আসল প্রশ্ন, কে হবেন প্রধানমন্ত্রী…আলী রীয়াজ

আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশে যে রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দিয়েছে, তার সমাধান যে সিন্দুকে লুকানো, তার চাবি যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতেই আছে, তা প্রধানমন্ত্রী তাঁর সর্বশেষ ভাষণে আমাদের আবারও কার্যত স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। সিন্দুকের ভেতরে লুকানো বিষয়টি হলো ‘নির্বাচনকালীন সরকারের কাঠামো’, সেটা প্রধানমন্ত্রী অন্য কারও চেয়ে অবশ্যই কম বোঝেন না, বরং অনেকের চেয়ে ভালো বোঝেন। আর তাই তাঁর ১৮ অক্টোবরের ভাষণে সেটাই গুরুত্ব পেয়েছে। সমাধানের চাবি বিষয়ে তিনি প্রত্যক্ষভাবে কোনো কথা বলেননি, কিন্তু পরোক্ষভাবে বারবার আমাদের সামনে নেড়েচেড়ে দেখিয়েছেন বললে অত্যুক্তি হবে না। সেই চাবি যে প্রধানমন্ত্রী ব্যবহার করেননি, তা আমরা জানি। তাই সমাধানের সিন্দুক এখনো না খোলাই থাকল।
ফলে রাজনীতির অবস্থা ১৮ অক্টোবর বিকেলে যেখানে ছিল, সেখান থেকে এক কদম এগিয়েছে মনে করার কারণ নেই। প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনের সময় সর্বদলীয় সরকারের যে প্রস্তাব দিয়েছেন, তাতে কেউ কেউ আশ্বস্ত বোধ করছেন, একে ইতিবাচক বলেও বর্ণনা করেছেন। সেটা তাঁরা মনে করতেই পারেন। কেননা, তাঁরা সম্ভবত আশঙ্কা করেছিলেন যে প্রধানমন্ত্রী আরও কঠোর ভাষায় কথা বলবেন। প্রধানমন্ত্রী তাঁর বদলে বিএনপিকে আলোচনায় আসার জন্য আবারও আহ্বান জানিয়েছেন। কিন্তু তাঁর সঙ্গে এটা বলতে ভুলে যাননি যে আলোচনা অবশ্যই ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ বিষয়ে নয়। আলোচনাটা কীভাবে হবে, সেটাও তিনি বলেননি। চীনা রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে আলোচনায় বিরোধী নেত্রী মহাসচিব পর্যায়ে আলোচনার যে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, সে বিষয়ে কোনো অগ্রগতির কথা আমাদের জানা নেই। প্রধানমন্ত্রী বলতে পারতেন যে এ জন্য তিনি কাউকে দায়িত্ব দিচ্ছেন কি না।
প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবকে যাঁরা ‘নতুন প্রস্তাব’ বলে মনে করছেন, তাঁদের সবিনয়ে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে এটা নতুন প্রস্তাব নয়। এক বছরেরও বেশি সময় আগে প্রধানমন্ত্রী নিজেই তা উপস্থাপন করেছিলেন। বিবিসি বাংলা বিভাগ থেকে ২০১২ সালের ২৯ জুলাই প্রচারিত সাক্ষাৎকারে প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘নির্বাচনের সময় যে অন্তর্বর্তী মন্ত্রিসভা গঠন করা হবে, তাতে বিএনপিও অংশগ্রহণ করতে পারবে।’ সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেন, ‘তারা (বিএনপি) পার্লামেন্টে এ জন্য প্রস্তাব দিতে পারে এবং সবাই মিলে একটি ছোট মন্ত্রিসভা করে আমরা নির্বাচন করতে পারি।’ মন্ত্রিসভার আকার বিষয়ে তখন যতটা স্পষ্ট বক্তব্য ছিল, এখন তার চেয়েও কম স্পষ্টতা লক্ষ করি। এই অস্পষ্টতা একার্থে ভালো এ কারণে যে বিরোধী দল বিএনপি যদি এই প্রস্তাবে রাজি হয়, তবে এ নিয়ে আলাপ-আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে। তখন এটা বলা সহজ হবে যে ক্ষমতাসীন দল বা প্রধানমন্ত্রী জোর করে কিছু চাপিয়ে দেননি। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী বলেননি যে এ নিয়ে আলোচনায় তিনি রাজি আছেন।
কিন্তু ‘ছোট আকারের’ সরকার বিষয়ে আমাদের একটা ধারণা অবশ্যই রয়েছে। আওয়ামী লীগের সমর্থক-বিশ্লেষকেরা অনেক দিন ধরেই এ বিষয়ে কথাবার্তা বলেছেন। ক্ষমতাসীন দলের সমর্থক সংবাদপত্র জনকণ্ঠ-এ ২০১২ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানিয়েছিল যে সরকারি দল ১১ সদস্যের মন্ত্রিসভা গঠনের পক্ষে, তাতে সরকার বিএনপিকে পাঁচটি আসন দিতে রাজি আছে। পরে এ ধরনের প্রস্তাব আরও অনেকেই দিয়েছেন।
কিন্তু সেই চিন্তাও কি নতুন কিছু? যাঁরা ১৯৯৪ সালের ইতিহাস জানেন, তাঁরা বলবেন অবশ্যই নয়। সেটা এখনকার মতোই অক্টোবর মাসের ঘটনা। ক্ষমতাসীন বিএনপি বিরোধী দলের ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার’-এর দাবি নাকচ করে দিয়েছিল এই বলে যে সংবিধানে এমন কোনো ব্যবস্থা নেই। খালেদা জিয়া কথায় কথায় সংবিধানের দোহাই দিচ্ছিলেন। সেই প্রেক্ষাপটে কমনওয়েলথের মহাসচিব চিফ এমেকা এনিয়াওকুর বিশেষ দূত স্যার নিনিয়ান স্টিফেন ১৯৯৪ সালের ১৩ অক্টোবর ঢাকায় এসে দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা মাস খানেক ধরে অব্যাহত রেখেছিলেন। এরই একপর্যায়ে স্যার নিনিয়ানের প্রস্তাব ছিল নির্বাচনের সময় প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ১১ সদস্যের একটি সর্বদলীয় মন্ত্রিসভা গঠন, যাতে প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারি দলের পাঁচজন এবং বিরোধী দলের পাঁচজন মন্ত্রী থাকবেন। তাঁরা সবাই তৎকালীন জাতীয় সংসদের নির্বাচিত সাংসদদের মধ্য থেকে মনোনীত হবেন। এ ছাড়া বাকি একজন নির্দলীয় নিরপেক্ষ ব্যক্তি মন্ত্রিসভার অন্তর্ভুক্ত হবেন, যাঁর ওপর স্বরাষ্ট্র, সংস্থাপন ও তথ্য মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়গুলোর দায়িত্ব দেওয়া হবে। আমরা জানি যে, শেখ হাসিনা এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। শুধু তা-ই নয়, আওয়ামী লীগ স্যার নিনিয়ানের বিরুদ্ধে পক্ষপাতদুষ্টতার অভিযোগ এনে তা কমনওয়েলথের মহাসচিবের কাছেও জানিয়েছিল। চিফ এমেকা এনিয়াওকু অবশ্য সে সময় পাকিস্তানে এক সংবাদ সম্মেলনে তা অগ্রাহ্য করেন। ১৪ নভেম্বর হতাশ ও ব্যর্থ স্যার নিনিয়ান ঢাকা ত্যাগ করেন। তার পরের কথা বহুবার আলোচিত, সবার জানা।
১৯৯৪ সালে সরকারের বিরোধী দল হিসেবে আওয়ামী লীগের কাছে যা গ্রহণযোগ্য ছিল না, তা এখন কেন সরকারের বিরোধী দল বিএনপির কাছে গ্রহণযোগ্য হবে বলে প্রধানমন্ত্রী মনে করেন, আমার কাছে বিষয়টি স্পষ্ট নয়। একইভাবে প্রধানমন্ত্রী ২০১২ সালে বলার পর যে বিষয়ে আর কোনো পদক্ষেপ কিংবা ব্যবস্থা নেননি, এ নিয়ে জনমত তৈরির চেষ্টা করেননি, তার ওপর বিরোধীরা আস্থা রাখবে—এমন আশার কারণও দেখি না। তার পরও সংকট মোচনের পথ যদি এটাকেই সরকারি দল মনে করে থাকে, তাহলে দরকার সেটা এখন বিস্তারিত বলা, এক বক্তব্যে ইঙ্গিত দেওয়াই যথেষ্ট নয়। আরেকটা বিষয় হলো, যে ‘সর্বদলীয় অন্তর্বর্তী সরকার’ হবে, তাতে সংসদে যাঁদের প্রতিনিধিত্ব আছে, তাঁদের সবাইকে নেওয়া হবে কি না। সে ক্ষেত্রে জামায়াতে ইসলামী, যার নিবন্ধন এখন বাতিল হয়ে আছে, তারাও কি অংশ নিতে পারবে? বিএনপি যদি ১৮-দলীয় জোট হিসেবে অংশ নিতে চায় এবং জামায়াতের সদস্যদের মনোনীত করে, তা আওয়ামী লীগের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে বলে মনে করার কারণ দেখি না, কিন্তু সেই প্রশ্নকে আলোচনার বাইরে রাখার সুযোগ প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে নেই। টিআইবির পক্ষ থেকে গত এপ্রিল মাসে দেওয়া প্রস্তাবে বলা হয়েছিল, ‘বিগত তিনটি সংসদ নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোটের দলীয় অনুপাতের ভিত্তিতে মন্ত্রিসভার সদস্য মনোনীত’ করা যেতে পারে। ক্ষমতাসীন দল সর্বদলীয় সরকার গঠনের ব্যাপারে এসব বিষয় বিবেচনা করেছে কি না, আমাদের তা জানা নেই।
এসব অবশ্য একার্থে গৌণ বিষয়, সেটা আমরা কমবেশি সবাই জানি। কেননা, আসল প্রশ্নটি হলো, প্রধানমন্ত্রী কে হবেন। শেখ হাসিনা এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্যে কিছু বলেননি। পাছে তাতে ভুল বোঝার আশঙ্কা তৈরি হয়, সেই কারণেই আওয়ামী লীগের নেতারা সঙ্গে সঙ্গেই জানিয়ে দিয়েছেন যে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধানমন্ত্রীর পদ আলোচনার বিষয় নয়; এখানে শেখ হাসিনার কোনো বিকল্প নেই বলেই তাঁদের মত। সংবিধানের ৫৬(৩) অনুচ্ছেদে বলা আছে, ‘যে সংসদ সদস্য সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের আস্থাভাজন বলিয়া রাষ্ট্রপতির নিকট প্রতীয়মান হইবেন, রাষ্ট্রপতি তাঁহাকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করিবেন।’ এই মুহূর্তে তা আওয়ামী লীগের প্রধান শেখ হাসিনা, কিন্তু তাঁর এবং তাঁর দলের সম্মতি থাকলে অন্য যেকোনো সাংসদই সেই অবস্থানে যেতে পারেন। প্রধানমন্ত্রী সেই বিকল্পে রাজি আছেন কি না, আমরা তা জানি না। কিন্তু আমরা জানি যে সংকট সমাধানের চাবিকাঠি সেটাই। সিন্দুক খুলতে চাইলে এই বিষয়েই কথা বলতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী এই বিষয়ে বলেননি। কিন্তু তাই বলে বিরোধীরা তা নিয়ে বলতে পারবে না, তা নয়। বিএনপি প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করবে বলেই ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া ইতিবাচক বলে মনে করার কারণ নেই। কিন্তু তারা কি বলে দেখতে পারে যে আর কেউ প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিলে ক্ষমতাসীন দল তাতে রাজি কি না? বিএনপির নেতারা বলতে পারেন, তাঁরা এ বিষয়ে আগেই বলেছেন, বহুবার বলেছেন যে তাঁরা শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের অধীনে নির্বাচন করবেন না। কিন্তু এখন যেহেতু প্রধানমন্ত্রী প্রস্তাব দিয়েছেন, তাঁদের উচিত হবে এ বিষয়ে তাঁদের বক্তব্য স্পষ্ট করে পাল্টা প্রস্তাব হাজির করা। মনে রাখা দরকার, মন্ত্রিসভায় অনির্বাচিত টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী থাকা নতুন ঘটনা হবে না। বর্তমান মন্ত্রিসভায় এই কোটায় রাজনীতিবিদদেরও মন্ত্রী করা হয়েছে। ১১ জনের মন্ত্রিসভায় যদি একজন এই ধরনের মন্ত্রী থাকেন, যাঁর প্রতি সংসদের ‘সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের’ ‘আস্থা’ রয়েছে, তা কি অসম্ভব কিছু? প্রধানমন্ত্রী যদি প্রকারান্তরে ১৯৯৪ সালের স্যার নিনিয়ানের প্রস্তাব পুনরুজ্জীবিত করতে পারেন, তবে বিরোধী নেতারা নিশ্চয় তাতে তাঁদের দাবিকেও যুক্ত করতে পারেন।
অনেকেই কয়েক দিন ধরে বলে আসছেন যে সরকার চায় না বিএনপি নির্বাচনে আসুক। তাঁরা প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যকে সরকারি দলের কৌশল হিসেবেই দেখছেন। প্রধানমন্ত্রী বল এখন বিএনপির কোর্টে ঠেলে দিয়েছেন, যাতে করে যে সিদ্ধান্তই বিএনপি গ্রহণ করুক না কেন, তার জন্য সরকারকে দায়ী করা না যায়। যদি সরকারি দল কৌশল হিসেবেও এই প্রস্তাব হাজির করে থাকে, বিএনপির দায়িত্ব হচ্ছে সে বিষয়ে তাদের পাল্টা প্রস্তাব দিয়ে সেই কৌশল মোকাবিলা করা; কেবল তা প্রত্যাখ্যান করাই যথেষ্ট নয়। তারা বলতেই পারে, অন্য কী কী বিষয় নিয়ে তারা আলোচনার দরকার মনে করে।
তবে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পর সরকারের পক্ষ থেকে নেওয়া পদক্ষেপ বিএনপি ও সরকারের সমালোচকদের এই বক্তব্যকেই শক্তিশালী করেছে যে সরকার এখনো পথ খুঁজছে কী করে বিএনপিকে নির্বাচনের বাইরে রাখা যায়। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এইচ টি ইমামের বক্তব্য ‘বিএনপি না এলেও ৪২টি দল আছে’—সরকারের মনোভাবের প্রকাশ কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়। এ ধরনের বক্তব্য যেকোনো ধরনের সমাধানের পথ রুদ্ধ করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। বিএনপির যেমন এখন দায়িত্ব সুস্পষ্টভাবে পাল্টা প্রস্তাব হাজির করা, তেমনি সরকারের কাজ হচ্ছে সংকট সমাধানে আন্তরিকতার প্রমাণ করা, বিএনপিকে ফাঁদে ফেলার মধ্যে সাময়িক লাভ থাকলেও থাকতে পারে, দীর্ঘ মেয়াদে তা সরকারি দল ও দেশ উভয়ের জন্যই ক্ষতিকর।
আলী রীয়াজ: পাবলিক পলিসি স্কলার, উড্রো উইলসন ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর স্কলারস, ওয়াশিংটন, যুক্তরাষ্ট্র।