একদলীয় নির্বাচন প্রতিহত করতে সবাইকে রাজপথে নামতে হবে :খালেদা

সমকাল প্রতিবেদক
নির্দলীয় সরকারের অধীনে অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের লক্ষ্যে সরকারকে সমঝোতার পথে আসার আহ্বান জানিয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন ও বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া। তিনি বলেন, সরকার সমঝোতার পথে না এলে একদলীয় নির্বাচন প্রতিহত করতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে রাস্তায় নামতে হবে। মঙ্গলবার বিকেলে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় তিনি এ আহ্বান জানান। বর্তমান সরকারের পাঁচ বছরে উন্নয়ন হয়নি_ দাবি করে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বলেছেন, যেটা হয়েছে তা কাল্পনিক প্রচারণা। গত পাঁচ বছর ধরে উঁচুগলায় উন্নয়নের কাল্পনিক প্রচারণা শুনতে শুনতে সবার কান ঝালাপালা হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সবকিছু
ডুবে যাচ্ছে সংকট ও অনিশ্চয়তার আবর্তে। একতরফা নির্বাচন ঠেকাতে ভোটকেন্দ্রে ‘সর্বদলীয় সংগ্রাম কমিটি’ গঠন করতে আবারও আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে বিএনপি সমর্থক ব্যবসায়ীদের নিয়ে নবগঠিত
‘বাংলাদেশ
ব্যবসায়ী পরিষদ’-এর উদ্যোগে ‘দেশের বর্তমান ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি’ শীর্ষক এই মতবিনিময় ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সংগঠনের সভাপতি এফবিসিসিআইর সাবেক সভাপতি ও বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আবদুল আউয়াল মিন্টুর সভাপতিত্বে ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের বর্তমান অবস্থা ও সমস্যা তুলে ধরে বক্তব্য রাখেন। একই সঙ্গে তারা চলমান সংকট নিরসনে প্রধানমন্ত্রীকে দ্রুত উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান।
সভায় এফবিসিসিআইর সাবেক সভাপতিদের মধ্যে চৌধুরী তানভীর আহমেদ সিদ্দিকী, মাহবুবুর রহমান, এমএ কাসেম, আকরাম হোসেন, মীর নাসির হোসেন, ফরেন ইনভেস্টমেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের নেতা অলিউর রহমান, টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি এমএ আউয়ালসহ শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
সভায় বক্তব্য রাখেন বিজিএমইএর সভাপতি আতিকুল ইসলাম ও বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি কাজী মনিরুজ্জমান, এফবিসিসিআইর সাবেক সহসভাপতি আবুল কাশেম হায়দার, বাংলাদেশ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সালাম মুর্শেদী, বিকেএমইএর সহসভাপতি মোহাম্মদ হাতেম, বিটিএমইএর সহসভাপতি আবদুল মান্নান, পরিবহন মালিক সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম, এফবিসিসিআইর পরিচালক মো. জালাল উদ্দীন, আবদুল মোতালেব, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মো. আবদুল ওয়াহেদ, রাজশাহী চেম্বারের সাবেক সভাপতি লুৎফর রহমান, সিএনজি স্টেশন মালিক সমিতির সভাপতি জাকির হোসেন, ঔষধ শিল্প সমিতির সাবেক সভাপতি এসএম শফিউজ্জামান খোকন, রিহ্যাবের সিনিয়র সহসভাপতি মোবারক হোসেন খান, ফ্রোজেন ফুড এক্সপোর্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শাহেদুর রহমান, উত্তরবঙ্গ পোলট্রি অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালক আমিনুর রশীদ তাপস, এফবিসিসিআইর সাবেক পরিচালক আফজাল হোসেন, ফরিদপুর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আওলাদ হোসেন বাবর, বায়রার সহসভাপতি মোয়াজ্জেম হোসেন, বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি এসএম ফজলুল হক, এফবিসিসিআইর সাবেক প্রথম সহসভাপতি কামাল উদ্দিন আহমেদ।
সভায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বরকতউল্লা বুলু বক্তব্য রাখেন।
২৫ অক্টোবরের পর দেশের পরিস্থিতি সম্পর্কে খালেদা জিয়া বলেন, নির্দলীয় সরকার না দিয়ে যদি একতরফাভাবে নির্বাচনের পথে এগিয়ে যায় সরকার, তা হলে আমরা প্রতিহত করব। আমি সিলেটেও বলেছি, আজও বলছি_ ভোটকেন্দ্রভিত্তিক সংগ্রাম কমিটি গঠন করে ওই ভোট প্রতিহত করা হবে।
তিনি বলেন, একদলীয় নির্বাচন প্রতিহত করতে ব্যবসায়ীদেরও সোচ্চার হতে হবে। একক নির্বাচনের মাধ্যমে একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠা হবে। ওই শাসন কোনোভাবে দেশের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি আনবে না। একদলীয় শাসনে ব্যক্তি ও গোষ্ঠীভিত্তিক উন্নয়ন হয়। আর মাত্র ‘কয়েক দিন’ বাকি। সামনে দেশের সুদিন আছে। আমরা ক্ষমতায় গেলে ব্যবসাবান্ধব সরকার গঠন করব।
দেশের বর্তমান ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ পরিস্থিতিসহ রাজনৈতিক অবস্থা তুলে ধরে বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া বলেন, গত পাঁচ বছর ধরে উঁচুগলায় উন্নয়নের কাল্পনিক প্রচারণা শুনতে শুনতে সবার কান ঝালাপালা হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সবকিছু ডুবে যাচ্ছে সংকট ও অনিশ্চয়তার আবর্তে।
তিনি অভিযোগ করেন, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় পোশাকশিল্প ধ্বংস করার নীল নকশা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ব্যবসায়িক সংগঠনগুলো দলীয়করণ করা হয়েছে। কেবল তাই নয়, নোবেল বিজয়ী গ্রামীণ ব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানকে সরকার ধ্বংস করার চেষ্টা চালাচ্ছে।
আগামীতে ক্ষমতায় গেলে বিএনপির করণীয় তুলে ধরে খালেদা জিয়া বলেন, শাসনতান্ত্রিক সংস্কার, রাষ্ট্রকাঠামোর যুগোপযোগী বিন্যাস, আইনসভা ও বিচারালয়ের দক্ষ কার্যকারিতা প্রতিষ্ঠা, শাসনব্যবস্থা বিকেন্দ্রীকরণ, সুশাসন, ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার, বিনিয়োগ, শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান, শান্তি-স্থিতি-নিরাপত্তা বিষয়ে নীতিমালা ও কর্মকৌশল আমরা সম্পাদন করেছি। আমরা নতুন ধারার রাজনীতি ও যুগের চাহিদার আলোকে নতুন ধারার সরকার গঠন করব।
তিনি বলেন, তার সরকারে মেধা ও যোগ্যতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। সবার মতামত ও প্রতিনিধিত্বকে নিশ্চিত করব। দুর্নীতি, সন্ত্রাস ও সংকীর্ণ দলীয়করণকে প্রশ্রয় দেওয়া হবে না।
খালেদা জিয়া বলেন, এ সরকারের অপশাসনে দেশের গণতন্ত্র আজ চোরাবালিতে হারিয়ে যেতে বসেছে। সবার মিলিত চেষ্টায় রুগ্ণ গণতন্ত্রকে সারিয়ে তুলতে হবে। শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিক পন্থায় ক্ষমতা হস্তান্তরের পথ উন্মুক্ত করতে হবে।
তিনি অভিযোগ করেন, সরকার পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে জনগণের অধিকারকে কেড়ে নিয়ে ‘কলংকের নতুন’ অধ্যায়ের সূচনা করা হয়েছে। এ কলংক মুছতে হবে বলেও জানান বিরোধীদলীয় নেতা। সরকারে সাড়ে চার বছরের দুর্নীতি-অনিয়মসহ নানা ব্যর্থতা তুলে ধরে তার সমালোচনা করেন তিনি।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, এ সরকারের অপশাসনে দেশের অর্থনীতি রসাতলে যাচ্ছে। এর পরিবর্তনে ব্যবসায়ীদেরও ভূমিকা রাখতে হবে।
আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, পাঁচ বছর পর একটি ভোট। সেই ভোটের আওতা থেকে ব্যবসায়ীরা বাইরে নন। সরকার সেই ভোটকে চুরি করে নিয়ে যেতে চায়। তাই ঈদের পর ভোটের আন্দোলন ব্যবসায়ীদের মাথায় রাখতে হবে। তিনি বলেন, দেশের অর্থনীতিকে যে অবস্থায় নিয়ে গেছে, তা থেকে উত্তরণে সরকার পরিবর্তনের কোনো বিকল্প নেই।
আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, উদীয়মান অর্থনীতি এখন রসাতলে যাচ্ছে। বিভিন্ন খাত থেকে টাকা লুটপাট চলছে। এই টাকা আত্মসাৎকারীদের সুযোগ দিয়ে বিনা প্রয়োজনে ব্যাংক করা হচ্ছে। দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা ব্যবসা ছেড়ে দিচ্ছে। এমন অবস্থা থেকে উত্তরণে ব্যবসায়ীদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
বিজিএমইএর সভাপতি আতিকুল ইসলাম বলেন, পোশাকশিল্প ও শ্রমিকদের নিয়ে কেউ রাজনীতি করলে তা দেশের জন্য শুভ হবে না। দেশে যে সংকট তৈরি হয়েছে, সরকার ও বিরোধী দলকে একত্রিতভাবে তা নিরসনে কাজ করতে হবে_ এটাই আমরা প্রত্যাশা করি। পোশাকশিল্পে প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার নেওয়া বিভিন্ন কার্যকরী পদক্ষেপের প্রশংসা করেন তিনি।