ঢাকাকে বিচ্ছিন্ন করার পরিকল্পনা

একতরফা নির্বাচন ঠেকাতে বিএনপির নানামুখী প্রস্তুতি

নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকারের দাবি আদায়ে সারা দেশ থেকে ঢাকাকে বিচ্ছিন্ন করার পরিকল্পনা নিয়েছে বিএনপি। সরকারের স্বাভাবিক কাজকর্মে বাধা সৃষ্টি করতে টানা হরতাল-অবরোধ ঘোষণার প্রস্তুতি চলছে। এ ছাড়া পেশাজীবী সংগঠনগুলোকেও এ আন্দোলনে নামানোর পরিকল্পনা নিয়েছে দলটি।
বিএনপি মনে করে, নির্বাচন নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের সমঝোতা হওয়ার সম্ভাবনা নেই। তা ছাড়া বিএনপি নির্বাচনে আসুক সরকার তা চায় না। তাই দাবি আদায় না হলে নির্বাচন বর্জন ও একতরফা নির্বাচন প্রতিহত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে সারা দেশে ভোটকেন্দ্রভিত্তিক সর্বদলীয় সংগ্রাম কমিটি গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রথম আলোকেবলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর অধীনে, সংসদ বহাল রেখে, মন্ত্রী-সাংসদদের রেখে নির্বাচন হলে সেখানে সব দল সমান সুযোগ পাবে না। তাই নির্দলীয় সরকারের দাবিতে সর্বাত্মক আন্দোলন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ঢাকাকে অচল করা বা টানা হরতাল-অবরোধ দেওয়ার প্রয়োজন হবে না, যদি সরকার দাবি মেনে নেয়। আর দাবি না মানলে নির্বাচন প্রতিহত করা ও বিরোধী দলের নির্বাচন বর্জন করা ছাড়া আর কী করার থাকতে পারে।
নির্বাচন বর্জন করে সেই নির্বাচনকে দেশে-বিদেশে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে দেখাতে চায় দলটি। বিএনপি মনে করে, একতরফা নির্বাচন করে ক্ষমতায় এলেও আওয়ামী লীগ বেশি দিন ক্ষমতায় থাকতে পারবে না। বিএনপি চায় যেকোনো মূল্যে দাবি আদায় করতে। কেননা নির্বাচনে জয়লাভের সম্ভাবনা বেশি থাকায় দলের মাঠের নেতারা এখন নির্বাচনমুখী।
বিএনপির কেন্দ্রীয় ও মাঠের নেতারা মনে করেন, নির্বাচনে গেলে তাঁরা জয়লাভ করবেন। তাঁদের ধারণা, আগামী নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হলে তাঁরা ২০০-এর বেশি আসন পাবেন। দলের কয়েকজন নেতা বলেছেন, নিরপেক্ষ অনেক প্রতিষ্ঠান জরিপ করেছে। গণমাধ্যমগুলোও জরিপ করেছে। দেশি-বিদেশি এসব জরিপে বিএনপির এগিয়ে থাকার কথা বলা হয়েছে। সম্প্রতি প্রথম আলোর এক জরিপে বলা হয়েছে, বিএনপির সমর্থন বেড়েছে। দেশের অর্ধেক মানুষ (৫০.৩ শতাংশ) বিএনপিকে ভোট দিতে চায়। অন্যদিকে আওয়ামী লীগকে ভোট দিতে চায় ৩৬ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষ।

জনপ্রিয়তা বাড়লেও স্বস্তিতে নেই বিএনপির নেতারা। বিশেষ করে গ্রেপ্তার-আতঙ্কে আছেন দলটির কেন্দ্রীয় ও মাঠের নেতারা। দলটির যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আলাপকালে বলেন, ইতিমধ্যে সারা দেশে তাঁদের দলের ও জোটের নেতাদের বাসায় বাসায় পুলিশ তল্লাশি চালাচ্ছে, হয়রানি করছে। তবে বিএনপির প্রস্তুতি থেমে নেই। ঢাকাকে চারপাশ থেকে ঘেরাও করার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে আশপাশের জেলাগুলোকে প্রস্তুত করা হচ্ছে।

সাবেক নির্বাচন কমিশনার এম সাখাওয়াত হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, কোনো দল নির্বাচনে না এলে নির্বাচন কমিশনের আইনগত দিক থেকে কিছু করার নেই। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো হলো নির্বাচন কমিশনের প্রধান স্টেক হোল্ডার। বর্তমান কমিশন এখন পর্যন্ত দলগুলোর সঙ্গে নির্বাচন নিয়ে আলোচনা করেনি। এমনকি সব দলের অংশগ্রহণ বা চলমান সংকট নিয়ে তারা রাষ্ট্রপতির সঙ্গে কথা বলতে পারত, সেটাও করেনি। তিনি বলেন, কমিশনকে মনে রাখতে হবে, একতরফা নির্বাচন হলে দায় তাদের ঘাড়ে পড়বে। সব দলের অংশগ্রহণে সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য কমিশনের এখন পর্যন্ত কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি।

বিএনপি দাবি আদায়ের জন্য সরকারকে ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত সময় বেঁধে দিয়েছে। পরদিন ঢাকায় সমাবেশ থেকে কর্মসূচি ঘোষণারও পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। আবার একই দিন আওয়ামী লীগও ঢাকায় সমাবেশ করার ঘোষণা দিয়েছে। ফলে রাজনীতি সংঘাতের দিকে যাচ্ছে বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।

প্রশাসন ও পুলিশে দলীয়করণ, কিছু কর্মকর্তাকে ওএসডি করে রাখাসহ নানা কারণে কর্মকর্তাদের অনেকেই ক্ষুব্ধ হয়ে আছেন। নির্দলীয় সরকারের দাবির আন্দোলন শুরু হলে পুলিশ ও প্রশাসনের এই অংশের সহায়তা পাওয়া যাবে বলে ভাবছে বিএনপি। তাই আন্দোলন নিয়ে দলটি আশাবাদী। তবে সরকার চাইলে ভোট হবে। এতে বাধা দেওয়া যাবে না বলে মনে করছে দলীয় নেতৃত্ব। কেননা আইনে কত শতাংশ ভোট পড়লে নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হবে, আর কত শতাংশ হলে গ্রহণযোগ্য হবে না সে ব্যাপারে কিছু বলা নেই। ’৯৬- এর ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে খুব কমসংখ্যক ভোটার উপস্থিতি ছিল। এ জন্য সেই নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হয়নি। নির্বাচনে জিতে মাত্র দেড় মাসের মাথায় বিএনপিকে সরে যেতে হয়েছিল।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এমাজউদ্দীন আহমদ প্রথম আলোকে বলেন, বিএনপির সামনে নির্বাচন বর্জন করা ছাড়া কোনো উপায় নেই। সার্বিক অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, দেশ বড় ধরনের সংঘাতের দিকে যাচ্ছে। তিনি বলেন, সমাধানের কোনো পথ দেখা যাচ্ছে না। এটা গণতন্ত্র ও রাজনীতির জন্য ক্ষতির। রাজনীতিবিদেরা একটা সমাধানে আসতে পারছেন না, এটা লজ্জার।

যে কারণে নির্বাচনে যেতে চায় না বিএনপি: নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকার নিয়ে বিএনপি একটি অবস্থান নিয়ে নিয়েছে। এ নিয়ে হরতালও করেছে তারা। এ অবস্থায় দাবি থেকে সরে এলে ভোটের আগেই একধরনের ‘পরাজয়’ হবে। তা ছাড়া শেখ হাসিনাকে মেনে নির্বাচন করলে এবং ওই নির্বাচনে হারলে বা কারচুপি করে হারিয়ে দিলে বিএনপির কর্মীদের সক্রিয় রাখা সম্ভব হবে না। কিন্তু ভোটে না গেলে একতরফা নির্বাচনের দোহাই দিয়ে নেতা-কর্মীদের আন্দোলনের মাঠে রাখা যাবে। দলটি এ ক্ষেত্রে ’৯৬ ও ২০০৭-এর নির্বাচনের সময়কে বিবেচনায় নিচ্ছে। দুটি নির্বাচন আওয়ামী লীগ বর্জন করায় ’৯৬-এর নির্বাচনে জিতেও বিএনপি ক্ষমতায় থাকতে পারেনি। আর ২০০৭ সালের নির্বাচন হতেই পারেনি।

২০০৮-এর নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার ব্যাপারে একটি অবস্থান নিয়েছিলেন বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। কিন্তু সে সময় দলের ভেতরের এবং বিশেষ করে জোটের শরিক জামায়াতের চাপের কারণে শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে যায় দলটি। অন্যদিকে বিদেশি ও গোয়েন্দাদের অব্যাহত চাপও ছিল। বিএনপি মনে করে, ওই নির্বাচনে না গেলে নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে দলের যে খারাপ অবস্থা হয়েছিল তা হতো না। বিএনপি ভোটে না গেলে একতরফা নির্বাচন বলে এর গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হতো।

তা ছাড়া বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী মন্ত্রী-সাংসদদের পদে বহাল রেখে নির্বাচন সম্ভব নয় এবং এতে সবার জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি হবে না—এ বিষয়টি দেশের মানুষকে এবং বিদেশিদের বোঝাতে সক্ষম হয়েছেন বলে বিএনপির একাধিক নেতা প্রথম আলোকে বলেছেন।

নির্বাচন বর্জনের ক্ষেত্রে সমস্যা: বিদেশিদের কাছে নির্বাচন অগ্রহণযোগ্য হিসেবে তুলে ধরতে কমসংখ্যক ভোটার উপস্থিতি দেখাতে চায় বিএনপি। সাধারণত ৫০ শতাংশের কম ভোটার উপস্থিতিকে নৈতিকভাবে নির্বাচন অগ্রহণযোগ্য বলে মনে করা হয়। যদিও এর আইনগত কোনো ভিত্তি নেই।

সম্প্রতি ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠকে বিএনপির নেতারা একতরফা নির্বাচন হলে সেখানে পর্যবেক্ষক পাঠানোর ব্যাপারে ইইউর মনোভাব জানতে চান। ইইউ অবশ্য বলেছে, সব দল নির্বাচনে না এলে সেই নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হবে না এমনটা তারা মনে করে না। নির্বাচন গ্রহণযোগ্য বা অগ্রহণযোগ্য হওয়ার ক্ষেত্রে এটা প্রধান শর্ত নয়। ওই সময়ের পরিস্থিতিকে ইইউ গুরুত্ব দেবে। তবে সাধারণভাবে ঢাকার কূটনীতিকদের কাছ থেকে এ ধারণা পাওয়া যায় যে বিএনপি ও সমর্থক দলগুলো নির্বাচনে অংশ না নিলে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের পর্যবেক্ষক না পাঠানোর সম্ভাবনা বেশি।

এ ছাড়া একতরফা নির্বাচনের পর সরকারকে মোকাবিলার ক্ষমতা দলীয় নেতা-কর্মীদের থাকবে কি না, তা নিয়েও দলের মধ্যে প্রশ্ন আছে। তবে বিএনপি আন্দোলন ও নির্বাচন-পরবর্তী আন্দোলনের জন্য জামায়াতে ইসলামীকে গুরুত্ব দিচ্ছে। বিএনপি মনে করে, জামায়াতের এখন জীবন-মরণ সমস্যা। বিএনপিকে ক্ষমতায় নিতে না পারলে বা আওয়ামী লীগ আবার ক্ষমতায় এলে তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এ জন্য জামায়াত সর্বশক্তি দিয়ে মাঠে থাকবে বলেই বিএনপির ধারণা।

‘ঢাকা অচল’ করার কর্মসূচি সফল করা নিয়েও বিএনপির মধ্যে সন্দেহ আছে। সরকার একের পর এক গ্রেপ্তার করা শুরু করলে সেই আন্দোলন কীভাবে টিকবে, তা নিয়েও দুশ্চিন্তা আছে দলটির। এ জন্য আন্দোলন চলাকালে কয়েক স্তর নেতৃত্ব নির্ধারণ করা হচ্ছে। দলীয় চেয়ারপারসনকে গ্রেপ্তার করা হবে না, এমনটা ধরে নিয়ে খালেদা জিয়াই সরাসরি আন্দোলন পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।