কাজ না হলে কোরবানির ঈদের পরপরই মাঠে নামার প্রস্তুতিও নিচ্ছে দলটি। রাজপথের আন্দোলনে বিএনপির সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীসহ হেফাজতে ইসলাম ও আরো কয়েকটি রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের দ্ব্যর্থহীন সমর্থন পাওয়া যাবে বলেই আশাবাদী দলের নেতারা। সবপক্ষের মিলিত শক্তিতে নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের আন্দোলনে সাফল্য আসবে বলেও তাঁরা আশা করছেন।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, বর্তমান সরকারের আমলে বিএনপি সেই অর্থে জোরদার আন্দোলন অব্যাহত রাখতে পারেনি। সরকারবিরোধী বিভিন্ন ইস্যু থাকলেও সেগুলো পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারেনি দলটি। আন্দোলন শুরু করার পরও রাজপথে দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকার লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত বিএনপির নেতা-কর্মীদের নানা রকম ধকল পোহাতে হয়েছে। বিএনপির সাংগঠনিক অবস্থা এখন আগের চেয়ে ভালো বলে মনে করা হচ্ছে। আগামী নির্বাচন সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ হলে বিএনপির জয়লাভের সম্ভাবনাই বেশি- এ রকম একটি ধারণা তাদের নেতা-কর্মীদের মধ্যে ক্রমেই জোরালো হয়ে উঠছে।
সম্প্রতি খুলনা, রাজশাহী, সিলেট, বরিশাল ও সর্বশেষ গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থীরা বিজয়ী হওয়ায় নেতা-কর্মীদের মধ্যে প্রাণ ফিরে এসেছে। তারা ভাবতে শুরু করেছে, সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন হলে আগামীতে বিএনপি বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করবে। এই ভাবনা থেকে দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা এখন মাঠের রাজনীতিতে বেশি সময় দিচ্ছে। আগের চেয়ে বেশি মাত্রায় যোগ দিচ্ছে আন্দোলন কর্মসূচিতে। সাম্প্রতিক সভা-সমাবেশগুলোতে দলীয় নেতা-কর্মী ছাড়াও সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণও বেশি হারে হতে দেখা যাচ্ছে। সরকারের মেয়াদ ফুরিয়ে আসার সঙ্গে বিএনপির সাংগঠনিক অবস্থার পরিবর্তন, আরেক অর্থে উন্নতি স্পষ্টতর হচ্ছে। বর্তমানে খালেদা জিয়ার বিভাগীয় পর্যায়ে জনসভার কর্মসূচিতেও দেখা যাচ্ছে শুধু দলের নয়, বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ যোগ দিচ্ছে। তারা যথেষ্ট আগ্রহ নিয়েই বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্য শুনছে। মিডিয়ার মাধ্যমে সারা দেশের মানুষও এসব কর্মকাণ্ডের নিয়মিত খোঁজ রাখছে।
এদিকে দলকে সাংগঠনিকভাবে আরো শক্তিশালী করতে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া তাঁর গুলশানের কার্যালয়ে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠন ও ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, প্রকৌশলী ও ডাক্তারদের সঙ্গে মতবিনিময় করছেন। পেশাজীবীদের নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন দেওয়ার দাবি আন্দোলনে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে যাচ্ছেন তিনি। ঈদের পর মাঠে নামার জন্য প্রস্তুত থাকতেও বলেছেন তিনি। গুরুত্ব দিয়েছেন নিজ নিজ সংগঠনকে আরো শক্তিশালী করে তোলার বিষয়ে মনোযোগী হতে।
বিএনপির নীতিনির্ধারক পর্যায়ের এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, জামায়াতের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। বিএনপিকে ছেড়ে যেতে জামায়াতের ওপর সরকার নানাভাবে চাপ সৃষ্টি করেছে। কিন্তু জামায়াতের নেতারা তাতে সায় দেননি। মানবতাবিরোধী অপরাধে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতাদের কারো দণ্ড হয়েছে। কারো বিচার চলছে। এ নিয়ে জামায়াত-শিবির আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। তবে নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকার দাবির আন্দোলনেও জামায়াত বিএনপির সঙ্গেই থাকবে। থাকবে হেফাজতও। বিএনপির ওই নেতা বলেন, গত ৫ মে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলাম শোডাউন করেছিল। আবার তারা ঢাকায় আসতে চায়। ১৩ দফা দাবিতে সচিবালয় ঘেরাওয়ের হুমকিও দিয়েছে। কঠোর আন্দোলন শুরু হলে তখন আওয়ামী লীগ ছাড়া প্রায় সব রাজনৈতিক দল এক কাতারে আসবে বলে বিএনপির এই নেতা দাবি করেন।
এ প্রসঙ্গে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কালের কণ্ঠকে বলেন, একমাত্র আওয়ামী লীগ ছাড়া সব রাজনৈতিক দলই নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন চায়। আওয়ামী লীগের ভেতরেও অনেক নেতা এই দাবির সঙ্গে একমত। তিনি বলেন, নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের দাবি মেনে নেওয়ার জন্য ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত সরকারকে সময় দেওয়া হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে দাবি না মানলে আন্দোলন শুরু হবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আগের চেয়ে বিএনপির সাংগঠনিক অবস্থা ভালো। সরকারই তাদের পুলিশ বাহিনী দিয়ে বিএনপির নেতা-কর্মীদের হয়রানি-নির্যাতন করছে। মিথ্যা মামলা দিয়ে রিমান্ডে নিচ্ছে। এখন আর পেছনে ফেরার উপায় নেই।
বিকল্পধারার প্রেসিডেন্ট সাবেক রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিকল্প নেই। তত্ত্বাবধায়ক ছাড়া দেশে নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয়। তিনি বলেন, ‘গণফোরামের ড. কামাল হোসেন, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী, নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্নার সঙ্গে আমরা কথা বলেছি। মিটিং করেছি। সবাই নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন চান। বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া নির্দলীয় সরকারের দাবিতে আন্দোলনের ডাক দিলে এসব রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীরাও যোগ দেবেন। কর্মসূচি ঘোষণা করার আগে সরকারের উচিত সমঝোতায় বসা।’
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে আপাতত সমঝোতার কোনো লক্ষণ দেখছি না। সরকার এগিয়ে না এলে খালেদা জিয়া যথাসময়ে আন্দোলনের ডাক দেবেন। দেশের ৯০ শতাংশ মানুষ এই দাবির সঙ্গে আছে। জনগণকে সঙ্গে নিয়েই দাবি আদায় করা হবে।’ তিনি বলেন, লাগাতার আন্দোলন শুরু হলে তখন দলের সাংগঠনিক অবস্থা আরো শক্তিশালী হয়।
বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, একতরফাভাবে নির্বাচন করার জন্য সরকার দেশের পরিস্থিতি ভিন্ন দিকে নিয়ে যাচ্ছে। সংলাপের কোনো তোয়াক্কা করছে না সরকার। তিনিও দাবি করেন, আগের চেয়ে দলের সাংগঠনিক অবস্থা বর্তমানে ভালো। সরকার যদি জনগণের ভোট কেড়ে নেওয়ার ফন্দি করে, তাহলে দেশবাসীও ঘরে বসে থাকবে না।