ইসিকে শক্তিশালী করার বিধান যোগ হয়নি

নির্বাচনী আইন বা গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংশোধনের যে প্রস্তাব গতকাল মন্ত্রিসভায় অনুমোদন পেয়েছে, তাতে নির্বাচন কমিশনকে আরো শক্তিশালী করার কোনো বিধান যুক্ত হয়নি। অথচ সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর পর নতুন এক পরিস্থিতিতে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের জন্য খোদ সরকারের পক্ষ থেকেই নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা বাড়ানোর প্রস্তাব রাখা হয়েছিল। কাজী রকিবউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন বর্তমান নির্বাচন কমিশনও দায়িত্ব গ্রহণের পর ঘোষণা দিয়েছিল, আগের কমিশনের প্রস্তাব অনুযায়ী শুধু চার মন্ত্রণালয়/বিভাগ নয়, নির্বাচনের সময় সব মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণ কমিশনের হাতে রাখা হবে। কিন্তু এ ধরনের উচ্চাভিলাষ থেকে দ্রুতই সরে আসে কমিশন এবং কিছু করণিক ত্রুটি, নির্বাচনে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের আরো কার্যকর ভূমিকা রাখার জন্য বিভিন্ন নির্বাচনী অপরাধে শাস্তির পরিমাণ কমানো, সময়োপযোগী করে প্রার্থীর ব্যয়সীমা নির্ধারণ, জামানতের পরিমাণ বাড়ানো- এ ধরনের প্রস্তাবেই সীমাবদ্ধ থাকে কমিশন।
এর ফল হিসেবে গতকাল মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত আরপিওতে যেসব বিধান সংশোধন ও সংযোজন হয়েছে তার মধ্যে রয়েছে- একজন প্রার্থীর সর্বোচ্চ ২৫ লাখ টাকা খরচ করার সুযোগ রেখে জাতীয় নির্বাচনে প্রার্থীদের নির্বাচনী ব্যয়সীমা বাড়ানো; বর্তমানে একজন প্রার্থী ১৫ লাখ টাকা ব্যয় করতে পারেন। এ ছাড়া রাজনৈতিক দলে ব্যক্তি বা সংস্থার অনুদানের সীমা বাড়ানো, প্রার্থীর জামানত বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য দণ্ডিত ব্যক্তিদের নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা ইত্যাদি। এসব বিধান রেখে ‘গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (সংশোধন) আইন, ২০১৩’-এর খসড়া ভেটিং সাপেক্ষে চূড়ান্ত অনুমোদন করেছে মন্ত্রিসভা।
এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ মহলের বক্তব্য, অবাধ ও দলীয় প্রভাবমুক্ত নির্বাচনের জন্য কমিশন নির্বাচনী আইনের বড় ধরনের কোনো সংস্কার প্রস্তাব দিতে না পারার কারণেই আরপিওতে এ বিষয়ে উল্লেখ করার মতো কোনো বিধান যুক্ত হচ্ছে না। এমনকি একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য নির্বাচনী আইনের কোন কোন বিষয়ে সংস্কার দরকার, নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে আরো কী উদ্যোগ নেওয়া দরকার- তা নিয়ে রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজের কোনো মতামত গ্রহণেরও পরামর্শ নেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেনি নির্বাচন কমিশন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সেনাবাহিনী নিয়োগ ছাড়া এক দিনে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে সারা দেশে নির্বাচন কিভাবে সম্ভব- এ প্রশ্নেও নির্বাচন কমিশনাররা এখনো প্রায় নির্বিকার। সংসদীয় আসনের সীমানা নির্ধারণ নিয়ে সংলাপে সুশীল সমাজ, গণমাধ্যম প্রতিনিধি এবং রাজনৈতিক দলগুলো বেশ কিছু প্রস্তাব রেখেছিল কমিশনের কাছে। কিন্তু আরপিও সংস্কার প্রস্তাবে সেসব প্রস্তাব কমিশন গ্রহণ করেনি। এমনকি কমিশনের ক্ষমতা কমাতে নির্বাচনী অপরাধের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বী কোনো প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিলের ক্ষমতা বা আরপিওর বহুল আলোচিত ৯১-ই অনুচ্ছেদটি বাতিলেরও প্রস্তাব করার প্রস্তুতি নিয়েছিল কমিশন। কিন্তু ব্যাপক সমালোচনার মুখে সে প্রস্তাব থেকে সরে আসে কমিশন।
নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) শক্তিশালী করার জন্য ড. এ টি এম শামসুল হুদার নেতৃত্বাধীন আগের ইসির অন্যতম প্রস্তাব ছিল নির্বাচনের সময় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় কমিশনের পরামর্শ ছাড়া কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলুপ্ত করার পরিপ্রেক্ষিতে আগের ইসি এ সংস্কার প্রস্তাব রেখে যায়।
এ ছাড়া প্রস্তাব ছিল নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরবর্তী এক মাস মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার, ডেপুটি কমিশনার, পুলিশ সুপার বা সংশ্লিষ্ট জেলায় বা মেট্রোপলিটন এলাকায় তাঁদের অধস্তন কোনো কর্মকর্তাকে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে আলোচনা ছাড়া বদলি করা যাবে না। বিদ্যমান আইনে এই সময়সীমা ১৫ দিন রয়েছে।
আগের নির্বাচন কমিশন এসব সংস্কার প্রস্তাব সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর কাছে হস্তান্তর করতে চেয়েছিল। কিন্তু ড. হুদা তাঁর শেষ কার্যদিবস পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে কোনো সাক্ষাৎসূচি পাননি। এ অবস্থায় প্রস্তাবগুলো আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এ সংস্কার প্রস্তাব প্রস্তুতের আগে নির্বাচন কমিশন রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপেরও আয়োজন করে। কিন্তু কাজী রকিবের নেতৃত্বে বর্তমান কমিশন গঠনের পর আইন মন্ত্রণালয় আগের কমিশনের ওইসব প্রস্তাব নবগঠিত কমিশনের মতামতের জন্য ফেরত পাঠিয়ে দেয়।
সার্বিক এই পরিস্থিতি সম্পর্কে সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজনের সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার গত রাতে কালের কণ্ঠকে বলেন, আরপিওতে প্রয়োজনীয় সংশোধনী এনে নির্বাচন কমিশনকে আরো শক্তিশালী করে একটি নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পথ প্রশস্ত করা যেত। কিন্তু যেভাবে আরপিও সংশোধন হচ্ছে তাতে এ বিষয়ে কোনো সুফল আসবে না। এ ছাড়া প্রার্থীর ব্যয়সীমা বাড়ানোর বিধানটিও গণবিরোধী।
এদিকে গতকাল মন্ত্রিসভা বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদের সচিব মোহাম্মদ মোশাররাফ হোসাইন ভূইঞা সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন। তিনি জানান, জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সংগতি রেখে নির্বাচনী ব্যয় বাড়ানো হয়েছে।
জাতীয় নির্বাচনে প্রার্থীদের জামানত ১০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা করা হয়েছে। রাজনৈতিক দলে ব্যক্তির অনুদানসীমা ১০ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৫ লাখ টাকা করা হয়েছে। আর সংস্থার অনুদানের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চসীমা ২৫ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫০ লাখ টাকা করা হয়েছে। প্রার্থীদের নির্বাচনী ব্যয়সীমা বাড়ানো হলেও দলীয় প্রধানদের নির্বাচনী ভ্রমণ এই ব্যয়ের অন্তর্ভুক্ত হবে না। কারণ দলীয় প্রধান তাঁর পুরো দলের প্রার্থীদের জন্য সারা দেশ সফর করেন। সংশোধিত আরপিওতে নির্বাচনী মামলার জন্য জামানত দুই হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে পাঁচ হাজার টাকা করা হয়েছে। খসড়ার চূড়ান্ত অনুমোদনের ফলে সংশ্লিষ্ট এলাকার ভোটার ছাড়া পোলিং এজেন্ট হতে পারবেন না। এ ছাড়া সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলির বিষয়ে নির্বাচন কমিশন কোনো নির্দেশনা দিলে যথাশিগগির কার্যকর করারও বিধান রাখা হয়েছে।
সংশোধিত আরপিওতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য দণ্ডিত ব্যক্তিদের নির্বাচনে অযোগ্য করা হয়েছে। বিদ্যমান আরপিওতে বলা হয়েছে, যুদ্ধাপরাধে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক আদালত/ট্রাইব্যুনালে সাজাপ্রাপ্ত হলে তাঁরা নির্বাচনে অংশগ্রহণের অযোগ্য হবেন। সংশোধিত আইনে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাজাপ্রাপ্তদেরও এর আওতায় আনা হয়েছে। এর আগে ১৯৭২ দালাল আইন ও আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনে সাজাপ্রাপ্তদের ভোটার হওয়ার পথ বন্ধ করতে গত ২ সেপ্টেম্বর ভোটার তালিকা আইন সংশোধনের প্রস্তাব অনুমোদন করে মন্ত্রিসভা। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মামলায় দণ্ডিত যাঁরা হাইকোর্টে আপিল করেছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে এ আইন প্রযোজ্য হবে কি না, জানতে চাইলে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, ‘এ বিষয়ে খসড়ায় কিছু বলা হয়নি।’
নির্বাচনের বিষয় ছাড়াও গতকালের মন্ত্রিসভা বৈঠকে ‘মাল্টি লেভেল মার্কেটিং কার্যক্রম (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১৩’ খসড়ার চূড়ান্ত্ত অনুমোদন করা হয়েছে। ‘এশিয়ান রি-ইনস্যুরেন্স করপোরেশন আইন, ২০১৩’-এর খসড়ার অনুমোদন করা হয়। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের ২০১২-১৩ অর্থবছরের কার্যাবলিসম্পর্কিত বার্ষিক প্রতিবেদন অবহিত করা হয়।