উদ্দেশ্য মহৎ, পদক্ষেপ ভুল…ছিদ্দিকুর রহমান

জাতীয় শিক্ষানীতি, ২০১০ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে পর্যায়ক্রমে আট বছর মেয়াদি প্রাথমিক শিক্ষা প্রবর্তনের অংশ হিসেবে ২০১৩ সালের ১ জানুয়ারি ৪৯০টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণীর কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ২০১৪ শিক্ষাবর্ষে এ বিদ্যালয়গুলোতে সপ্তম শ্রেণী চালু করা হবে এবং আরও বেশ কিছু বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণী খোলা হবে। এভাবে পর্যায়ক্রমে ২০১৮ সালের মধ্যে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত শিক্ষা কার্যক্রম চালু করার জন্য প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মাধ্যমে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় কার্যক্রম হাতে নিয়েছে।
উদ্দেশ্য মহৎ, এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু পদক্ষেপ সম্পূর্ণ ভ্রান্ত। এভাবে আট বছর মেয়াদি প্রাথমিক শিক্ষার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অর্জন সম্ভব নয়। গরুর গোয়ালে ঘোড়া বাঁধলে ঘোড়া গরু হয়ে যায় না। তেমনি মাধ্যমিক শিক্ষার শিক্ষাক্রম অনুসারে মাধ্যমিক পর্যায়ের জন্য তৈরি পাঠ্যপুস্তকভিত্তিক পাঠ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শ্রেণীকক্ষে পরিচালনা করলে ওই শিক্ষা প্রাথমিক শিক্ষা হয়ে যাবে না। এটা কেমন কথা যে একই শিক্ষাক্রমভিত্তিক প্রণীত একই পাঠ্যপুস্তক মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শ্রেণীকক্ষে পড়ালে-পড়লে মাধ্যমিক শিক্ষা হয় এবং প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শ্রেণীকক্ষে পড়ালে-পড়লে প্রাথমিক শিক্ষা হয়? একই শিক্ষা দুই স্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শ্রেণীকক্ষে পরিচালনার ফলে দুটি ভিন্ন স্তরের নামে পরিচিত হবে, তা কি হয়?
কোন দর্শনের ভিত্তিতে জাতীয় শিক্ষানীতি, ২০১০-এ প্রাথমিক শিক্ষার মেয়াদ পাঁচ বছর থেকে বাড়িয়ে আট বছর করার নীতি গৃহীত হয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষা হবে জীবনের ভিত্তি। জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান, দক্ষতা, দৃষ্টিভঙ্গি ও নৈতিকতা প্রাথমিক শিক্ষার মাধ্যমে অর্জিত হবে। অন্য কথায় টেকসই ব্যবহারিক সাক্ষরতা ও মৌলিক জীবনদক্ষতা অর্জন এবং নৈতিক বিকাশ প্রাথমিক শিক্ষার মুখ্য উদ্দেশ্য।
বর্তমান প্রচলিত পাঁচ বছর মেয়াদি প্রাথমিক শিক্ষায় তা অর্জন সম্ভব নয়। তাই প্রাথমিক শিক্ষার মেয়াদ আট বছর করার নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। টেকসই সাক্ষরতা, জীবনদক্ষতা, নৈতিকতা ইত্যাদি শিক্ষার মাধ্যমে অর্জনের বিষয়। শিক্ষার লক্ষ্য, উদ্দেশ্য, বিষয়বস্তু, শিখন-শেখানো পদ্ধতি ইত্যাদির স্বরূপ ও পরিসরের ওপর নির্ভর করে এ শিক্ষা। এখানে কী শিখবে এবং কীভাবে শিখবে তা গুরুত্বপূর্ণ, কোথায় শিখবে তা গৌণ। আট বছর মেয়াদি প্রাথমিক শিক্ষার শিক্ষাক্রম হবে অভিন্ন কাঠামোভুক্ত। এই শিক্ষাক্রম থাকবে আট বছরান্তে অর্জন উপযোগী করে প্রান্তিক শিখনফল। প্রান্তিক শিখনফলগুলোকে বিভিন্ন বিষয়-উপযোগী করে প্রথম থেকে অষ্টম প্রতিটি শ্রেণীর জন্য শ্রেণীভিত্তিক অর্জন উপযোগী শিখনক্রমে সাজিয়ে সে অনুসারে পাঠ্যপুস্তক ও অন্যান্য শিখনসামগ্রী উন্নয়ন করা। সে অনুসারে শিক্ষকদের নিবিড় প্রশিক্ষণ দিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করা। তা হবে সম্প্রসারিত আট বছর মেয়াদি প্রাথমিক শিক্ষা। নিম্নমাধ্যমিক স্তরের জন্য উন্নয়নকৃত এবং সে অনুসারে প্রণীত পাঠ্যপুস্তকভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রম প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শ্রেণীকক্ষে পরিচালনা করলে তা প্রাথমিক শিক্ষা হতে পারে না।
অতি অল্প সময়ে ও কম খরচে আট বছর মেয়াদি প্রাথমিক শিক্ষা সফলভাবে চালু করা সম্ভব। প্রাথমিক পর্যায়ে ২৫ হাজার বিদ্যালয়ে সম্প্রসারিত প্রাথমিক শিক্ষা চালু করা প্রয়োজন হবে। ভবিষ্যতে পর্যায়ক্রমে এ সংখ্যা বাড়িয়ে ৩০ হাজার করতে হবে। বর্তমানে নিম্নমাধ্যমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের নিম্নমাধ্যমিক শাখায় কর্মরত শিক্ষকদের প্রাথমিক শিক্ষার ওপর প্রশিক্ষণ দিয়ে তাঁদের দ্বারা তাঁদেরই স্কুলের শ্রেণীকক্ষ ও অন্যান্য ভৌত সুবিধা ব্যবহার করে ভিন্ন ব্যবস্থাপনায় অভিন্ন প্রাথমিক শিক্ষার শিক্ষাক্রমভিত্তিক প্রাথমিক শিক্ষার ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণীর শিক্ষা কার্যক্রম চালু করা সম্ভব। তবে এর আগে আট বছর মেয়াদি অভিন্ন শিক্ষাক্রম উন্নয়ন করে ওই শিক্ষাক্রমভিত্তিক পাঠ্যপুস্তক ও অন্যান্য শিখনসামগ্রী প্রণয়ন করতে হবে। সে অনুসারে কর্মরত শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের কথা আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস ও একই আঙিনায় পূর্ণাঙ্গ প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম চালুর বিষয়গুলো সময় নিয়ে ধীরে-সুস্থে করা যেতে পারে।
বর্তমানে প্রাথমিক বিদ্যালয় আঙিনায় নতুন কক্ষ তৈরি করে, নতুন আসবাব দিয়ে, নতুন শিক্ষক নিয়োগ করে সম্প্রসারিত প্রাথমিক শিক্ষা চালুর যে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তার জন্য কোটি কোটি টাকার প্রয়োজন হবে, সময়ও লাগবে অনেক বেশি। এক লাখ নতুন শ্রেণীকক্ষ ও প্রয়োজনীয় আসবাব জোগান দিতে হবে এবং সোয়া লাখ নতুন শিক্ষক নিয়োগ করতে হবে। তা করতে গেলে একটি ভীষণ জটিল সামাজিক সমস্যা সৃষ্টি হবে। বর্তমানে নিম্নমাধ্যমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের নিম্নমাধ্যমিক শাখায় কর্মরত এমপিওভুক্ত সোয়া লাখ শিক্ষক বেকার হয়ে যাবেন।
কম খরচে, কম সময়ে এবং সহজে যে পথে লক্ষ্যে পৌঁছা সম্ভব, সে পথে না চলে ভ্রান্ত পথে চললে অপচয় বাড়বে, সময় বেশি নেবে, বেশি শ্রম দিতে হবে কিন্তু লক্ষ্যে পৌঁছা সম্ভব হবে না। ভ্রান্ত পদক্ষেপ মহৎ উদ্দেশ্য অর্জনের পথে প্রধান অন্তরায়।
ড. ছিদ্দিকুর রহমান: অধ্যাপক, আইইআর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং সদস্য, জাতীয় শিক্ষানীতি, ২০১০ প্রণয়ন কমিটি।
semzs@yahoo.com