রিয়াজুল হক হত্যাকাণ্ড

এক আসামির পক্ষে ২২ নেতা ও এক সাংসদ

যুবলীগের নেতা রিয়াজুল হক খান মিল্কি হত্যা মামলার আসামি মতিঝিল থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জাহিদুল ইসলাম ওরফে টিপুর বিরুদ্ধে ‘কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার আগে নিরপেক্ষ তদন্তের জন্য’ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছেন মহানগর, মতিঝিল ও বিভিন্ন ওয়ার্ডের ২২ নেতা। তাঁদের আবেদনের পক্ষে সুপারিশ করেছেন স্থানীয় সাংসদ রাশেদ খান মেনন।আবেদনপত্রে ৩১ জনের নাম থাকলেও নয়জনের স্বাক্ষর নেই। তাঁদের কয়েকজনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তাঁরা সরাসরি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে মহানগর ও মতিঝিল আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, রিয়াজুল হত্যার পর কিছুদিন গা ঢাকা দিয়ে থাকলেও এই আবেদনের সুযোগ নিয়ে জাহিদুল এখন অনেকটা প্রকাশ্যেই আছেন।এ ঘটনায় নিহত রিয়াজুলের ভাই মেজর রাশেদুল হক খান বাদী হয়ে ১১ জনের নাম উল্লেখ করে গুলশান থানায় মামলা করেন। মামলার তদন্তকারী সংস্থা র‌্যাব এ পর্যন্ত নয়জনকে গ্রেপ্তার করেছে। তাঁদের মধ্যে এজাহারভুক্ত আসামি ছয়জন। গত ২৯ জুলাই রাতে গুলশানে একটি বিপণিবিতানের সামনে গুলি করে হত্যা করা হয় যুবলীগের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক রিয়াজুলকে। বিপণিবিতানের ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরায় খুনের দৃশ্য ধরা পড়ে। ভিডিও ফুটেজ দেখে রাতেই উত্তরার একটি ক্লিনিক থেকে যুবলীগ দক্ষিণের যুগ্ম সম্পাদক জাহিদ সিদ্দিকী ওরফে তারেকসহ কয়েকজনকে আটক করে র‌্যাব। র‌্যাব হেফাজতে দুই দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর ৩১ জুলাই রাতে তারেক ‘ক্রসফায়ারে’ নিহত হন।

মামলার এজাহারে বলা হয়, মতিঝিল থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জাহিদুল ও যুবলীগ দক্ষিণের সাধারণ সম্পাদক ওয়াহিদুল আলম আরিফের নির্দেশে জাহিদ সিদ্দিকী ওরফে তারেক, যুবলীগ উত্তরের সাংগঠনিক সম্পাদক সাখাওয়াত হোসেন ওরফে চঞ্চলসহ কয়েকজন রিয়াজুলকে হত্যা করেন। জাহিদুল, ওয়াহিদুল ও সাখাওয়াত এখনো গ্রেপ্তার হননি। ৩১ জুলাই তারেক ‘ক্রসফায়ারে’ নিহত হওয়ার কয়েক দিন পরই জাহিদুলের পক্ষে ওই আবেদন করা হয়।

জানতে চাইলে সাংসদ রাশেদ খান মেনন প্রথম আলোকে বলেন, ‘আবেদনে সুষ্ঠু তদন্তের কথা বলা হয়েছে। অন্য কিছু লেখা হয়নি।’ গত ৫ আগস্ট আবেদনপত্রটিতে ‘প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য জোর সুপারিশ করা গেল’ লিখে স্বাক্ষর করেন সাংসদ মেনন।

র‌্যাব-১-এর অধিনায়ক কিসমত হায়াত প্রথম আলোকে বলেন, ‘আবেদনের বিষয়টি আমার জানা নেই। কোনো পক্ষ থেকে আমাদের ওপর চাপও নেই। আমরা তদন্ত থেকে প্রাপ্ত তথ্যকে প্রাধান্য দিচ্ছি। তদন্তে যে কেউই জড়িত থাকুক না কেন, ছাড় দেওয়া হবে না।’

সাধারণত মামলার আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয় অথবা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। কিন্তু জাহিদুলের ক্ষেত্রে কিছুই হয়নি, কেন—জানতে চাইলে কিসমত হায়াত বলেন, ‘আমরা অভিযান চালিয়েছি। কিন্তু তিনি (জাহিদুল) ধরা পড়েননি।’

আবেদনপত্রে ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের চারজন, মতিঝিল থানা আওয়ামী লীগের ১৪ জন এবং ওয়ার্ড পর্যায়ের ১৩ জন নেতাসহ মোট ৩১ জনের নাম আছে। তবে নয়জনের স্বাক্ষর নেই।

আবেদনে স্বাক্ষরকারীরা হলেন ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ ইসমত জামিল আকন্দ ওরফে লাভলু এবং সদস্য কামাল চৌধুরী ও শেখ সেকান্দার আলী। মতিঝিল থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি গোলাম আশরাফ তালুকদার, জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ফজলে এলাহী বাদল, সহসভাপতি শহিদ রেজা ওরফে বাচ্চু, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোজাম্মেল হক, সাংগঠনিক সম্পাদক মোস্তাফিকুর রহমান ওরফে রতন, সাংস্কৃতিক সম্পাদক শেখ এনায়েত করিম ওরফে বাবলু, ধর্মবিষয়ক সম্পাদক জাকির হোসেন, ত্রাণ ও সমাজকল্যাণবিষয়ক সম্পাদক ফরহাদ হোসেন ওরফে মিলন, দপ্তর সম্পাদক কাজী আমিরুল ইসলাম ওরফে মিরাজ এবং সদস্য মোস্তফা জামান বাদল ও আবু হানিফ। ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সভাপতি সুলতান মিয়া, সাধারণ সম্পাদক ফ ম সেকান্দর; ১০ নম্বর ওয়ার্ডের সভাপতি শেখ নওশের আলী, সাধারণ সম্পাদক শাহ ইসকান্দার আলী, ১১ ওয়ার্ডের সভাপতি আবদুল লতিফ, সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন; ১২ নম্বর ওয়ার্ডের যুগ্ম আহ্বায়ক শেখ মুনির হোসেন, ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের সভাপতি এনামুল হক।

সমমনা অন্য একটি দলের মতিঝিল থানা শাখার একাধিক নেতা বলেন, সাংসদ রাশেদ খান মেনন এখানে নিরুপায়। কারণ, তিনি আওয়ামী লীগের নন, ওয়ার্কার্স পার্টির নেতা। আর মতিঝিল এলাকার নিয়ন্ত্রণ জাহিদুলের হাতে।

স্বাক্ষরকারী মতিঝিল থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি গোলাম আশরাফ প্রথম আলোকে বলেন, ‘মামলার তদন্তকে ত্বরান্বিত করার জন্য এ আবেদন করেছি। কারও পক্ষে নয়।’ তদন্ত কি তাহলে ধীরগতিতে চলছে?—এ প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে আমার জানা নাই।’

আলোচিত এই খুনের মামলার আসামিদের মধ্যে রাজনৈতিক পদধারী জাহিদুল, ওয়াহিদুল ও সাখাওয়াত এখনো গ্রেপ্তার হননি।

আসামি জাহিদুলের পক্ষে কোনো আবেদন পেয়েছেন কি না, জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর বলেন, ‘আবেদনপত্র পেয়েছি। তবে কারও দাবির মুখে আমরা তো তদন্ত করব না। আমরা যথার্থ তদন্ত করার জন্য পদক্ষেপ নিয়েছি।’