একাধিক আচরণবিধি প্রস্তুত করছে ইসি

'লাভজনক পদ'-এর সংজ্ঞার আইনি দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে

মসিউর রহমান খান
নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখা নিয়ে সৃষ্ট জটিলতার মধ্যেই সংসদ নির্বাচনের আচরণবিধি তৈরির প্রস্তুতি নিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলুপ্ত হলেও বিদ্যমান আচরণবিধি তার আলোকেই তৈরি। বর্তমান সংবিধানের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে নতুন আচরণবিধি তৈরির বিকল্প নেই।
ইসি সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, নির্বাচনের আগে সংসদ ভেঙে দেওয়া হোক অথবা সংসদ বহাল রাখা হোক, বিদ্যমান আচরণবিধিতে সবার জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করার সুযোগ নেই। এ জন্য অবশ্যই আচরণবিধিতে পরিবর্তন আনতে হবে। সংবিধানের ১২৩ (৩)-এর উপধারা (ক) অথবা (খ) এবং বিদ্যমান বিধিকে বিবেচনায় রেখে নতুন আচরণবিধির খসড়া তৈরি করা হচ্ছে। সংসদ বহাল রেখে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে এক ধরনের আর তা ভেঙে দিয়ে নির্বাচন হলে আরেক ধরনের
আচরণবিধি তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। এর আলোকে কমিশনের পক্ষ থেকে প্রজাতন্ত্রের লাভজনক পদের সংজ্ঞার আইনি ব্যাখ্যা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে এমপি ও জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান পদে নিযুক্ত প্রশাসকরা নির্বাচনের যোগ্য হবেন কি-না তা নিয়ে দ্বিধা-দ্বন্ধে রয়েছে ইসি। এছাড়াও মন্ত্রী ও তাদের সমমর্যাদার ব্যক্তিরা নির্বাচনী প্রচারে রাষ্ট্রীয় প্রটোকল না প্রটেকশন পাবেন, তা এখনও নিশ্চিত নয়।
তবে ইসি সচিবালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কমিশনের পক্ষ থেকে নীতিগত সিদ্ধান্ত পেলে আচরণবিধি চূড়ান্ত করা খুব কঠিন হবে না। তাদের মতে, বিলুপ্ত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার আলোকে গঠিত বর্তমান আচরণবিধির আওতায় স্পিকার পদে থেকেই নির্বাচন করছেন। সে ক্ষেত্রে খুব বেশি বিতর্ক ওঠেনি। এসব রেওয়াজ মাথায় রেখেই একাধিক খসড়া প্রস্তুত করা হচ্ছে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ইসি সচিব ড. মোহাম্মদ সাদিক জানান, আচরণবিধি নিয়ে কমিশনের নীতিগত কোনো সিদ্ধান্ত এখনও পাওয়া যায়নি। সবদিক বিচার-বিশ্লেষণ করে প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। আজকালের মধ্যেই কমিশন সভায় বিষয়টি নিয়ে আলোচনার ইঙ্গিত দেন তিনি।
আচরণবিধি সংশোধনের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করে নির্বাচন কমিশনার মো. শাহনেওয়াজ জানিয়েছেন, লাভজনক পদের সংজ্ঞা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। এর আওতায় এমপিরা পড়েন কি-না তা নিশ্চিত নয়। এ সংক্রান্ত বিভিন্ন আইনগত দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ ব্যাপারে ব্যাখ্যা চাইতে উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার সম্ভাবনার কথাও জানান তিনি।
এদিকে রাজনৈতিক পরিস্থিতির চূড়ান্ত পরিণতি না দেখে কমিশন আগ বাড়িয়ে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবে না বলে জানিয়েছে কমিশনের একটি দায়িত্বশীল সূত্র। যদিও কমিশন মনে করছে, নির্বাচনের আগে এ বিষয়ে যথেষ্ট সময় তাদের হাতে নেই। তবুও বিতর্ক এড়াতে কমিশন ভেবে-চিন্তে পা ফেলতে চাইছে।
এর আগে প্রধান দুই জোটের পরস্পরবিরোধী অবস্থানের প্রেক্ষাপটে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ জানিয়েছিলেন, নির্বাচন আয়োজনে দুই ধরনের প্রস্তুতি নিচ্ছে কমিশন। ইসি সচিবালয় সূত্র জানিয়েছে, বিদ্যমান সংবিধান অনুযায়ী এবং রাজনৈতিক সমঝোতার ভিত্তিতে নির্বাচন হতে পারে_ এ চিন্তা মাথায় রেখে সিইসি দুই ধরনের প্রস্তুতির কথা বলেছেন।
ইসির দায়িত্বশীল একাধিক সূত্র জানায়, গত জুলাই মাসে সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা প্রণয়নের কাজ শুরু করেছিলেন কমিশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর আলোকে প্রধানমন্ত্রী-মন্ত্রীদের প্রচারের সুযোগ রেখে ওই নির্বাচনী আচরণবিধির খসড়া তৈরি করা হয়েছিল। গত ২৭ আগস্ট কমিশনের সঙ্গে বিদেশি প্রভাবশালী কূটনীতিক ও দাতা সংস্থাদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে নির্বাচনে সব দলের অংশগ্রহণ ও লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরির নিশ্চয়তার ওপর জোর দেওয়া হয়। পরে জরুরি বৈঠকে করে এখনই আচরণবিধি চূড়ান্ত না করার সিদ্ধান্ত নেয় কমিশন।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ আবু হাফিজ বিষয়টি নিয়ে কমিশনের একাধিক বৈঠকের বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, নির্বাচনের প্রস্তুতির জন্য কিছু কেনাকাটা ছাড়া প্রায় সব কাজই শেষ পর্যায়ে। ভোটার তালিকা ছাপানোর কাজে প্রায় ৮ সপ্তাহের প্রয়োজন হবে। এ ছাড়া অন্য বড় কাজ তেমন বাকি নেই। তাই রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে আচরণবিধি তৈরির জন্য আরও কিছুটা সময় নেবে কমিশন। আর সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে পরামর্শের পর আচরণবিধি প্রণয়ন করা হবে। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, স্পর্শকাতর কোনো বিষয় আচরণবিধিতে অন্তর্ভুক্তির দরকার পড়লে সে ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলের সঙ্গে কমিশনকে অবশ্যই আলোচনায় বসতে হবে।
লাভজনক পদের সংজ্ঞা নিয়ে বিতর্ক :গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) ১৯৭২-এর ১২(১)(৩) অনুচ্ছেদে বলা আছে, লাভজনক পদে থেকে কেউ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন না। অন্যদিকে সংবিধানের ৬৬(২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘কোনো ব্যক্তি সংসদের সদস্য নির্বাচিত হইবার এবং সংসদ সদস্য থাকিবার যোগ্য হইবেন না, যদি…(চ) আইনের দ্বারা পদাধিকারীকে অযোগ্য ঘোষণা করিতেছে না, এমন পদ ব্যতীত তিনি প্রজাতন্ত্রের কর্মে কোনো লাভজনক পদে অধিষ্ঠিত থাকেন…।’ আর সংবিধানের ৬৬(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ‘এই অনুচ্ছেদের উদ্দেশ্য সাধনকল্পে কোনো ব্যক্তি কেবল রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী বা উপ-মন্ত্রী হইবার কারণে প্রজাতন্ত্রের কর্মে কোন লাভজনক পদে অধিষ্ঠিত বলিয়া গণ্য হইবেন না।’ অর্থাৎ এই পদে অধিষ্ঠিত ব্যক্তিদের লাভজনক পদে থাকা সত্ত্বেও নির্বাচনে অংশগ্রহণের অযোগ্য ঘোষণা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
এদিকে সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, এই বিতর্ক বিগত নির্বাচনের সময়েও উঠেছিল। এর একটা চূড়ান্ত নিষ্পত্তি প্রয়োজন। তিনি অবশ্য ব্যক্তিগতভাবে এমপি ও জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদে নিযুক্ত প্রশাসকদের লাভজনক পদে অধিষ্ঠিত বলেই মনে করেন।
তবে সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক বলেন, “যেহেতু সংসদ সদস্যরা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী নন, সে কারণে সংবিধান অনুযায়ীই তাদের পদ ‘লাভজনক’ নয়। লাভজনক পদ হতে হলে তাকে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হতে হবে এবং তার নিয়োগ, বদলি কিংবা বরখাস্তের ক্ষমতা থাকতে হবে সরকারের হাতে। এ ছাড়া লাভজনক পদের সংজ্ঞা অনুযায়ী এই পদের কিছু নির্বাহী ক্ষমতা থাকতে হবে, তার বেতন-ভাতাও হতে হবে সরকারের কোষাগার থেকে। কিন্তু এমপিদের ক্ষেত্রে এমন কোনো কিছু করার ক্ষমতাই সরকারের নেই, এমপিদের কোনো নির্বাহী ক্ষমতাও নেই। সে কারণে তাদের পদ লাভজনক নয়।”
বিশিষ্ট আইনজীবী ও সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল মাহমুদুল ইসলামের মতে, ‘লাভজনক পদ বলতে এমন পদকে বোঝায়, যা থেকে লাভ অর্জন করা সম্ভব।’ তিনি তার ‘কনস্টিটিউশন ল অব বাংলাদেশ’ বইয়ের দ্বিতীয় সংস্করণের ৩৪৪ নম্বর পৃষ্ঠায় লিখেছেন_ কোনো ব্যক্তি ‘অফিসে’ অধিষ্ঠিত না হলে, তিনি সংসদ সদস্য হওয়ার অযোগ্য হবেন না, যদিও তিনি ‘প্রফিট’ বা লাভ অর্জন করেন।
ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট গুরু গোবিন্দ বসু বনাম শঙ্করি প্রসাদ ঘোষাল (এআইআর ১৯৬৪ এসসি ২৫৪) মামলার রায়ে এসব মানদ নির্ধারণ করে দিয়েছেন। মানদ গুলো হলো :(১) সরকার নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ কি-না; (২) সরকারের নিয়োগ বাতিলের ক্ষমতা আছে কি-না; (৩) সরকার বেতন-ভাতা নির্ধারণ করে কি-না; (৪) কোন উৎস থেকে বেতন-ভাতা প্রদান করা হয়; এবং (৫) পদাধিকারী কীভাবে দায়িত্ব পালন করবেন, তা নির্ধারণের ক্ষমতা সরকারের আছে কি-না।’ ভারতীয় আদালত ও নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালের এ বিষয়ে একাধিক রায় রয়েছে এবং এসব রায়ে লোকসভা/রাজ্যসভার সদস্য ও প্রাদেশিক পরিষদের বিধায়কেরা সরকারের লাভজনক পদে অধিষ্ঠিত এবং সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণে অযোগ্য নন বলে সুস্পষ্ট ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ সংবিধানের ১৫২(১) অনুযায়ী, ‘প্রজাতন্ত্রের কর্ম অর্থ আধাসামরিক বা সামরিক ক্ষমতায় বাংলাদেশ সরকার-সংক্রান্ত যে কোনো কর্ম, চাকুরী বা পদ এবং আইনের দ্বারা প্রজাতন্ত্রের কর্ম বলিয়া ঘোষিত হইতে পারে, এইরূপ অন্য কোনো কর্ম।’