আ. লীগ এমপিদের বিরুদ্ধে তৃণমূল নেতাদের অভিযোগ

দলীয় এমপিদের বিরুদ্ধে আবারও জনবিচ্ছিন্নতা ও নেতা-কর্মীদের অবমূল্যায়নের অভিযোগ এনেছেন আওয়ামী লীগের তৃণমূল নেতারা। দলীয় সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে এমপিদের কঠোর সমালোচনা করে তৃণমূল নেতারা বলেছেন, এমপিরা নেতা-কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন না। অনেকের বিরুদ্ধেই দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগও রয়েছে। এতে দল ও সরকারের ইমেজ ক্ষুণ্ন হচ্ছে।
সভার সূচনা বক্তব্যে সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ড তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, ‘বর্তমান সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে দেশে-বিদেশে ষড়যন্ত্র হচ্ছে। আমাদের উন্নয়ন অনেকেরই ভালো লাগে না। সে জন্য এ ষড়যন্ত্র হচ্ছে। গরিবের ঘরে সম্পদ থাকলে অনেকেরই নজর পড়ে।’ সভায় আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, যত ষড়যন্ত্রই হোক, নির্বাচন সংবিধানের আলোকে হবে। বিএনপি-জামায়াতের অপপ্রচারের কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, বিরোধী দলী নেতা কয়েক দিন আগেও বলেছেন, মতিঝিলে হেফাজতের সমাবেশে নাকি দেড় লাখ গুলি ছোড়া হয়েছে। এত গুলি ছুড়লে তো মতিঝিলের সব দালান ঝাঁঝরা হয়ে যেত। আর অধিকার বলল, ৬১ জন নিহত হয়েছে। দেখা গেল এ তালিকার ২৫ জনের কোনো নাম-ঠিকানা নেই। তিনজন এখনো বিভিন্ন মাদ্রাসায় পড়ছে।
পরে সভায় নীলফামারী জেলার সৈয়দপুর উপজেলার সাধারণ সম্পাদক বাদল, পিরোজপুর জেলার মঠবাড়িয়া উপজেলার সভাপতি ফেরদাউস ও বরিশাল মহানগর সদর উপজেলার সভাপতি নেতা-কর্মীদের অবমূল্যায়ন করা হচ্ছে বলে অভিযোগ আনেন। বরিশাল মহানগরের নেতারা স্থানীয় আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ঐক্যের ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপ চেয়েছেন।
গতকাল শনিবার গণভবনে আওয়ামী লীগের বরিশাল মহানগর, বরিশাল জেলা, মৌলভীবাজার, চুয়াডাঙ্গা, নীলফামারী, পিরোজপুর, বগুড়া, গোপালগঞ্জ, হবিগঞ্জ জেলা ও এসব জেলার সব থানা, উপজেলা ও প্রথম শ্রেণীর পৌর সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর মতবিনিময় বৈঠক হয়। এ সময় তৃণমূল নেতাদের অনেকেই বিভিন্ন অভিযোগ তুলে ধরেন।
তবে শেখ হাসিনা সব বিভেদ ও দ্বন্দ্ব ভুলে নির্বাচনী লড়াইয়ে একযোগে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, অনেকের মধ্যে ক্ষোভ থাকতে পারে, মান-অভিমানও থাকতে পারে। তবে সবাই যে কিছু পাননি এবং না পাওয়ার বেদনায় হতাশ- সেটিও ঠিক নয়। তারপরও সব চাওয়া-পাওয়ার হিসাব-নিকাশ বাদ দিয়েই আগামী নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীর পক্ষে কাজ করতে হবে। যেকোনো মূল্যে আওয়ামী লীগকে আবারও ক্ষমতায় আনতে হবে।
দীর্ঘ প্রায় ছয় ঘণ্টার এই বৈঠকে তৃণমূল নেতারা বেশ খোলামেলা কথা বলেছেন। শুরুতে তৃণমূল নেতাদের কাছে সম্ভাব্য তিনজন প্রার্থীর নামসহ ১০টি প্রশ্নসংবলিত একটি প্রশ্নপত্র তুলে দেন শেখ হাসিনা। তৃণমূল নেতাদের বলা হয়, একটি প্রশ্নের সর্বোচ্চ উত্তর ১০ এবং মোট নম্বর ১০০। নেতারা তা পূরণ করে প্রধানমন্ত্রীর হাতে তুলে দেন।
বৈঠকে বরিশালের মুলাদী ও বাবুগঞ্জ উপজেলার নেতারা স্থানীয় এমপি জাতীয় পার্টির গোলাম কিবরিয়া টিপুর বিরুদ্ধে সমন্বয়হীনতা ও অবমূল্যায়নের অভিযোগ তুলে ধরে বলেন, টিপু বিএনপি-জামায়াতের স্বার্থ দেখেন। আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের সঙ্গে তাঁর কোনো যোগাযোগ নেই।
বরিশালের গৌরনদী উপজেলার নেতারা হেফাজতের অপপ্রচারের কারণেই বরিশাল সিটি করপোরেশনে দলসমর্থিত মেয়র প্রার্থী শওকত হোসেন হিরণ হেরেছেন দাবি করে বলেন, দলের কেন্দ্রীয় নেতা আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ দলকে সুসংগঠিত করতে সর্বাত্মক তৎপরতা চালাচ্ছেন। তাঁর প্রচেষ্টায় জেলার ১৯টি পৌরসভার মধ্যে ১৭টিতেই দলসমর্থিত প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছেন। অবশ্য বানারীপাড়ার দলীয় লোকজন হিরণের পক্ষে কাজ করেননি বলে অভিযোগ তুলে ধরেন। এ সময় শেখ হাসিনা বলেন, প্রার্থী পছন্দ না হলেও প্রার্থীর বিপক্ষে কাজ করে হারানো মানে দলকে হারানো, প্রার্থীকে নয়।
নীলফামারীর নেতারা সংরক্ষিত মহিলা আসনের এমপি ড. হামিদা বানু শোভার কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করেন। তবে সদর উপজেলা ও পৌরসভার নেতারা নীলফামারী-২ আসনের এমপি আসাদুজ্জামান নূরকে আবারও এই আসনে প্রার্থী করার আহ্বান জানান। এই জেলার সৈয়দপুর ও কিশোরগঞ্জ উপজেলার নেতারা স্থানীয় এমপি কর্নেল (অব.) এ এ মারুফ সাকলাইনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ করে বলেছেন, তিনি টাকা খেয়েও দলীয় লোকজনের চাকরি দেননি। বরং নেতা-কর্মীদের অবমূল্যায়নই করেছেন।
বগুড়ার ধুনট উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অধ্যাপক টি আই নুরুন্নবী তারেক স্থানীয় এমপি হাবিবুর রহমানের সমালোচনা করে বলেন, ‘আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে তাঁকে বিজয়ী করলেও গত সাড়ে বছরে তিনি আমাদের কোনো কথা শোনেননি, বরং বিএনপি-জামায়াতের কর্মীদেরই চাকরি দিয়েছেন। তাঁরা জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মজিবুর রহমান মজনুকে মনোনয়ন দিতে প্রস্তাব করেন।
কাহালু উপজেলার সভাপতি হেলাল উদ্দিন কবিরাজ স্থানীয় সংরক্ষিত আসনের মহিলা এমপি খাদেজা খাতুনের সমালোচনা করে বলেন, তাঁর তৃণমূল নেতা-কর্মীদের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই।
এ সময় আওয়ামী লীগ নেতাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন দলের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য আবদুল লতিফ সিদ্দিকী, কাজী জাফর উল্যাহ, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, নূহ-উল আলম লেনিন, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ ও সদস্য আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ।