ঋণের সিকিউরিটি চেক নিয়ে প্রশ্ন

দেশে সব ধরনের ঋণের বিপরীতে জামানত হিসেবে সিকিউরিটি চেক নেয়া ব্যাংকিং খাতের দীর্ঘদিনের রীতি। গ্রাহক সময়মতো ঋণ পরিশোধ না করলে সেই চেক দিয়ে অর্থ উদ্ধারের চেষ্টা হয়। গ্রাহকের হিসাবে পর্যাপ্ত অর্থ না থাকার কারণে চেক ফেরত এলে করা হয় চেক প্রত্যাখ্যাতের মামলা। এভাবেই ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘদিন ধরে ঋণের অর্থ আদায়ে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে জামানত হিসেবে চেক গ্রহণের আইনি ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সম্প্রতি হাইকোর্ট এমন কয়েকটি মামলায় সাময়িক স্থগিতাদেশ দিয়েছেন।

আরফিন এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী রওনুজ্জাহান হেলেন হার্ডওয়্যারসামগ্রী ক্রয়ে ২০০০ সালের ১২ এপ্রিল বেসরকারি একটি ব্যাংকে ঋণ আবেদন করেন। একই বছরের ২৭ জুন ব্যাংক গ্রাহককে চিঠি দিয়ে ৪০ লাখ টাকা ঋণ অনুমোদনের বিষয়টি অবহিত করে। এ ঋণের বিপরীতে গ্রাহক সূত্রাপুরের দোতলা ভবন বন্ধক রাখেন। পাশাপাশি ভবিষ্যতের জন্য ক্রস চেক বন্ধক হিসেবে জমা নেয়া হয়। পরে গ্রাহকের চাহিদার বিপরীতে ঋণ সুবিধা আরো বাড়ায় ব্যাংকটি।

bb
সময়মতো ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ায় ২০১১ সালের মে পর্যন্ত ২৬টি হিসাবে মোট ২ কোটি ৫০ লাখ ২০ হাজার টাকা মেয়াদোত্তীর্ণ হয়। অর্থ আদায়ে গ্রাহকের কাছ থেকে নেয়া জামানতি চেক জমা দেয় ব্যাংক। রওনুজ্জাহান হেলেনের হিসাবে পর্যাপ্ত অর্থ না থাকায় তা বাউন্সড (প্রত্যাখ্যাত) হয়। এ ঘটনায় গ্রাহকের বিরুদ্ধে এনআই অ্যাক্টের অধীনে মামলা করে ব্যাংক। এনআই অ্যাক্টের ১৩৮ ধারায় করা এ মামলায় এক বছর কারাদণ্ড অথবা চেকের অর্থের তিন গুণ পর্যন্ত জরিমানার বিধান রয়েছে। এভাবে ব্যবসার জন্য ঋণ নিয়ে পরিশোধ করতে না পারায় অর্থঋণ আদালতে মামলার পাশাপাশি ফৌজদারি বিচারের মুখোমুখি হতে হয় গ্রাহককে। এর পরিপ্রেক্ষিতে জামানত হিসেবে সিকিউরিটি চেক বাউন্সের ফলে উদ্ভূত মামলা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন আদালত।

অর্থ না পেয়ে মামলা হলে অর্থঋণ আদালত ২০১৩ সালের ২০ জুলাই ব্যাংকটির পক্ষে রায় ও ডিক্রি দেন। এর পর ২০১৪ সালে ডিক্রি জারির (এক্সিকিউশন) মামলা হয়। মামলাটি বর্তমানে অর্থঋণ আদালতে বিচারাধীন। ডিক্রি জারি হলে সব বন্ধকি সম্পত্তি বিক্রি করে অর্থ আদায় করতে পারবে ব্যাংক। তার আগেই ২০১১ সালের ১২ এপ্রিল ৭ লাখ ২০ হাজার টাকার একটি চেক ব্যাংকে জমা করলে তা বাউন্সড হয়। নিয়ম অনুযায়ী ব্যাংক মহানগর হাকিম আদালতে চেক বাউন্সের মামলা করে। বর্তমানে মামলাটি যুগ্ম মহানগর দায়রা জজ আদালতে সাক্ষ্যগ্রহণের পর্যায়ে আছে। এমন পরিস্থিতিতে চেক বাউন্সের ২৬টি মামলা স্থগিত চেয়ে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে হাইকোর্টে পৃথক আবেদন করেন হেলেন। এমন আটটি মামলায় ৫ মে সাময়িক স্থগিতাদেশ দিয়ে রুল জারি করেন বিচারপতি কামরুল ইসলাম সিদ্দিকী ও বিচারপতি গোবিন্দ চন্দ্র ঠাকুরের বেঞ্চ। আবেদনকারী যুক্তি দেখান, জামানতি চেকের বিষয়টি কোনো আইনে নেই। এটি সম্পূর্ণ বেআইনি।

রওনুজ্জাহান হেলেনের আইনজীবী শাহ মোহাম্মদ ইজাজ রহমান বলেন, চেক বাউন্সের ফলে দায়ের করা মামলাগুলো কেন স্থগিত করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট। ঋণের বিপরীতে চেক জামানত রাখা আইনবহির্ভূত। আমাদের এ যুক্তিতে জামানত রাখা চেক বাউন্সের আটটি মামলায় সাময়িক স্থগিতাদেশ দিয়েছেন আদালত। সম্প্রতি আরো অনেকে এ ধরনের মামলা স্থগিতে হাইকোর্টের শরণাপন্ন হচ্ছেন।

এটি দীর্ঘদিনের প্রচলিত ব্যবস্থা বলে মন্তব্য করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. মাহফুজুর রহমান। তিনি বলেন, কোনো কোনো ব্যাংক জামানত হিসেবে চেক নিয়ে থাকে। গ্রাহকরাও স্বপ্রণোদিত হয়ে দেন। ঋণের কিস্তি পরিশোধের সময় পেরিয়ে গেলে সেই চেক জমা দিয়ে অর্থ পরিশোধের উদ্যোগ নেয় ব্যাংক। এখন পর্যন্ত এ প্রক্রিয়ায় ব্যাংক ও গ্রাহক উভয়ই উপকৃত হচ্ছে। ভবিষ্যতে এ নিয়ে প্রকট কোনো সমস্যা দেখা দিলে সময়মতো সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।

অর্থঋণ আদালত আইন অনুযায়ী বন্ধকি সম্পদ নিলামের বিধান রয়েছে। একই আইনে ডিক্রি জারি মামলা নিষ্পত্তির পর সম্পত্তি বিক্রির মাধ্যমে ঋণের অর্থ আদায় করতে পারে ব্যাংক। তবে আইনের পাশাপাশি চর্চাগত অনেক বিষয় রয়েছে; আদালতের নির্দেশনা এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

সোনালী ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ হোসেন বলেন, আইন ও চর্চা উভয় প্রক্রিয়ায়ই ব্যাংক পরিচালিত হয়। ঋণের বিপরীতে জামানত হিসেবে চেক গ্রহণ একটি পুরনো স্বীকৃত প্রথা। দীর্ঘদিন ধরে তা চলে আসছে। এ কারণে এখনো এটা সচল বলে ধরে নেয়া যায়। তবে কোনো আদেশ এলে নিশ্চয়ই তা আইনে অন্তর্ভুক্ত হবে।

বর্তমানে সব ধরনের ব্যাংকঋণ নিতেই জামানত হিসেবে সিকিউরিটি চেক নেয়া হচ্ছে। স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি জামানত রাখার পরও এ ধরনের চেক নেয়া হয়। এমনকি ক্রেডিট কার্ডের জন্যও গ্রাহকের কাছ থেকে জামানত হিসেবে সিকিউরিটি চেক নেয়া হয়। গ্রাহকের সঙ্গে ব্যাংকের ঋণ চুক্তিতে পোস্ট ডেটেড বলা হলেও আসলে ব্ল্যাংক চেক নেয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এজন্য চেক অথরাইজড হওয়ার পর এর প্রতিলিপিও গ্রাহকদের সরবরাহ করা হয় না। ফলে অনেক সময়ই এ ধরনের চেক দিয়ে হয়রানির শিকার হন ঋণগ্রহীতা।