আসছে চিকিৎসকদের ‘রেকর্ড পদোন্নতি’

বর্তমান সরকারের আমলে এর আগে দুই দফায় মোট দুই হাজার ৩৬৭ জন চিকিৎসককে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রথমবার পদোন্নতি পেয়েছেন ২০১১ সালে ৮৬৭ জন এবং দ্বিতীয়বারে পেয়েছেন চলতি বছরের মার্চ মাসে এক হাজার ৫০০ জন। এই দ্বিতীয়বারেরটা ছিল দেশের ইতিহাসে এক আদেশে চিকিৎসকদের সবচেয়ে বড় পদোন্নতি। আর এবার সরকারের শেষ সময়ে এসে চিকিৎসকদের ‘রেকর্ড পদোন্নতি’র প্রক্রিয়া চলছে। এটাই বর্তমান সরকারের আমলে চিকিৎসকদের জন্য শেষ দফা পদোন্নতি বলা হচ্ছে। আর এ দফায় একসঙ্গে প্রায় সাড়ে তিন হাজার চিকিৎসকের পদোন্নতি দেওয়া হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে পদের সংখ্যার চেয়েও অনেক বেশি পদোন্নতি হতে যাচ্ছে। তার চেয়ে বিস্ময়কর তথ্য হলো- এবার পদোন্নতিপ্রাপ্তদের মধ্যে সরকার সমর্থক চিকিৎসকদের পাশাপাশি বিরোধী দল বিএনপি, এমনকি জামায়াতপন্থী চিকিৎসকরাও থাকছেন। এ সপ্তাহের যেকোনো দিন বিভাগীয় পদোন্নতি কমিটি- ডিপিসির মাধ্যমে পদোন্নতিপ্রাপ্তদের তালিকা চূড়ান্ত ও ঘোষণা হতে পারে।
এ রকম বিস্ময়কর পদোন্নতির বিষয় জানাজানি হওয়ার পর ইতিমধ্যে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়জুড়ে একে ‘আখেরি প্রমোশন’ বলে ব্যাপক আলোচনা চলছে। ধারণা করা হচ্ছে, ভবিষ্যতে সরকার ও রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলেও বর্তমান সরকারদলীয় চিকিৎসকদের নিজেদের পিঠ বাঁচানো এবং নির্বিঘ্নে চাকরি করা ও সহাবস্থানের পথ সুগম রাখতেই এবার এমন উদার হওয়ার কৌশল নেওয়া হয়েছে। তা ছাড়া সরকারের শেষ সময়ে পদোন্নতি বাণিজ্যের মাধ্যমে প্রভাবশালীদের পকেট ভারী করার চিন্তা তো রয়েছেই।
স্বাস্থ্যসচিব এম এম নিয়াজ উদ্দিন গতকাল শুক্রবার বিকেলে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের প্রক্রিয়া এগিয়ে চলছে, ঠিক এ সপ্তাহে হবে কি না বোঝা যাচ্ছে না, তবে এ মাসের মধ্যেই হয়ে যাবে।’
অবশ্য সংখ্যার বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করে সচিব বলেন, ‘চার হাজার হবে না।’ তবে কত হতে পারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘যাচাই-বাছাই করে দেখা হচ্ছে।’
এদিকে এ ‘আখেরি প্রমোশনের’ সুযোগ নিতে কয়েক দিন ধরেই মন্ত্রণালয়ে দৌড়ঝাঁপ ও ভিড় বেড়ে গেছে বিভিন্ন পর্যায়ের চিকিৎসকের। নানামুখী তদবির সামলাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন মন্ত্রণালয়ের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তা থেকে শুরু করে নিচের সারির কর্মচারীরাও। এমনকি মন্ত্রণালয়ের বাইরেও এ তদবিরের ঢেউ লেগেছে। বিশেষ করে সরকারদলীয় প্রভাবশালী চিকিৎসক নেতাদের কর্মস্থলেও ঘুরে বেড়ান পদোন্নতিপ্রত্যাশীদের অনেকেই।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কাজ করাই মুশকিল হয়ে পড়েছে, পদোন্নতির তদবিরে অতিষ্ঠ অবস্থা। ফোন বন্ধ রেখেও কুলোতে পারছি না। পদোন্নতিপ্রত্যাশীরা নিজেরাও অতিষ্ঠ করে, আবার তাদের পক্ষে মন্ত্রী-এমপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতার চাপ সামলাতে হচ্ছে। এর আগে এত অস্থিরতায় আর পড়তে হয়নি। এবার হয়তো শেষ সুযোগটা সবাই নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে।’
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক খন্দকার মো. শিফায়েত উল্লাহ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আগের দুই ডিপিসিতে অনেকেই সুযোগ পাননি বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কারণে। তাই এবার যোগ্যদের মধ্যে থেকে যাতে সর্বোচ্চ সংখ্যক চিকিৎসককে পদোন্নতি দেওয়া যায় সে লক্ষ্যে কাজ চলছে। এ ক্ষেত্রে পদের চেয়েও অনেক বেশিসংখ্যক যোগ্য চিকিৎসক পদোন্নতি পাবেন, যা আগের দফায় পদোন্নতিপ্রাপ্তদের চেয়েও অনেকটা বেশি হবে। আশা করি, এবার আর কারো ক্ষোভ বা অসন্তোষ থাকবে না। এ ছাড়া কোনো অনিয়মও হবে না।
মহাপরিচালক বলেন, ‘এক কথায় বলা যায়, অধ্যাপক ও জুনিয়র কনসালট্যান্ট পর্যায়ের কেউ বাদ থাকবে না, সবার পদোন্নতি হচ্ছে। অন্যদের অনেকেরই হবে। মাঝারি পদের ক্ষেত্রে হয়তো সবাইকে সুযোগ দেওয়া সম্ভব নাও হতে পারে। তবু আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘২৭তম বিসিএস ছাড়া আগের সবাই যোগ্যতা অনুসারে পদোন্নতি পাবেন।’
বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন-বিএমএর মহাসচিব ও সরকারদলীয় চিকিৎসকদের সংগঠন স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ-স্বাচিপের মহাসচিব অধ্যাপক ডা. ইকবাল আর্সনাল বলেন, ‘আমরা খুব বেশি রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ে আমাদের পেশাকে খাটো করে ফেলি। কিন্তু এবার আমরা চাই এই ঘরানা থেকে বেরিয়ে আসতে। এ জন্য আমরা এবার কে আওয়ামী লীগপন্থী আর কে বিএনপি কিংবা অন্য দলের সমর্থক তা দেখছি না, আমরা চাই একজন সরকারি চিকিৎসক হিসেবে যাতে যোগ্যতার ভিত্তিতে সবাই পদোন্নতি পায়।’
স্বাচিপের মহাসচিব জোর দিয়ে বলেন, অবশ্যই বিএনপি বা অন্য দলের সমর্থকদের মধ্যে থেকে বড় একটি অংশ পদোন্নতি পাবে।
তবে বিএনপি সমর্থিত চিকিৎসকদের সংগঠন ডক্টর অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-ড্যাবের মহাসচিব অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ বলেন, ‘এই সরকার গত কয়েক বছরে যেভাবে আমাদের বঞ্চিত করেছে, নিপীড়ন করেছে, কেবল নিজেদের লোকদের পদোন্নতি দিয়েছে অনিয়মের মাধ্যমে, আর এখন হঠাৎ করে আমাদের চিকিৎসকদের বড় একটি অংশকে পদোন্নতি দেবে- এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়, আর এমন কোনো সমঝোতাও আমাদের সঙ্গে হয়নি।’
ড্যাবের মহাসচিব বলেন, ‘তবে সরকার কোনো দলমত না দেখে যারা বিধি অনুসারে পদোন্নতি পাওয়ার উপযুক্ত তাদের সবাইকেই পদোন্নতি দেবে- এটাই সরকারের দায়িত্ব হওয়া উচিত।’
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্রমতে, আগের পদোন্নতিগুলো নিয়ে বিরোধীদলীয় চিকিৎসকদের মধ্যে থেকে কেউ কেউ আদালতের আশ্রয় নিয়েছেন। আবার সরকারদলীয় অনেকেই পদোন্নতি বঞ্চিত হয়ে নানাভাবে অভিযোগ-অনুযোগ তুলেছেন, যা নিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে চাপের মধ্যে পড়তে হয়েছে।
ডা. ইকবাল আর্সনাল বলেন, ‘আমাদের মনে রাখতে হবে, আমরা সবার আগে চিকিৎসক। আমাদের মধ্যে দলীয় মতপার্থক্য থাকবে কিন্তু রাজনীতির কারণে যেন একে অন্যের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত কিংবা হয়রানির শিকার না হই কিংবা মানুষ যাতে আমাদের সেবাবঞ্চিত না হয়- সেটা নিশ্চিত করতে হবে।’
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বলেন, যাঁরা সরকারের চাকরি করেন আমাদের দিক থেকে তাঁদের মধ্যে দলমতের কোনো বিভাজনের প্রশ্ন নেই, আমরা সবাইকেই সরকারের কর্মকর্তা হিসেবে বিবেচনা করছি। আমাদের কাছে সবাই সমান।’
তবে ড্যাব মহাসচিব ডা. এম এ জাহিদ এ প্রসঙ্গে কিছুটা বিদ্রূপের সুরে বলেন, ‘এই শেষ সময়ে যদি এমন কিছু হয়েই যায়, তাহলে তো ভাবতে হবে দেশে সুশাসন এসে গেছে; কোনো অসুবিধা নেই।’
পদোন্নতির জন্য ড্যাবের কাছ থেকে কোনো রকম তালিকা নিয়েছে বা চেয়েছে কি না জানতে চাইলে ডা. জাহিদ বলেন, ‘আমরা কেন তালিকা দেব? তালিকা তো সংশ্লিষ্ট দপ্তরেই আছে। পদোন্নতি দিলে তো সেই তালিকা ধরেই দিতে পারে।’
এদিকে দীর্ঘদিন পর ডিপিসির মাধ্যমে বর্তমান সরকারের সময়ে দুই দফা চিকিৎসকদের পদোন্নতি দেওয়া হলেও উভয়বারেই ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ ওঠে যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও কেবল সরকারি দল সমর্থিত চিকিৎসক হওয়ায় অনেককে পদোন্নতি দেওয়ার। এমনকি চলতি বছরের মার্চে কিছুসংখ্যক চিকিৎসককে রাষ্ট্রপতির প্রমার্জনায় পদোন্নতির ব্যাপক সমালোচনা হয়। উভয় দফায়ই ড্যাবের পক্ষ থেকে প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। পদোন্নতি বাতিল ও নতুন করে পদোন্নতির প্রক্রিয়ার দাবিতে আদালতে রিট করা হয় বিএনপিপন্থী চিকিৎসকদের পক্ষ থেকে। স্বাচিপের ভেতরেও উভয় দফায় এ পদোন্নতি নিয়ে ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দেয়। এমনকি পদোন্নতি বঞ্চিত কেউ কেউ ক্ষোভে-দুঃখে চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন। আবার প্রায় ২০০ জন চিকিৎসক মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ করেছেন।