উন্নয়ন প্রচারে সিদ্ধান্ত বদল

প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘ অধিবেশনে যাচ্ছেন

জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যাবেন না সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরদিনই আবার সিদ্ধান্ত পাল্টেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আগামী ২৩ সেপ্টেম্বর থেকে ৪ অক্টোবর পর্যন্ত অনুষ্ঠেয় জাতিসংঘের ৬৮তম সাধারণ অধিবেশনে যোগ দেবেন বলে মনস্থির করেছেন তিনি। তাঁর এই ত্বরিত সিদ্ধান্ত বদলের নেপথ্যে অন্যতম কারণ হিসেবে জানা গেছে, জাতিসংঘ অধিবেশনের বক্তৃতায় গত প্রায় পৌনে পাঁচ বছরে সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের বর্ণনা প্রধানমন্ত্রীর মুখ থেকে উচ্চারিত হলে তা বিশ্ব অঙ্গনে গ্রহণযোগ্য হবে। তা ছাড়া বারাক ওবামা, মনমোহন সিংয়ের মতো বিশ্বনেতাদের সঙ্গে শেখ হাসিনার দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের সম্ভাবনাও সেখানে রয়েছে। আবার প্রধানমন্ত্রী না গেলে সেটা বিরোধী দলের অপপ্রচারের একটা হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে- এ আশঙ্কাও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে বলে সূত্র জানায়।
প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সেক্রেটারি আবুল কালাম আজাদ গত রাতে কালের কণ্ঠকে বলেন, শেখ হাসিনা জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যথারীতি যোগ দেবেন এবং সেখানে বিশ্বনেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন।
দলীয় নেতা-কর্মীদের পরামর্শে প্রধানমন্ত্রী ওই অধিবেশনে যোগ দেবেন না বলে গত সোমবার সরকারের দায়িত্বশীল কর্মকর্তা ও দলীয় নেতারা গণমাধ্যমকে অবহিত করেন। গতকাল মঙ্গলবার বিভিন্ন গণমাধ্যমে গুরুত্বসহকারে এ খবর প্রকাশ পায়। এ খবরে সরকারি মহল ও দলীয় নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে গতকাল দিনভর ব্যাপক আলোচনা চলতে থাকে। নানা রকম পর্যালোচনা করে একপর্যায়ে গতকাল জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগদানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর সূত্র গতকাল বিষয়টি নিশ্চিত করেন। সূত্র জানায়, রাষ্ট্রাচারপ্রধান সফরের প্রস্তুতি প্রসঙ্গে শেখ হাসিনাকে অবহিত করতে গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় গণভবনে যান।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র আরো নিশ্চিত করে, জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর যোগদান উপলক্ষে মন্ত্রণালয়ের কাজ এগিয়ে চলছে। সূত্র আরো জানায়, অধিবেশনে যোগদান শেষে ফেরার পথে পবিত্র ওমরাহ পালন করতে সৌদি আরব হয়ে দেশে ফিরবেন প্রধানমন্ত্রী। জাতিসংঘের অধিবেশনে যোগদানের আগে ঢাকা থেকে সরাসরি যুক্তরাজ্য, তারপর যুক্তরাষ্ট্রে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে যাওয়ার কথা রয়েছে শেখ হাসিনার।
সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিবর্গ, নিরাপত্তাকর্মী, গণমাধ্যমকর্মী, দলীয় নেতা-কর্মীসহ প্রায় ৭০ জনের বহর নিয়ে এবার সরকারপ্রধানের এ অধিবেশনে যাওয়ার কথা রয়েছে। তবে বহরে অন্তর্ভুক্ত সবাই প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে যাবেন না। সূত্র জানায়, শেখ হাসিনা এবার দীর্ঘ বহর নিয়ে নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে যেতে চান না। তাই গত সপ্তাহে বহর ছোট করার নির্দেশ দেন তিনি। যদিও এর আগে সফরগুলোতে শতাধিক লোক নিয়ে সরকারপ্রধানের জাতিসংঘ অধিবেশনে যোগ দেওয়ার নজির রয়েছে।
সিদ্ধান্ত বদলের কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে জানা গেছে, গত সাড়ে চার বছরে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশের উন্নয়ন বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরার জন্য জাতিসংঘের অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার যোগ দেওয়া জরুরি বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। এ ছাড়া সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি), টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় (এসডিজি) অগ্রগতির কথা প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতার মাধ্যমে তুলে ধরতেও তাঁর সেখানে যাওয়া জরুরি বলে উল্লেখ করে বিভিন্ন মহল। প্রধানমন্ত্রী উপস্থিত থেকে এসব বিষয়ে বক্তব্য দিলে বিশ্ববাসীর কাছে তা আলাদা গুরুত্ব পাবে বলে সবার ধারণা।
পাশাপাশি জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি আব্দুল মোমেনও এসব বিষয় তুলে ধরে সাধারণ অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীকে যোগদানের অনুরোধ করেন। আবার সেখানে যোগদানের গুরুত্ব তুলে ধরে সরকারি ও বেসরকারি মহলগুলো থেকেও প্রধানমন্ত্রীকে ফোন করে অনুরোধ করা হয় বলে দায়িত্বশীল একাধিক ব্যক্তি এ প্রতিবেদককে নিশ্চিত করেছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ এক কর্মকর্তাও এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, জাতিসংঘের অধিবেশনে গেলে সেখানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা, ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংসহ বিশ্বনেতাদের সঙ্গেও প্রধানমন্ত্রীর দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে মিলিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ সব রকম সম্ভাবনা বিবেচনায় নিয়েই শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনা জাতিসংঘ অধিবেশনে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তবে এ সফর সংক্ষিপ্ত হতে পারে জানিয়ে ওই কর্মকর্তা জানান, আগামী ২৭ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ দেওয়ার কথা। সেই ভাষণকেও গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। সাধারণ অধিবেশনে শেখ হাসিনা বরাবরই বাংলায় ভাষণ দেন।
জানা গেছে, জাতিসংঘের অধিবেশনে গিয়ে বিশ্বনেতাদের সঙ্গে আলোচনায় দেশের সর্বশেষ রাজনৈতিক অবস্থা, নির্বাচন পদ্ধতি, টেকসই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর অবস্থান পরিষ্কার করবেন। বারাক ওবামা ও মনমোহন সিংয়ের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের সময় ঠিক করতে না পারলে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যোগদানের আগে-পরে এসব ইস্যুতে প্রয়োজনীয় আলাপ-আলোচনা সেরে রাখার পরিকল্পনা নিয়ে রাখা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
জানা যায়, জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কাজকর্ম চলমান। তা ছাড়া চলতি সংসদ অধিবেশন আগামী ১২ সেপ্টেম্বর। এ অধিবেশনও গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে সংসদ নেতা হিসেবে শেখ হাসিনার উপস্থিতিও জরুরি। এসব বিবেচনায় নিয়ে দলের কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় নেতা ও কয়েকজন মন্ত্রী এবার জাতিসংঘ অধিবেশনে শেখ হাসিনাকে না যাওয়ার পরামর্শ দিলে এর পক্ষে মত দেন তিনি। তা ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হতে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন দল ও সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিরা। তাই ব্যয় সংকোচনও অধিবেশনে না যাওয়ার সিদ্ধান্তের একটি কারণ বলে জানা গেছে।