তৈরি পোশাকশিল্প

ঈশান কোণে কালো মেঘ…আলী ইমাম মজুমদার

গার্মেন্টস বা তৈরি পোশাকশিল্প এ দেশে ক্রমেই বিকশিত হচ্ছে। শ্রমঘন শিল্প এটি। এখন ২১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের পণ্য তারা রপ্তানি করে। এ খাতে সরাসরি কাজ করছেন প্রায় ৩০ লাখ শ্রমিক। তদুপরি দেশের বস্ত্রশিল্প, ব্যাংক, বিমা, পরিবহন, গৃহায়ণসহ বিভিন্ন খাতে এটি রাখছে প্রভূত অবদান। এই শিল্পের শ্রমিকদের বিশাল অংশ নারী। এটা প্রভাব ফেলছে নারীর ক্ষমতায়নে। এর উত্তরোত্তর বিকাশ ঘটুক, এটা দেশের প্রত্যেকেই চান। এর সাফল্যের কৃতিত্ব উদ্যোক্তা শ্রেণী ও সরকারের বিভিন্ন প্রণোদনার। পাশাপাশি কম বেতনে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করা এই শিল্পের শ্রমিকদের অবদানই একে আজকের পর্যায়ে আনতে মূল নিয়ামকের কাজ করেছে। আর এই শ্রমিকেরা জীবন ধারণের ন্যূনতম পরিমাণ বেতনও পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করছেন হামেশাই। পাশাপাশি কারখানাগুলোর নিরাপত্তাব্যবস্থাও অনেক ক্ষেত্রেই শোচনীয় রকমের অপ্রতুল। এতে হতাহতের ঘটনা ঘটেছে অনেক। রানা প্লাজার সাম্প্রতিক কালের বিয়োগান্ত ঘটনাটি তো এ শিল্পে স্মরণকালের সব দুর্ঘটনায় হতাহতের যোগফলকেও অনেক পেছনে ফেলেছে এককভাবেই। ভবনের মালিক, কারখানার মালিক ও কর্মকর্তাদের পাশাপাশি সরকারি কর্মকর্তাদের ঔদাসীন্য এবং ক্ষেত্রবিশেষে অবৈধ যোগসাজশ এ ধরনের বিয়োগান্ত ঘটনার জন্য দায়ী। এসব ঘটনার কারণে ক্রেতাদেশগুলোতে ভোক্তাদের চাপের মুখে থাকেন আমদানিকারকেরা। তা ছাড়া ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার এখানে থাকলেও এটা প্রয়োগে নিরুৎসাহিত করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
রানা প্লাজার দুর্ঘটনা, দেশে-বিদেশে একে নিয়ে আলোড়ন আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আমাদের জিএসপি-সুবিধা স্থগিত করায় নতুনভাবে চোখ খুলছে অনেকের। আমদানিকারকেরা এখন কারখানার মানোন্নয়নের চেষ্টা করছেন। ট্রেড ইউনিয়নের সুযোগ দেওয়ার বিষয়ে এখন মালিকেরা অনেকটা নমনীয় অবস্থানে রয়েছেন। হয়তোবা মূল ভোক্তাদের চাপে আগের অবস্থান থেকে সরতে হচ্ছে তাঁদের। আবার কারখানার কর্মপরিবেশ উন্নয়নের জন্য কিছু বড় আমদানিকারক এখন আর্থিক সহায়তাও দিতে শুরু করেছেন। অন্যদিকে আমাদের পোশাকশিল্পের মালিকদের অনেকেই আজ বাস্তবতা উপলব্ধি করতে শুরু করেছেন। তবে শ্রমিকদের বেতন যৌক্তিক পরিমাণে বাড়ানোর বিষয়ে তাঁদের অবস্থানকে এখনতক অবাস্তব রক্ষণশীল বলেই মনে হয়।
এ বিষয়ে শিল্পমালিক, শ্রমিক ও সরকারের প্রতিনিধির সমন্বয়ে গঠিত একটি বোর্ড কাজ করছে। যৌক্তিক আশা থাকবে, সেই বোর্ড, বিশেষ করে এর সরকার-নিযুক্ত প্রধান শিল্পমালিকদের সামর্থ্য আর শ্রমিকদের চাহিদার সঙ্গে সমন্বয় বিধান করে একটি ন্যূনতম বেতন নির্ধারণে সব পক্ষকে সম্মত করাতে সক্ষম হবেন। অবশ্য এ জন্য রাজনৈতিক নেতৃত্বের খুবই যত্নশীল, দৃঢ় ভূমিকাও প্রয়োজন। শ্রমিকের ন্যূনতম চাহিদার সঙ্গে মালিকের সামর্থ্যের সমন্বয় সাধনের কাজটি সহজ নয়, তবে সম্ভব। সবার সম্মিলিত সদিচ্ছায় উভয় পক্ষ উপকৃত হতে পারে। শ্রমিকের যৌক্তিক সচ্ছলতা শিল্পের উৎপাদনশীলতা বাড়াবে। মালিকদের জন্য এটা হবে পরোক্ষ বিনিয়োগ। মালিকেরা ২০ শতাংশ মজুরি বাড়াতে সম্মত বলে ঘোষণা দিয়েছেন। অনেকটা পরিহাসের মতোই বিষয়টা। এতে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। এমনিতে সব শিল্প খাতের মধ্যে এ শিল্পে মজুরি কম। দুর্ঘটনায় হতাহত ব্যক্তিদের প্রতি অনেক ক্ষেত্রে মালিকপক্ষ থাকে নির্বিকার। এ খাতের শ্রমিকদের কেউ কেউ ইংরেজ যুগের নীল চাষিদের সঙ্গেও তুলনা করেন। তুলনাটি একটু কঠোর হলেও একেবারে অমূলক নয়।
তারপর থাকছে ট্রেড ইউনিয়ন প্রসঙ্গ। ইপিজেড এলাকাগুলো একটি ভিন্ন আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। এর বাইরে সর্বত্র ২০০৬ সালের শ্রম আইন কার্যকর রয়েছে। এতে ট্রেড ইউনিয়ন করার ওপর কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। এর আগেও ছিল না। তবে মালিকেরা নানা কৌশলে এর বিরোধিতা করছিলেন। দেশের সংগঠিত ট্রেড ইউনিয়নগুলোর কেন্দ্রীয় নেতারাও এ বিষয়ে তেমন জোরালো উদ্যোগ নিয়েছেন, এমন নয়। সরকারের ভূমিকা এখানে নিয়ন্ত্রকের। তারা ট্রেড ইউনিয়ন করার জন্য অগ্রণী হয়ে কোনো উৎসাহ দেওয়ার কথা নয়। তবে কোনো কারখানায় বিধি মোতাবেক ইউনিয়ন করার পর দ্রুত নিবন্ধন দিয়ে তারা পরোক্ষ প্রণোদনা দিতে পারে। এসব ইউনিয়ন শ্রমিকস্বার্থ রক্ষার পাশাপাশি দায়িত্বশীল হলে শিল্পমালিকের জন্যও সহায়ক হতে পারে। আবার বিপরীত রূপ নিলে উৎপাদনের পরিবেশ বিঘ্নিত হবে। ক্ষতিগ্রস্ত হবে শিল্পটি; এটা বলার অপেক্ষা রাখে না। তবু আইএলও সনদে স্বাক্ষরকারী হিসেবে আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারের পরিপ্রেক্ষিতে, দেশের সংবিধান ও প্রচলিত আইনের আলোকে শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়ার অধিকার দিতেই হবে। আর তা যত দ্রুত হয়, ততই মঙ্গল। এ বিষয়ে বৃহত্তর ক্রেতাদেশগুলোর উদ্বেগ রয়েছে। এর মাঝে কিছু ট্রেড ইউনিয়ন নিবন্ধন হয়েছে বলে জানা যায়। হয়তোবা বাকিগুলোতেও শ্রমিকেরা চাইলে তা হবে। সবার প্রত্যাশা থাকবে, তাঁরা নিজেদের স্বার্থরক্ষার পাশাপাশি কারখানার নিরাপত্তা আর উৎপাদনের পরিবেশ উন্নয়নে সহায়ক ভূমিকা পালন করবেন।
এরপর উল্লেখ করতে হয়, আমাদের দেশে ট্রেড ইউনিয়নগুলোর ভূমিকা বেশ কিছু ক্ষেত্রেই প্রশ্নবিদ্ধ। দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ সরকারি মালিকানাধীন ব্যাংকগুলো আর গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি সরবরাহ, পয়োনিষ্কাশনসহ বিভিন্ন সেবামূলক খাতে এসব ইউনিয়নের ভূমিকা প্রতিষ্ঠানগুলোর মর্যাদাকে ক্ষেত্রবিশেষে খাটো করছে বলে জানা যায়। অবশ্য সাম্প্রতিক কালে বড় বড় আর্থিক কেলেঙ্কারিগুলোর কোনোটিতেই তারা কেউ নেই, এটা সত্য। তবে এসব প্রতিষ্ঠানে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি, গ্রাহক হয়রানি, কর্মসংস্কৃতি বিনষ্ট করাসহ অনেক নেতিবাচক ঘটনার সঙ্গে তাদের যোগাযোগের কথা জানা যায়। উল্লেখ করা আবশ্যক, এসব ট্রেড ইউনিয়নের পেছনে সব সময়ই যে দল যখন ক্ষমতায় থাকে, তাদের কিছু ব্যক্তি সংশ্লিষ্ট থাকেন। আর যদি বলা হয়, দেশের সড়ক পরিবহন খাতে ট্রেড ইউনিয়নের নামে সবচেয়ে বেশি অনিয়ম বিরাজ করছে, তাহলে খুব একটা ভুল বলা হবে না। আমাদের রেল পরিবহন এবং সরকারি খাতে সড়ক ও নৌপরিবহনব্যবস্থা অনেক ক্ষেত্রে অকার্যকর ও অপ্রতুল। ক্রমবর্ধমান চাহিদার সঙ্গে তাল মেলাতে না পারা আর লাগামহীন দুর্নীতি এর প্রধান কারণ। আর পরিস্থিতির সুযোগ নিচ্ছে বেসরকারি খাত। এ খাতে সরকারের নিয়ন্ত্রণমূলক ভূমিকা হতাশাব্যঞ্জক। সক্ষমতার অভাবের পাশাপাশি চাঁদার ভাগ সেই ভূমিকায় ভাটা বিরাজ করছে বলেই ব্যাপকভাবে ধারণা করা হয়। সড়ক পরিবহন শ্রমিকদের ইউনিয়ন এখন চাঁদা নেওয়ার আইনি অধিকার চায়। আর বেপরোয়া গাড়ি চালিয়ে মানুষ হত্যাকেও দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর আইনের আওতায় নেওয়ার দাবিতে সোচ্চার। তারা আরও দাবি জানাচ্ছে বিনা পরীক্ষায় লাইসেন্স দেওয়ার। সরকারের নির্ধারিত ভাড়ার হার অনেক ক্ষেত্রে থাকে উপেক্ষিত। এতে মালিকদেরও ক্ষেত্রবিশেষে ইন্ধন রয়েছে। নৌপরিবহন খাতের অবস্থা অতটা খারাপ না হলেও বেশ ক্ষেত্রে তা-ই। আর এর মাশুল দিচ্ছে যাত্রীরা।
এই প্রসঙ্গ এখানে টেনে আনার কারণ দাঁড়িয়েছে সাম্প্রতিক কালের একটি সমাবেশকে কেন্দ্র করে। সমাবেশটি আহ্বান করা হয়েছিল গার্মেন্টস শ্রমিক সমন্বয় পরিষদের নামে। এর নেতা সরকারের নৌপরিবহনমন্ত্রী। তিনি পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনেরও নেতা। সংবাদপত্রের ভাষ্যমতে, একটি পরিবহন কোম্পানির মালিকও তিনি। যাই হোক, তিনি দীর্ঘকাল পরিবহন শ্রমিক সংগঠনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তৈরি পোশাকশ্রমিকদের নেতৃত্ব দেওয়ার অধিকারও তাঁর রয়েছে। সমাবেশ থেকে দাবি করা হয়েছে, শ্রমিক মজুরি ১৭০ শতাংশ বাড়াতে হবে। এ ছাড়া শ্রমিকস্বার্থ-সংক্রান্ত আরও কতিপয় জোরালো দাবি করা হয়েছে। এসব দাবির যৌক্তিকতা কিংবা এগুলো আদায়ে সংগঠনটির এগিয়ে আসা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। এ পরিমাণ মজুরি শ্রমিকেরা পেলে আমরা আনন্দিতই হব। তবে সব দিক বিবেচনা করে সুপারিশ পেশ করার জন্য যে মজুরি বোর্ড সরকার গঠন করেছে, তাদের সুপারিশই এখানে মূল ভূমিকা রাখবে।
তবে শঙ্কা দেখা দিয়েছে যে পরিবেশ সৃষ্টি করে একটি সমাবেশের মাধ্যমে এ দাবিদাওয়া উত্থাপন করা হয়েছে, তা নিয়ে। সংবাদপত্র থেকে জানা যায়, সেদিন রাজধানীর সন্নিকটবর্তী শিল্পাঞ্চলগুলো অন্তত ৪০০ কারখানা বন্ধ করে দেওয়া হয়। কোথাও কোথাও মালিকেরা ছুটি দিতে সম্মত না হওয়ায় ভাঙচুরের খবরও পাওয়া গেছে। আর সমাবেশের পরদিন থেকেই কোনো না কোনো স্থানে প্রতিদিনই পোশাকশিল্পের শ্রমিকেরা ভাঙচুর করছেন। এ প্রক্রিয়া যদি তাঁরা তাঁদের ট্রেড ইউনিয়নের কার্যক্রম পরিচালনা করতে গিয়েও অনুসরণ করেন, তবে শিল্পটি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আর এর প্রভাব ব্যাপক থেকে ব্যাপকতর হলে কী ঘটতে পারে, তা অনুমান করতে যথেষ্ট মেধাবী বিশ্লেষক হওয়ার আবশ্যকতা নেই।
শিল্প বাঁচলে শ্রমিক বাঁঁচবে। আর শ্রমিককে ন্যূনতম মানে বাঁচিয়ে না রাখলে শিল্পটিও একপর্যায়ে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকারভোগে শিল্পমালিকেরা সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে পারেন। এতে আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি হলে সবার জন্য কল্যাণকর হবে। আবার বারবার শঙ্কা জাগে, সড়ক পরিবহন খাতে ট্রেড ইউনিয়ন করা এবং দাবি আদায়ের প্রক্রিয়া তৈরি পোশাকশিল্প খাতেও যদি চালু করা হয়, তবে তার শ্রমিকদের গতি কী হবে, তা ভেবে। এখানে ট্রেড ইউনিয়ন করতে গিয়ে স্মরণে রাখতে হবে, পোশাকশিল্পের ভোক্তারা বাংলাদেশের হতভাগ্য নিরুপায় পরিবহন যাত্রী নয়। তারা গণতান্ত্রিক দেশের মুক্ত চেতনাসম্পন্ন সম্পদশালী ব্যক্তি। আর বিকল্প বেছে নেওয়ার সুযোগও রয়েছে তাদের।
তাই শিল্পগুলো যাতে বেহাল অবস্থায় না পড়ে, তার জন্য শ্রমিক, মালিক সবার যৌক্তিক ভূমিকার প্রয়োজন রয়েছে। সরকারের ঊর্ধ্বতন মহলের শুভ প্রভাবও যথেষ্ট অবদান রাখতে পারে। ঈশান কোণে কালো মেঘ দেখা যাচ্ছে। সর্বোচ্চ সতর্কতার এখনই সময়।
আলী ইমাম মজুমদার: সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
majumder234@yahoo.com