একটি মাল্টিপারপাস প্রতারণা

সিরাজুল হক মোল্লা। কুমিল্লা জেলার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার বুলকরা গ্রামের বাসিন্দা। অবসরপ্রাপ্ত এই ব্যক্তি ইসলাম নির্দেশিত পথে জীবন-যাপন করার চেষ্টা করেন। এ কারণে সুদ থেকে বাঁচতে পেনশনের টাকা ব্যাংকে গচ্ছিত রাখার পথে যাননি তিনি। ২০০৭ সালে পেনশনের পুরো টাকাটাই (৮ লাখ) তিনি বিনিয়োগ করেন আল হামরা ফাইন্যান্স মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেডে। কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক এলাকারই বাসিন্দা। আগে থেকেই এমডির সঙ্গে ছিল জানাশোনা। সব দিক বিবেচনায় সিরাজুল হক পুরো টাকাটা বিনিয়োগ করেন আল হামরায়। কোম্পানির সঙ্গে তার চুক্তি হয় প্রতি মাসে ৮ লাখ টাকার বিপরীতে তিনি ক্যাশ লভ্যাংশ পাবেন ২০ হাজার টাকা। এ বিষয়ে আল হামরা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তার একটি লিখিত চুক্তিও হয়। ঘটনা ২০০৭ সালের। চুক্তির পর থেকেই নিয়মিতভাবে সিরাজুল হক পেতে শুরু করেন লভ্যাংশ। কয়েক মাস নিয়মিত টাকা পেয়ে মুগ্ধতা বাড়ে সিরাজুল হকের। তিনি বোনের সঞ্চিত সাড়ে পাঁচ লাখ টাকাও বিনিয়োগ করেন আল হামরায়। এভাবেই কেটে যায় ছয় বছর। প্রতি মাসেই তিনি ও তার বোন চুক্তি অনুযায়ী পেয়ে আসছিলেন টাকা। চলতি বছর জানুয়ারিতে এসে ধাক্কা খান প্রথম। হঠাৎ করেই কোম্পানি তার ও তার বোনের লভ্যাংশ দিতে গড়িমসি শুরু করে। খোঁজ নিয়ে দেখেন, একই অবস্থায় পড়েছেন তার মতো অসংখ্য বিনিয়োগকারী।

পরিস্থিতি আঁচ করতে পেরে সিরাজুল হক সিদ্ধান্ত নেন, বিনিয়োগের মূল টাকা তুলে নেবেন তিনি। যোগাযোগ করেন আল হামরা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে। তারা জানান, কোম্পানি একটু ঝামেলায় আছে। এখনই মূল টাকা ফেরত দেয়া সম্ভব নয়। স্ট্যাম্প নিয়ে আসেন। চুক্তি করে দিচ্ছি। আপনার ৮ লাখ টাকা আগামী ৮ মাসে ফেরত পাবেন। এ অনুযায়ী সিরাজুল হকের সঙ্গে আরও একটি চুক্তি করে আল হামরা কর্তৃপক্ষ। তবে নতুন চুক্তি অনুযায়ী ৮ মাস কেটে গেলেও মূলধনের একটি টাকাও ফেরত পাননি তিনি। একই অবস্থা কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের চানিতলার হোসনে আরা বেগমেরও। তিনি আল হামরা ফাইন্যান্স মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেডে বিনিয়োগ করেছিলেন সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা। রাজধানীর শ্যামলীর এক বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, পেনশন ও জমি বিক্রির মোট সাড়ে চৌদ্দ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেন আল হামরায়। প্রতি লাখে ২ হাজার ২০০ টাকা হারে মাসে ত্রিশ হাজার টাকারও বেশি মুনাফা পাওয়ার কথা ছিল তার। মাত্র দু’মাস চুক্তি অনুযায়ী টাকা পেলেও গত সাত মাস ধরে ঘুরছেন রাস্তায়।

অনুসন্ধানে জানা যায়, রাজধানীর ৪৬ কারওয়ান বাজারের তৃতীয় তলায় ও ৮৪৪ বেগম রোকেয়া সরণি কাজীপাড়ার রহমান ম্যানশনের তৃতীয় তলায় দুটি অফিস নিয়ে ঢাকায় কার্যক্রম শুরু করে আল হামরা। প্রতিষ্ঠানটি কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের ঠিকানা ব্যবহার করে সমবায়ী প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিবন্ধন নেয়। রেজি. নম্বর-৯৩০। এক দশকে প্রতিষ্ঠানটির গ্রাহক সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১৭ হাজারে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, একেকজন গ্রাহক এক লাখ থেকে দেড় কোটি টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগ করেছেন। এ হিসেবে গ্রাহকদের কাছ থেকে হাজার কোটি টাকারও বেশি হাতিয়েছে কোম্পানিটি। এরপর সংগৃহীত অর্থে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামেই একটি সুতার কারখানা স্থাপন করে আল হামরা কর্তৃপক্ষ। তবে মুনাফা না পেয়ে বিক্ষুব্ধ গ্রাহকদের উপর্যুপরি অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সোমবার আল হামরার কারওয়ান বাজার অফিসে অভিযান চালায় র‌্যাব। এতে কোম্পানিটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক শফিউল আলম নয়নসহ গ্রেফতার হন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

বুধবার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক গ্রাহক হানা দেন আল হামরার ব্যবস্থাপনা পরিচালকের ফার্মগেটের বাসায়। সেখানে গ্রাহককে ইচ্ছেমতো তুলোধুনো করেন ব্যবস্থাপনা পরিচালকের স্ত্রী। তিনি স্পষ্ট বলেন, র‌্যাব ডেকেছেন। আমার স্বামীকে জেলে পুরেছেন। এখন যেখান থেকে খুশি টাকা আদায় করে নেন। তিনি বলেন, আপনাদের চাপাচাপিতে আমরা সুতার কারখানা বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। এখন সরকারকেই আপনারা নালিশ জানাতে থাকেন। দেখেন কবে টাকা পান। বাসায় এসে আর বিরক্ত করবেন না। এসব ভালো লাগে না।

এদিকে, আল হামরার কারওয়ান বাজার অফিসে গিয়ে দেখা যায় অফিস তালাবদ্ধ। দরজায় একটি নোটিশ সাঁটানো। তাতে লেখা, যারা মূলধন ফেরত চান তারা আগামী এক মাসের মধ্যে বিধিবদ্ধ প্রক্রিয়ায় আবেদন করবেন। প্রাপ্ত আবেদন যাচাই-বাছাই শেষে কোম্পানি মূলধন ফেরতের ব্যবস্থা করবে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আল হামরার এ নোটিশটি সাঁটানো হয় ৩১ আগস্ট। এরই মধ্যে সোমবার কার্যালয়ে অভিযান চালায় র‌্যাব। তারপর থেকেই অফিস পুরোপুরি তালাবদ্ধ। অফিস বন্ধ রাখার বিষয়ে দেলোয়ার হোসেন নামে কোম্পানির এক এক্সিকিউটিভ আলোকিত বাংলাদেশকে বলেন, কিছু গ্রাহক মামলা করায় এমডি গ্রেফতার হয়েছেন। আমরা জামিনের চেষ্টা চালাচ্ছি। আর আমাদের কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ এরই মধ্যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে সব গ্রাহকের টাকা ফেরত দেয়ার। এক দিনে সবার টাকা দেয়া সম্ভব নয়। পর্যায়ক্রমে সবার টাকাই ফেরত দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। নোটিশ আকারে তা আমরা গ্রাহকদের জানিয়েও দিচ্ছি। কতদিনের মধ্যে টাকা ফেরত দেয়া হবেÑ এ প্রশ্নের কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি এই তরুণ এক্সিকিউটিভ।