এই ঈদেও শঙ্কা আর উদ্বেগ

গত ঈদুল ফিতরে মানুষ ঘরে ফিরেছিল জামায়াত-শিবিরের টানা হরতাল কর্মসূচি মাথায় নিয়ে। এবার কোরবানির ঈদের ছুটিতে মানুষ বাড়ি যাচ্ছে ২৫ অক্টোবরের পর দেশে কী হয়- এ শঙ্কা নিয়ে। ঈদের ছুটির আগেই আজ সোমবার শুরু হয়েছে শারদীয় দুর্গাপূজার ছুটি। আগামীকাল মঙ্গলবার শুরু হচ্ছে ঈদুল আজহার ছুটি। চলবে ১৯ অক্টোবর শনিবার পর্যন্ত। আগামী রবিবারের মধ্যেই ঢাকায় ফিরতে শুরু করবে মানুষ। অজানা শঙ্কায় ঢাকা ছাড়ছে তারা, ফিরবেও একই শঙ্কা নিয়ে।
ঢাকায় একটি বেসরকারি ব্যাংকে চাকরি করেন আহমেদ জাকির হাসান। খুলনায় মা-বাবার সঙ্গে ঈদ করার জন্য সব পরিকল্পনা করে রেখেছেন। কিন্তু দেশের এ পরিস্থিতিতে বাড়িতে যাচ্ছেন একরাশ উৎকণ্ঠা নিয়ে। গতকাল রবিবার কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘গতবার ঈদে বাড়ি গিয়েছিলাম জামায়াত-শিবিরের হরতাল-নৈরাজ্য মাথায় নিয়ে। এবার যাচ্ছি বিরোধী জোটের দেশ অচল করার কর্মসূচি সামনে রেখে। পরিস্থিতি কী হবে, নিরাপদে ঢাকায় ফিরতে পারব কি না, সে শঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।’
জাকির হাসানের মতো শঙ্কায় আছেন আসমা হায়দারও। তাঁর স্বামী বাংলাদেশ পুলিশে চাকরি করেন। দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা শুরু হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেই সামনে থেকে সব সামাল দিতে হয়। এ কারণে যত ভয় পুলিশ-স্বামীকে নিয়ে। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘আমাদের আর ঈদ নেই। সামনে কী আছে তা কেবল আল্লাহ জানেন। বাড়ি যেতেও ভয় পাচ্ছি।’
দুর্গাপূজা ও ঈদ মিলিয়ে ছয় দিন ছুটি পেয়েছেন একটি বহুজাতিক কম্পানির কর্মকর্তা সাদিয়া হাসান। স্বামী হাসান প্রবাসী, তাঁকে সঙ্গে নিয়ে গ্রামের বাড়ি সাতক্ষীরায় ঈদ করার সব পরিকল্পনা করে ফেলেছেন। কিন্তু গ্রামে ঈদ করতে যেতে ভয় পাচ্ছেন। কারণ এর আগে জামায়াত-শিবির সবচেয়ে বড় তাণ্ডব ঘটিয়েছিল সাতক্ষীরায়। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘আমার স্বামী অনেক দিন পর বিদেশ থেকে এসেছেন। মা-বাবা চেয়েছিলেন মেয়ে-জামাই তাঁদের সঙ্গে ঈদ করুক। বুঝতে পারছি না, গ্রামে গেলে কী করে ফিরব।’ দেশে রাজনৈতিক স্থিরতা কি আদৌ আসবে না? ক্ষোভের সঙ্গে প্রশ্ন করলেন তিনি।
সরকারের পক্ষ থেকে একাধিকবার বলা হয়েছে, আগামী ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত সংসদ চলবে। এরপর সংসদ ভেঙে দিয়ে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হবে। বিরোধীপক্ষের দাবি, সরকার আগের অবস্থান পাল্টে ফেলেছে। তারা এখন বিএনপি ও বিরোধী জোটকে বাদ দিয়ে এককভাবে নির্বাচন করতে চায়। এ জন্য সংসদ ২৪ অক্টোবর ভাঙছে না। মন্ত্রিসভা বহাল রেখে দলীয় সরকারের অধীনেই নির্বাচনের পথে এগোচ্ছে সরকার। কিন্তু বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট কোনোভাবেই শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে যাবে না। তাদের এক দাবি- নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন। বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট আওয়ামী লীগ সরকারকে পদত্যাগে বাধ্য করার জন্য ২৫ অক্টোবর ঢাকায় মহাসমাবেশের ডাক দিয়েছে। এ সমাবেশ প্রতিরোধের ডাক দিয়ে পাল্টা সমাবেশ করার ঘোষণা দিয়েছে আওয়ামী লীগ। এ রকম যুদ্ধংদেহী অবস্থানের কারণেই ২৫ অক্টোবরকে ঘিরে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বাড়ছে। বাড়ছে অস্থিরতা, শঙ্কা। কী হবে ২৫ অক্টোবর।
জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র ও সর্বশেষ চীন সরকারকে অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য বিএনপির সঙ্গে সংলাপে বসার অনুরোধ জানিয়েছে। বিএনপির পক্ষ থেকেও একাধিকবার নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন করার জন্য সংলাপে বসার তাগিদ জানানো হয়েছে। কিন্তু ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ তাদের সিদ্ধান্তে অনড়। তাদের বক্তব্য, সংবিধান অনুযায়ী বর্তমান সরকারের অধীনেই নির্বাচন হবে। অসাংবিধানিক কোনো সরকারের হাতে দেশ পরিচালনার ভার দেওয়া হবে না।
দেশ অচলের কর্মসূচি : সারা দেশকে রাজধানী থেকে বিচ্ছিন্ন করার পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে বিএনপিসহ বিরোধী জোট। এ লক্ষ্যে রাজধানীর পাশাপাশি ২৫ অক্টোবর প্রতিটি জেলা সদরে সমাবেশ করবে ১৮ দলীয় জোট। তাদের সম্ভাব্য কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে ঢাকা ঘেরাও, রেল-সড়ক ও নৌপথ অবরোধ, স্বেচ্ছা কারাবরণ, লাগাতার হরতাল, অবরোধ প্রভৃতি। সরকার সমঝোতায় না পৌঁছলে অসহযোগ আন্দোলনের মতো কঠোর কর্মসূচিতে যাবে বিএনপি ও ১৮ দলীয় জোট।
একাধিক সূত্র জানিয়েছে, সরকারের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক আন্দোলনে যাওয়ার জন্য গত ৯ অক্টোবর সারা দেশে জেলা ও মহানগর নেতৃত্বের কাছে শীর্ষ নেতাদের পক্ষ থেকে নির্দেশনামূলক একটি চিঠি পাঠিয়েছে বিএনপি। চিঠিতে ‘একদলীয়’ নির্বাচন প্রতিহত করতে সারা দেশে ২৪ অক্টোবরের মধ্যে ভোটকেন্দ্রভিত্তিক ‘একদলীয় নির্বাচন প্রতিরোধ সংগ্রাম কমিটি’ গঠন করে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে তালিকা পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। প্রত্যেক এলাকার ১৮ দলীয় জোটের নেতা, আন্দোলন ইস্যুতে সমমনা রাজনৈতিক নেতা, বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার বিশিষ্ট ব্যক্তির সমন্বয়ে এ কমিটি গঠন করা হবে। কমিটিতে একজন আহ্বায়ক, একজন সদস্যসচিব এবং অন্যরা সদস্য থাকবেন।
এদিকে গোয়েন্দা সূত্র ও জামায়াতের দলীয় সূত্রে জানা গেছে, শিবিরের অন্তত ছয় হাজার নেতা-কর্মীকে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারের জন্য প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে। কোনোভাবেই চূড়ান্ত আন্দোলন শুরুর আগে এসব শিবিরকর্মীকে পুলিশের হাতে আটক হওয়া চলবে না- এ সতর্কতাও জারি করা হয়েছে।
মোটকথা, সরকার ও বিরোধীদলীয় জোট মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে।
রাজনীতিক, বিশেষজ্ঞ ও সাধারণ মানুষ বলছে, এ রকম পরিস্থিতি ঘটেছিল ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর। তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান রাষ্ট্রপতি ড. ইয়াজউদ্দিনের পদত্যাগ দাবিতে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট ও চারদলীয় জোটের মধ্যে ঢাকায় ভয়াবহ সংঘর্ষ বাধে। প্রকাশ্যে পিটিয়ে হত্যা করা হয় বিপক্ষ দলের কর্মীদের। পরিস্থিতি সামাল দিতে সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধানের পদ থেকে রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন পদত্যাগ করেন।
পর্যবেক্ষকরা বলছেন, এবার যে সরকার পতনের সর্বাত্মক আন্দোলনে যাচ্ছে বিরোধীদলীয় জোটের নেতা-কর্মীরা তাও অক্টোবর মাসেই। দেশ অনিবার্য সংঘাতের দিকে এগোচ্ছে- এমনটিই মনে করছেন সংশ্লিষ্ট রাজনীতিক ও বিশেষজ্ঞরা। এ কারণেই মানুষের মধ্যে ভয় ও শঙ্কা কাজ করছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নির্দলীয় সরকারের দাবিতে আমরা শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করে আসছি। সরকারই জনগণের মধ্যে উৎকণ্ঠা তৈরি করেছে।’ তিনি জানান, ২৫ অক্টোবর মহাসমাবেশ করার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। সরকার সমাবেশের অনুমতি না দিলে যদি কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে, তাহলে সরকারই দায়ী থাকবে।
অন্যদিকে আওয়ামী লীগ বিরোধী দলের কর্মসূচিকে প্রতিরোধের প্রস্তুতি নিচ্ছে। গত ১০ অক্টোবর মহানগর আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভায় ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বিএনপির নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের কর্মসূচি প্রতিহতের পাল্টা কর্মসূচি ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, ‘ওরা (বিএনপি-জামায়াত) যে কর্মসূচি দেবে, আমরা তার পাল্টা কর্মসূচি দেব।’ তিনি বলেন, ঈদের পর ধারাবাহিকভাবে আরো কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে ২৫ অক্টোবর সমাবেশ হবে।
নির্বাচনের তারিখ নিয়ে শঙ্কা : নবম জাতীয় সংসদের মেয়াদ শেষ হবে আগামী ২৪ জানুয়ারি। দশম জাতীয় সংসদের নির্বাচন হতে হবে ২৪ জানুয়ারির পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে। সে হিসেবে আগামী ২৭ অক্টোবর থেকে ২৪ জানুয়ারি ২০১৪ সালের মধ্যে নির্বাচন হতে হবে। জাতীয় নির্বাচন-সংক্রান্ত এ বিধান সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদের ৩(ক) উপদফায় উল্লেখ রয়েছে। সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণেই আগামী ২৭ অক্টোবরের আগে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করতে হবে। তবে নির্বাচনকালীন মন্ত্রিসভা থাকবে কি থাকবে না, সে বিষয়ে জটিল তর্কে মেতেছে উভয় জোট। এ নিয়েই দেশে সাংঘর্ষিক অবস্থা তৈরি হয়েছে। নির্বাচনের তারিখ সম্পর্কে জানতে চাইলে রফিকুল ইসলাম মিয়া সংবিধানের ১২৩ (৩)ক ও খ-এর ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, কোনো অবস্থাতেই ২৪ অক্টোবরের পর সংসদ চালানোর সুযোগ নেই। কিন্তু সরকার সংসদ চালানোর কথা বলছে। ২৪ অক্টোবরের পর সংসদ অধিবেশন চালানো হলে রাজপথে নামা ছাড়া বিকল্প নেই।
তবে আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন ভিন্ন কথা। তাঁরা বলছেন, আওয়ামী লীগ যেভাবে সংবিধান পরিবর্তন করেছে, তাতে শেখ হাসিনার অধীনেই নির্বাচন হতে হবে। এ সময় সংসদ থাকবে। এ ছাড়া সংবিধানে অন্য কোনো পথ নেই।
এ প্রসঙ্গে সংবিধান বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার তুহিন মালিক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নির্বাচনের তারিখ ২৭ অক্টোবর থেকে ২৪ জানুয়ারির মধ্যে হবে। সংশোধিত সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচনের সঙ্গে সংসদ থাকা বা না থাকার কোনো সম্পর্ক নেই।’ তিনি বলেন, ‘২৫ অক্টোবরের পরে সরকার হবে নির্যাতনকারী সরকার। কারণ বিএনপি ও বিরোধী পক্ষকে দমানোর জন্য এটা তাদের করতে হবে।’
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বহুল আলোচিত ওয়ান-ইলেভেন হয়েছিল ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর পল্টনের লগি-বৈঠার সমাবেশকে কেন্দ্র করে সারা দেশে যে পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছিল সে কারণে। এবারও অক্টোবর মাসেই নির্বাচন কমিশনকে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করতে হবে। কিন্তু ২৫ অক্টোবর থেকে বিএনপির নেতৃত্বাধীন বিরোধীদলীয় জোটের দেশ অচলের আন্দোলন শুরু হচ্ছে। ফলে সংঘাত অনিবার্য। এটাই সাধারণ মানুষের শঙ্কার কারণ।