আশরাফ-ফখরুল সংলাপের প্রস্তাব খালেদা জিয়ার

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া তাঁর দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের মধ্যে আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছেন। বাংলাদেশে চীনের রাষ্ট্রদূত লি জুনের সঙ্গে বৈঠকে তিনি ওই প্রস্তাব দেন। সোমবার রাতে বিএনপি চেয়ারপারসনের ঢাকার গুলশান কার্যালয়ে ওই বৈঠক হয়। পরে দলটির ভাইস চেয়ারম্যান ও সাবেক পররাষ্ট্রসচিব শমসের মবিন চৌধুরী জানান, দুই দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে চীনের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বিএনপি চেয়ারপারসনের আলোচনা হয়েছে। চীন দূতাবাসও সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ওই বৈঠকে আলোচিত প্রধান ইস্যুগুলো গণমাধ্যমকে জানায়।
এদিকে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মোহাম্মদ নাসিম গতকাল মঙ্গলবার কালের কণ্ঠকে বলেছেন, ‘কোনো সংলাপ হবে না। কারণ তার সুযোগ শেষ হয়ে গেছে।’
আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘রাজনৈতিক দলের সঙ্গে অন্য রাজনৈতিক দলের সংলাপ হতে পারে। কিন্তু কোনো যুদ্ধাপরাধী বা জঙ্গিবাদী দলের সঙ্গে সংলাপ হতে পারে না।’ তিনি বলেন, ‘কোনো নেতা সংলাপে গেলে রাজনৈতিকভাবে তাঁর মৃত্যু ঘটবে। নির্বাচন সংবিধান অনুযায়ীই হবে।’
খালেদা জিয়ার সঙ্গে রাষ্ট্রদূত লি জুনের বৈঠক প্রসঙ্গে চীন দূতাবাসের সংবাদ বিজ্ঞপ্তি থেকে জানা যায়, বন্ধু হিসেবে চীন বাংলাদেশে চলমান রাজনৈতিক অচলাবস্থায় উদ্বিগ্ন। চীন আশা করে, আগামী ২৫ অক্টোবরের পরও বিএনপির সম্ভাব্য কর্মসূচিগুলো শান্তিপূর্ণ হবে। ধর্মীয় ও জাতিগোষ্ঠী নির্বিশেষে সবার শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের প্রত্যাশাও জানিয়েছে দেশটি। সন্ত্রাস মোকাবিলায় আঞ্চলিক সহযোগিতারও তাগিদ দিয়েছে চীন। বিএনপি চেয়ারপারসন এসব ইস্যুতে তাঁর দলের অবস্থান তুলে ধরেছেন।
চীনা দূতাবাস রাষ্ট্রদূত লি জুন ও বিরোধী দলের নেতা খালেদা জিয়ার মধ্যে আলোচনার প্রধান প্রধান যে অংশ প্রকাশ করেছে সেগুলো হলো-
লি জুন : বাংলাদেশে একটি বড় রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে দেশের জাতীয় ঐক্য, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সামাজিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। পারস্পরিক সহযোগিতাকে আরো সামনে এগিয়ে নেওয়া এবং প্রধান ও বড় স্বার্থসংশ্লিষ্ট ইস্যুগুলোতে চীনকে সমর্থন দেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সরকারগুলোর অব্যাহত সহযোগিতার জোরালো প্রশংসা করে চীন।
খালেদা জিয়া : সময়ের পরীক্ষায় পরীক্ষিত ও আন্তরিক বন্ধু হিসেবে চীন বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন অংশীদার। সিলেটে আমার বক্তৃতায় (গত শনিবার) আমি প্রকাশ্যে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে চীনের সম্পৃক্ততাকে স্বাগত জানিয়েছি। আমরা আশা করি, চীন বাংলাদেশে তার বিনিয়োগ বাড়াবে এবং একটি রপ্তানি প্রক্রিয়াজাতকরণ এলাকা প্রতিষ্ঠা করবে।
লি জুন : চীন এখন তার অর্থনীতি পুনর্গঠন করছে এবং সব ধরনের সংস্কারকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। ফলে বিশ্বের জন্য বিশাল বাজার সৃষ্টি হবে। আরো বেশি চীনা প্রতিষ্ঠান বিদেশে বিনিয়োগ করবে। চীন-ভারত-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডর গঠনের প্রস্তাবে সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দরের মতো প্রকল্পও রয়েছে। এগুলো অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশকে ভূতাত্তি্বকভাবে এগিয়ে নেবে এবং এ দেশকে দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণপূর্ব এশিয়া ও চীনের মধ্যে আঞ্চলিক সংযোগকারী দেশে পরিণত করবে।
বাংলাদেশের বন্ধু হিসেবে চীন এ দেশে চলমান রাজনৈতিক অচলাবস্থায়ও উদ্বেগ প্রকাশ করছে। আমরা দেখেছি যে, আগামী নির্বাচন সবার অংশগ্রহণে অবাধ ও সুষ্ঠু হওয়া উচিত বলে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ উভয়েই একমত পোষণ করছে। শীর্ষ রাষ্ট্রনায়করা আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ নিরসনে আগ্রহ দেখিয়েছেন। চীনা পক্ষ আন্তরিকভাবে আশা করে, উভয় দল আগামী নির্বাচনের জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করতে পরস্পরকে শুভেচ্ছা জানাবে, আস্থা সৃষ্টি ও ঐকমত্য গড়ে তুলবে।
খালেদা জিয়া : আগামীতে রাজনৈতিক পরিস্থিতি কেমন হবে তা নির্ভর করছে সরকার কী করে তার ওপর। নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন বিষয়ে আমরা সরকারের সঙ্গে আলোচনা করতে প্রস্তুত। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম দুপক্ষের প্রতিনিধি হতে পারেন।
লি জুন : সম্প্রতি আমি লক্ষ করেছি, বিএনপি শান্তিপূর্ণভাবে গণসংযোগ কর্মসূচি পালন করছে। আমি আরো দেখছি যে, ২৫ অক্টোবরের পর বিএনপি বড় রাজনৈতিক আন্দোলনে নামছে। আগামী দিনগুলোর কর্মসূচিও শান্তিপূর্ণ হবে বলে আমি বিশ্বাস করি।
খালেদা জিয়া : বিএনপি সংঘাতে বিশ্বাস করে না। আমরা সব সময়ই শান্তিপূর্ণভাবে আমাদের কর্মসূচি পালন করছি। যুদ্ধাপরাধের বিচার নিয়ে আমাদের প্রত্যাশা- বিচার সুষ্ঠু হওয়া উচিত এবং আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য মান অনুসরণ করা উচিত।
লি জুন : চীনও বহু ধর্মের ও বহু জাতিগোষ্ঠীর দেশ। আমরা বুঝি, নানা ধর্ম ও জাতিগোষ্ঠীর মানুষের পারস্পরিক সম্মান ও শান্তিতে বসবাস করা খুব গুরুত্বপূর্ণ।
খালেদা জিয়া : জাতিগোষ্ঠী ও ধর্ম নির্বিশেষে মানুষকে শান্তিতে বসবাস করার সুযোগ দেওয়া সব সময়ই বিএনপির অন্যতম বড় উদ্দেশ্য। এ দেশের একজন মানুষ যে ধর্মবিশ্বাসেই বিশ্বাসী হোক না কেন তিনি বাংলাদেশি।
লি জুন : সন্ত্রাস একটি বড় বৈশ্বিক ঝুঁকি। এটি মোকাবিলায় নিবিড় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা প্রয়োজন।
খালেদা জিয়া : আগামী নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি ক্ষমতায় এলে আমরা সন্ত্রাসের ব্যাপারে কোনো ছাড় দেব না।
লি জুন : আশপাশের পরিবেশ স্থিতিশীল না হলে কোনো দেশের উন্নয়ন হয় না।
খালেদা জিয়া : বিএনপি ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ, সাম্য ও সহযোগিতার সম্পর্ক গড়তে চায়।
চীনা দূতাবাস জানায়, খালেদা জিয়া জোর দিয়ে বলেছেন যে, বিএনপি শিক্ষা, বিনিয়োগ, উন্নয়ন, অবকাঠামো নির্মাণ ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে জোর দেবে।
তত্ত্বাবধায়ক ছাড়াই সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের সাফল্য দেখাতে চায় আওয়ামী লীগ। তবে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি দলীয় কোনো সরকারের অধীনে নির্বাচন প্রতিহত করার ঘোষণা দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের বন্ধুরাষ্ট্র ও উন্নয়ন সহযোগীরা আলোচনার মাধ্যমে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পথ বের করতে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়ে আসছে। জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন এরই মধ্যে দুই দফা তাঁর দূত বাংলাদেশে পাঠিয়ে রাজনীতিবিদদের আলোচনায় বসতে উৎসাহী করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ মহাসচিব দুই নেত্রীর সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেন। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি দুই নেত্রীকে চিঠি দিয়ে সংলাপের তাগিদ দিয়েছেন। এ ছাড়া বাংলাদেশে বন্ধুরাষ্ট্রগুলোর প্রতিনিধিরা রাজনীতিবিদদের সংলাপের আহ্বান জানাচ্ছেন। এরই ধারাবাহিকতায় অনেকটা নজিরবিহীনভাবে যুক্ত হয়েছে চীন। দেশটি সাধারণত অন্য কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে নাক গলায় না। কিন্তু গত ২১ আগস্ট প্রথমবারের মতো চীনের রাষ্ট্রদূত ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে সুষ্ঠু, বিশ্বাসযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের জন্য আওয়ামী লীগ ও বিরোধীদলীয় নেত্রীকে সরাসরি সংলাপে বসার আহ্বান জানান।
দুই নেত্রীকে আলোচনায় বসার আহ্বান জানানোর কারণ প্রসঙ্গে রাষ্ট্রদূত লি জুন সেদিন সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে বলেছিলেন, একটি দেশের উন্নয়নের জন্য স্থিতিশীলতা প্রয়োজন।
দুই নেত্রীকে আলোচনায় বসাতে চীন উদ্যোগ নেবে কি না সে বিষয়ে সেদিন জানতে চেয়েছিলেন সাংবাদিকরা। জবাবে চীনের রাষ্ট্রদূত বলেছিলেন, ‘আমি আপনাদের বলতে পারি, আলোচনার দিকে তাঁদের অগ্রসর করতে ইতিমধ্যে প্রয়াস চালিয়েছি। আমি এটি অব্যাহত রাখব। এর জন্য কোনো সম্ভাবনা থাকলে আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাব।’