গ্রেপ্তার হতে পারেন বিরোধী দলের নেতারা

একতরফা নির্বাচনের পরিকল্পনা নিয়েই এগোচ্ছে সরকার

শেষ পর্যন্ত প্রধান বিরোধী দল বিএনপিকে বাইরে রেখে একতরফা নির্বাচনের পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে আওয়ামী লীগ। নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে বিরোধী দলের সঙ্গে সমঝোতা করার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বা তাঁর দলের নেতাদের কোনো আগ্রহ নেই। বরং জাতীয় সংসদ বহাল রাখা এবং দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনাকে নির্বাচনকালীন সরকারের প্রধান রাখার ব্যাপারে আরও শক্ত অবস্থান নিয়েছে ক্ষমতাসীন দলটি।
পাশাপাশি নির্বাচনকালীন আন্দোলন দমিয়ে রাখতে আগে থেকেই বিরোধী দলের নেতাদের গ্রেপ্তার করার চিন্তাও রয়েছে বলে সরকারের দায়িত্বশীল বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা গেছে।
এদিকে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার ব্যাপারে অনমনীয় রয়েছে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮-দলীয় জোট। দাবি আদায়ে ২৫ অক্টোবরের পর কঠোর আন্দোলন ও একতরফা নির্বাচন প্রতিহত করার ঘোষণা দিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া।
নির্বাচন নিয়ে প্রধান দুই দলের এই বিপরীত অবস্থানের কারণে বড় ধরনের হানাহানির আশঙ্কায় আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছে দেশের মানুষ। এটাকে খুবই দুঃখজনক বলে মন্তব্য করেছেন প্রবীণ আইনজীবী রফিক-উল হক। তিনি বলেন, ‘আমরা বারবার বলছি, দুই দলের বসা উচিত। একটা সমঝোতায় আসা দরকার। তাঁরা যদি সমঝোতায় আসেন, সংকট সমাধানে সংবিধান সংশোধনও লাগবে না।’ সরকার ও আওয়ামী লীগের উচ্চপর্যায়ে কথা বলে জানা যায়, একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে ইতিমধ্যে সর্বোচ্চ সাজাপ্রাপ্ত দু-একজনের রায় কার্যকর করে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের জনমতকে নিজেদের পক্ষে নিয়ে আসতে চাচ্ছে সরকার। বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামী, হেফাজতে ইসলাম ও ধর্মীয় জঙ্গিবাদবিরোধী জনগোষ্ঠীর মধ্যে আওয়ামী লীগের সমর্থন বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। এরই মধ্যে আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা ২ শতাংশ বেড়েছে বলে প্রথম আলোর সাম্প্রতিক জরিপে বের হয়েছে।
এ ছাড়া আন্তর্জাতিক মহলের সহানুভূতি যাতে বিএনপির দিকে না যায়, সে জন্য ধর্মীয় উগ্রপন্থীদের তৎপরতার বিষয়টিও বিশেষভাবে প্রচারে আনা হচ্ছে। সাম্প্রতিক কালে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন জঙ্গিগোষ্ঠীর সদস্য ও জঙ্গি আস্তানায় অভিযানের খবর গণমাধ্যমে এসেছে। বিএনপি আবার ক্ষমতায় এলে দেশে জঙ্গি তৎপরতা আবার মাথা ছাড়া দেবে বলে ইতিমধ্যে প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন বক্তৃতায় বলছেন।

পাশাপাশি বিএনপিকে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিকভাবে চাপে রাখতে বহুমুখী কৌশলও কষছে সরকার। বিরোধী দল ২৫ অক্টোবরের পর রাজপথ দখলের চেষ্টা করলে তা দলগত ও প্রশাসনিকভাবে কঠোরভাবে মোকাবিলা করার চিন্তা রয়েছে। ২৫ অক্টোবর বিরোধী দলের পাশাপাশি সরকারি দল আওয়ামী লীগও রাজধানীতে সমাবেশের কর্মসূচি নিয়েছে।

সরকারের উচ্চপর্যারের স্থানীয় সূত্রগুলোর বলছে, তারা মনে করে বিএনপি আন্দোলন করে সরকারকে চাপে ফেলতে পারবে না। বর্তমান সরকারের প্রতি আন্তর্জাতিক মহলের সমর্থন রয়েছে। যদিও এ ব্যাপারে আন্তর্জাতিক মহলে ভিন্ন রকম প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক মহল সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা বলছে। তারা নির্বাচনে সব দলের সমান সুযোগ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।

তবে জামায়াতে ইসলামী শক্ত রাজনৈতিক অবস্থান আছে, ১৪টি জেলার এমন কিছু এলাকা নিয়ে সরকারের উৎকণ্ঠা আছে বলে আওয়ামী লীগের নেতারা জানিয়েছেন। বিশেষ করে খুলনা, সাতক্ষীরা, চট্টগ্রাম ও উত্তরবঙ্গের কয়েকটি জেলার অনেক উপজেলায় আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা রীতিমতো অসহায়। প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণও ততটা নেই। এই এলাকাগুলো কীভাবে সামাল দেওয়া যায় তার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো জানায়, শেখ হাসিনা মনে করেন, বিএনপি নির্বাচন বর্জন করলেও তা প্রতিহত করতে পারবে না। এরশাদের শাসনকালে ১৯৮৮ সালের নির্বাচন বিএনপি ও আওয়ামী লীগ যৌথভাবে আন্দোলন করেও ঠেকাতে পারেনি। তবে ওই নির্বাচন দেশে-বিদেশে কোথাও গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। একইভাবে ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনও তৎকালীন বিএনপি সরকার সম্পন্ন করতে সমর্থ হয়েছিল। অবশ্য তা কোনো মহলে গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। শেষ পর্যন্ত নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা মেনে নিয়ে আবার নির্বাচন দিতে হয়েছিল।

একইভাবে ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারি বিএনপির একদলীয় নির্বাচন প্রায় হতে যাচ্ছিল। আওয়ামী লীগ ওই নির্বাচনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিল। পরে মনোনয়পত্র প্রত্যাহারের শেষ দিনে আওয়ামী লীগ নির্বাচন বর্জন করায় বিএনপির বেশ কয়েকজন সাংসদ বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। বিএনপির নেত্রী খালেদা জিয়া নির্বাচনী প্রচারও শুরু করে দিয়েছিলেন। কিন্তু সে নির্বাচন হতে পারেনি। ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ক্ষমতা গ্রহণ করায় আর সে নির্বাচন হয়নি।

শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শেখ হাসিনা মনে করেন, বিএনপিকে বাদ দিয়ে তিনি নির্বাচন করে ফেলতে পারবেন। জাতীয় পার্টিসহ বেশ কিছু রাজনৈতিক দল তিনি পাবেন, যারা নির্বাচনে অংশ নেবে।

সাবেক নির্বাচন কমিশনার এম সাখাওয়াত হোসেনের মতে, প্রধান বিরোধী দলকে ছাড়া একতরফা নির্বাচন করা আওয়ামী লীগের ঐতিহ্যবাহী দলের উচিত হবে না। তিনি বলেন, নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে যে সংকট, সেটা আওয়ামী লীগ তৈরি করেছে। এখন পর্যন্ত সংকট সমাধানে বিরোধী দলের সঙ্গে সরকারি দল কোনো আলোচনার উদ্যোগও নেয়নি। এ অবস্থায় একতরফা নির্বাচন করতে গেলে, সেটা দেশের মানুষ ভালোভাবে নেবে না।

তবে আওয়ামী লীগের ভেতরে এমন আলোচনাও আছে, জাসদ আর ওয়ার্কার্স পার্টি ছাড়া আওয়ামী লীগের মিত্র ১৪-দলীয় জোটের বাকি দলগুলো অনেকটা নামসর্বস্ব। আর জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ এখন বলে বেড়াচ্ছেন, বিএনপি না এলে তাঁর দল নির্বাচনে অংশ নেবে না। এ অবস্থায় সরকারের নির্বাচনী পরিকল্পনা কতটুকু বাস্তবায়ন হবে, তা নিয়ে সংশয় আছে।

কয়েকজন জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী জানান, নির্বাচনে ভোট কারচুপির কোনো ইচ্ছা সরকারের নেই। এ যুগে তা সম্ভব নয়। তবে ভোটকেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে। যাতে বিরোধী দলের অংশগ্রহণ না করলেও নির্বাচনে বিপুলসংখ্যক জনগণের অংশগ্রহণ দেখানো যায়।

এ মন্ত্রীরা আরও জানান, সরকার মনে করছে, সর্বশেষ পাঁচ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ৪০ শতাংশ ভোট পেয়েছে। সে অভিজ্ঞতা থেকে ব্যাপক প্রচার চালিয়ে দলীয়ভাবে ৪৫ শতাংশ ভোটারকে ভোটকেন্দ্রে নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। জাতীয় পার্টিসহ অন্য ছোট দলগুলো ৮ থেকে ১০ শতাংশ ভোটার ভোটকেন্দ্রে নিতে পারবে বলে সরকার আশা করছে। কমপক্ষে ৫১ শতাংশ ভোটার ভোটকেন্দ্রে নেওয়া সম্ভব হলে দেশে-বিদেশে নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হবে বলে মনে করছেন আওয়ামী লীগের নেতারা।

তবে গত বৃহস্পতিবার প্রকাশিত প্রথম আলোর জনমত জরিপে এসেছে, এ মুহূর্তে আওয়ামী লীগকে ভোট দিতে চান ৩৬ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষ। আর জাতীয় পার্টিকে ভোট দিতে চান ৭ শতাংশ। দুটি মিলে মোট ৪৩ দশমিক ৫ শতাংশ হয়। আওয়ামী লীগের মিত্র বাকি দলগুলোর উল্লেখ করার মতো কোনো ভোট বা জনসমর্থন নেই। এই অবস্থায় ৫১ শতাংশ ভোটার উপস্থিতি কতটা নিশ্চিত করা যাবে, তা নিয়ে অনেকের সন্দেহ রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানা যায়, শেখ হাসিনা মনে করেন, ক্ষমতা ছেড়ে নির্বাচনে অংশ নিলে তাঁর দলের চরম ক্ষতি হবে। ২০০১ সালে ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়ার পর তাঁর দল ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছিল বলে তিনি মনে করেন। বিএনপি ২০০১ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সহায়তা পেয়েছিল বলে শেখ হাসিনা অভিযোগ করেন। তবে ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগও তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সহায়তা ও সমর্থন পেয়েছিল বলে বিএনপির অভিযোগ আছে। তবে এটা সত্য যে ওই সময়ে আওয়ামী লীগের প্রতি সমাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশের মধ্যে সহানুভূতি ও সমর্থন ছিল।

অবশ্য আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ বলেন, ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সমর্থন পাওয়ার কথা গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ, তখনকার রাষ্ট্রপতি ছিলেন বিএনপির নির্বাচিত, সেনাপ্রধান ছিলেন খালেদা জিয়ার নিযুক্ত। আর প্রধান উপদেষ্টা ফখরুদ্দীনকে বিশ্বব্যাংক থেকে এনে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর করেছিলেন খালেদা জিয়া। তিনি দাবি করেন, তাঁর দল নিয়ে নির্বাচন করতে চায়। কিন্তু বিএনপি নির্বাচন করতে চায় না, নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্র করছে।

আওয়ামী লীগের ভেতরে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নির্বাচন নিয়ে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে নানা পরিকল্পনা থাকলেও দলের ভেতর চাপা ক্ষোভ-অসন্তোষও আছে। বেশির ভাগ নেতারাই কিছু জানেন না। দলীয় কোনো বৈঠকে দলের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে কোনো আলোচনা হয় না। কোথায় সিদ্ধান্ত হয় কেউ কিছু বলতে পারেন না। অনানুষ্ঠানিকভাবেও প্রধানমন্ত্রী কাউকে কিছু বলছেন না। সবকিছু প্রধানমন্ত্রী করছেন বলে আওয়ামী লীগে একটা কথা প্রচলিত আছে। প্রধানমন্ত্রী এককভাবে গোটা পরিস্থিতি কতটুকু সামাল দিতে পারবেন বা পরিস্থিতি অনুকূলে রাখতে পারবেন, তা নিয়ে দলের নেতাদের গভীর সংশয়-সন্দেহ আছে।