আর্থিক প্রতিবেদন আইন ও শঙ্কা…দেওয়ান নুরুল ইসলাম

ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশের উন্নয়ন, বিদেশি বিনিয়োগ, শক্তিশালী পুঁজিবাজারসহ সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম পূর্বশর্ত স্বচ্ছ, সঠিক ও মানসম্পন্ন আর্থিক প্রতিবেদন (ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্ট)। দেশের হিসাব ও নিরীক্ষা পেশার মানোন্নয়নের জন্য তাগিদ দিয়ে আসা হয় সে কারণেই।
বাংলাদেশে হিসাব ও নিরীক্ষা পেশার শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, সনদ প্রদান এবং নিরীক্ষা পেশার চর্চা সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমের প্রধান দায়িত্ব পালন করছে দি ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউনট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএবি)। এটি রাষ্ট্রপতির আদেশের (১৯৭৩ সালের ২ নম্বর আদেশ) মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত ও সংবিধিবদ্ধ সংস্থা হিসেবে হিসাব পেশা চর্চার অনুমোদন ও নিয়ন্ত্রণ প্রদানে ক্ষমতাপ্রাপ্ত। তাই হিসাব ও নিরীক্ষা পেশার মান নিয়ে প্রশ্ন উঠলে আইসিএবির দিকেই অঙ্গুলি নির্দেশিত হয় ও হবে। আইসিএবি এ ব্যাপারে যথাযথ ভূমিকা পালন করতে পারছে কি না, সেটাও আলোচনায় আসে ও আসবে।
সন্দেহ নেই যে দেশের নিরীক্ষা পেশার ও আর্থিক প্রতিবেদনের মানোন্নয়ন প্রয়োজন। এমন নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন বিরল নয়, যার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত আর্থিক অবস্থা অসংগতিপূর্ণ এবং তা বিনিয়োগকারী ও সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা পূরণে সক্ষম নয়। সাধারণত কোনো প্রতিষ্ঠানের আর্থিক প্রতিবেদন প্রস্তুত করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের। আইসিএবি কর্তৃক সনদ প্রদানকৃত নিরীক্ষা ফার্মগুলো সেসব আর্থিক প্রতিবেদন নিরীক্ষা করে, সেগুলো যথাযথ কি না, তার প্রত্যয়ন দেয়। এ ক্ষেত্রে নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবহেলা বা ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকলে সংশ্লিষ্ট নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান যেমন দায়ী, তেমনিভাবে আইসিএবিরও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। সে কারণে কোনো নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানকে নিরীক্ষা পেশা চর্চার অনুমোদন দেওয়ার সময় যেমন নানা দিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়, তেমনি নির্দিষ্ট সময় অন্তর এসব প্রতিষ্ঠান সরেজমিনে পরিদর্শন করে সক্ষমতা যাচাই করা হয়। এসব ক্ষেত্রে আইসিএবি কোনো অসংগতি পেলে নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর সনদ স্থগিতকরণ, সংশ্লিষ্ট নিরীক্ষককে নিরীক্ষা কাজ থেকে বিরত রাখা, আর্থিক জরিমানাসহ নানা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে। এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংক, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) অথবা যেকোনো নিয়ন্ত্রক সংস্থা এমনকি কোনো বিনিয়োগকারীর কাছ থেকে কোনো অভিযোগ পেলে তা আইসিএবি তদন্ত করে অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনায় শাস্তি প্রদান করে। এসব ক্ষেত্রে অপরাধভেদে আইসিএবি কর্তৃক কঠিন শাস্তি প্রদানের অনেক নজির রয়েছে।
তবে যেসব নিয়ন্ত্রক সংস্থা তাদের কাজের অংশ হিসেবে আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে থাকে, তাদের যোগ্যতাসম্পন্ন হিসাব বা নিরীক্ষাবিদ না থাকায় যেসব অভিযোগ আইসিএবিতে পাঠানো হয়, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা খুব দুর্বল ভিত্তির ওপর হওয়ায় আইসিএবির পক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া অনেক সময়ই সম্ভব হয় না। বিস্ময়কর সত্য হচ্ছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগ, বিএসইসি, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বা এ রকম নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানে কোনো সনদপ্রাপ্ত হিসাববিদ (চার্টার্ড অ্যাকাউনট্যান্ট বা সিএ) কর্মরত নেই। আসলে বাংলাদেশ ব্যাংক যখন কোনো ব্যাংকের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে বা বিএসইসি যখন আইপিওর জন্য আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানের আর্থিক প্রতিবেদন পরীক্ষা করে, তখন সেগুলো ভালোভাবে বিশ্লেষণ করা হলে অনেক সমস্যার সমাধান সম্ভব। তাই বিএসইসিসহ সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানগুলোয় দ্রুত দক্ষ সিএ নিয়োগ দেওয়া জরুরি। হিসাবের স্বচ্ছতা ও গুণগত মানের স্বার্থে এটা করতে হবে।
ইতিমধ্যে হিসাব ও নিরীক্ষা পেশা এবং আর্থিক প্রতিবেদনের মান উন্নয়নের জন্য সরকার ‘ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং অ্যাক্ট, ২০১৩’ আইনের খসড়া প্রকাশ করেছে। কিন্তু প্রস্তাবিত আইনটি নানা সীমাবদ্ধতায় ভরা। বিশেষত এই আইনের অধীনে যে একটি ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল গঠনের কথা বলা হয়েছে, তার কাঠামোটিই ত্রুটিপূর্ণ। প্রস্তাবিত আইন অনুসারে এই কাউন্সিলের চেয়ারম্যান হবেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর। সদস্য হিসেবে থাকবেন বিএসইসির চেয়ারম্যান; বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) চেয়ারম্যান; জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান; আইসিএবি ও আইসিএমএবির সভাপতিদ্বয়; অর্থ মন্ত্রণালয়ের দুজন (অর্থ বিভাগ থেকে একজন, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ একজন) এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একজন প্রতিনিধি (অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদার); সরকার কর্তৃক মনোনয়নকৃত দুজন বিশেষজ্ঞ, যাঁরা আইসিএবির সদস্য হবেন না; এবং কাউন্সিলের একজন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। দেখা যাচ্ছে, প্রথম ছয়জন সদস্য তাঁদের নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও দায়িত্বশীল ভূমিকায় নিয়োজিত। সংগত কারণেই প্রস্তাবিত কাউন্সিলে তাঁদের পক্ষে সময় দেওয়া সম্ভব হবে না। আবার সরকার বিশেষজ্ঞ হিসেবে যে দুজনকে কাউন্সিলে মনোনয়ন দেবেন, তাঁরা কেন চার্টার্ড অ্যাকাউনট্যান্ট হতে পারবেন না, তার যুক্তিও বোধগম্য নয়। হিসাব ও নিরীক্ষা পেশায় বিশেষজ্ঞ হিসেবে সারা বিশ্বে যেখানে চাটার্ড অ্যাকাউনট্যান্টরা স্বীকৃত, সেখানে তাঁদের বাদ দিয়ে বিশেষজ্ঞ সদস্য নিয়োগের প্রস্তাব সত্যিই অদ্ভুত।
আবার কাউন্সিলের সদস্যরা ছাড়াও একজন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবং অনূর্ধ্ব চারজন নির্বাহী কর্মকর্তা রাখার কথা বলা হয়েছে। প্রধান নির্বাহী হিসেবে ব্যবসা প্রশাসন/বাণিজ্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিসহ ১৫ বছরের অভিজ্ঞতা আর নির্বাহী কর্মকর্তা পদে বাণিজ্যে স্নাতকোত্তরসহ ১০ বছরের অভিজ্ঞতার প্রস্তাব করা হয়েছে। কাউন্সিলের বেশির ভাগ সদস্যই যেখানে নিজস্ব দাপ্তরিক কাজে অতি ব্যস্ত থাকবেন, সেখানে নির্বাহীদেরই অনেক গুরুত্বপূর্ণ ও প্রধান ভূমিকা পালন করতে হবে। সে ক্ষেত্রে সাধারণ শিক্ষা ও কর্ম-অভিজ্ঞতা নিয়ে তাঁরা হিসাব ও নিরীক্ষা পেশার মতো একটি বিশেষায়িত পেশার নিয়ন্ত্রণ ও উন্নয়নে কতটুকু কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবেন?
সম্ভবত এ চিন্তা করেই প্রস্তাবিত আইনে কাউন্সিলের কার্যসম্পাদনে সহায়তা করা আইসিএবির জন্য বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। আবার আইনের প্রবিধান প্রণয়নে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন প্রকাশ করে সংশ্লিষ্ট সবার মতামত গ্রহণ করার জন্য কাউন্সিলকে বলা হয়েছে। হিসাব ও নিরীক্ষা পেশার মান প্রবিধান প্রণয়নে এভাবে পরামর্শ গ্রহণ কতটুকু কার্যকর হবে তা বোধগম্য নয়। হিসাব ও নিরীক্ষা মানসমূহ (অ্যাকাউন্টিং ও অডিটিং স্ট্যান্ডার্ডস) এ-সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সংস্থা কর্তৃক অনুমোদিত এবং সারা বিশ্বে সেভাবেই গৃহীত হয়। সর্বোপরি প্রস্তাবিত আইন বিদ্যমান অন্যান্য আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক, এমনকি এর ধারা/উপধারা একে অপরের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। অসংখ্য ভুলে ভরা এ আইনটির খসড়া এমন অযত্ন, অবহেলা ও দুর্বলভাবে করা হয়েছে যে সরকারি প্রতিষ্ঠানের নামগুলো পর্যন্ত এতে সঠিকভাবে সন্নিবেশিত হয়নি। বাস্তবতাবিবর্জিত ও উদ্দেশ্য সাধনের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বিধায় এটি দেশের অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব ফেলবে। বরং সরকারি নির্বাহী ও সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থার প্রধানদের সমন্বয়ে আইসিএবির গঠন কাঠামোতে পরিবর্তনসহ ‘বাংলাদেশ চার্টার্ড অ্যাকাউনট্যান্টস আদেশ, ১৯৭৩’-এর প্রয়োজনীয় সংশোধন এনে আইসিএবিকে অধিকতর শক্তিশালী ও নিরপেক্ষ করলে হিসাব ব্যবস্থাপনা ও নিরীক্ষা কার্যক্রমে আরও স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা হবে। আর যদি ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল গঠন করতেই হয়, তবে যুক্তরাজ্যের এফআরসির আদলে গঠন করা উচিত। নীতিগত ও গুরুত্বপূর্ণ কার্যাবলি বাদ দিয়ে দৈনন্দিন ও পুনরাবৃত্তিমূলক কাজের জন্য ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল নাম দিয়ে একটি গতানুগতিক সরকারি আমলাতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গঠন করা হলে তা হবে হিসাব ও নিরীক্ষা পেশার ধ্বংসের সূচনা। এতে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশ ও অর্থনৈতিক অগ্রগতি।
দেওয়ান নুরুল ইসলাম: সনদপ্রাপ্ত হিসাববিদ (এফসিএ)।