এটিএম বুথের নিরাপত্তাকর্মী হত্যা সিসি ক্যামেরাবন্দি খুনের দৃশ্য

ভোর ৫টা ২০ মিনিট। রাজধানীর মোহাম্মদপুরে নূরজাহান রোডে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের এটিএম বুথের সামনে দায়িত্ব পালন করছেন নিরাপত্তাকর্মী এনামুল হক (২৪)। এ সময় তাঁর সামনে এক মেয়ে এসে কথা বলা শুরু করে। একপর্যায়ে তাদের মধ্যে বাগ্‌বিতণ্ডা শুরু হয়। এর দুই থেকে তিন মিনিটের মাথায় আরো তিনজন লোক আসে। তারা এনামুলের ওপর হামলা করে ৫টা ৩০ মিনিটে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। মাত্র ১০ মিনিটে তার মৃত্যু নিশ্চিত করে ঘাতকরা।
গতকাল রবিবার ভোরে নিরাপত্তাকর্মী এনামুলকে হত্যার দৃশ্য ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের এটিএম বুথটির ক্লোজড সার্কিট (সিসি) ক্যামেরায় এভাবেই ধরা পড়ে। ভিডিও ফুটেজটি হাতে পেয়ে পুলিশ খুনিদের ব্যাপারে অনেকটা নিশ্চিত হতে পেরেছে বলে জানা যায়। হত্যার পর খুনিরা টাকা লুট বা নিহতের সঙ্গে থাকা মানিব্যাগের দিকেও নজর দেয়নি। এ সময় আরেক নিরাপত্তাকর্মী বুথের ভেতরে তালাবদ্ধ অবস্থায় ঘুমাচ্ছিলেন।
ঘটনার পর নিহতের বাবা আবদুর রশিদ বাদী হয়ে মোহাম্মদপুর থানায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। দায়িত্বরত আরেক নিরাপত্তাকর্মী এরশাদকে জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য আটক করেছে পুলিশ।
পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) বিপ্লব কুমার সরকার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে পূর্বশত্রুতার জের ধরেই তাঁকে খুন করা হয়েছে। ভিডিও ফুটেজ দেখে মনে হয়েছে, আগতদের টাকা লুট করার কোনো পরিকল্পনা ছিল না।’
পুলিশ জানায়, গতকাল রবিবার ভোরে এনামুল হক নূরজাহান রোডে ডাচ-বাংলা ব্যাংকের এটিএম বুথের নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন। এ সময় দুর্বৃত্তরা চাপাতি দিয়ে মাথায় আঘাত করে তাঁকে হত্যা করে। ভোর সাড়ে ৫টার পর বুথের সামনের ফুটপাতে এনামুলকে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে লোকজন পুলিশকে খবর দেয়। পুলিশ সকাল সোয়া ৬টার দিকে তাঁর লাশ উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠায়। নিহত এনামুল কিশোরগঞ্জ জেলার তাড়াইল উপজেলার ভাওয়াল গ্রামের আবদুর রশিদের ছেলে। তিনি ঢাকার মোহাম্মদপুরে রনবোদয় হাউজিংয়ে ৩ নম্বর রোডে মনজিল মিয়ার বাড়িতে ভাড়া থাকতেন।
একই বুথের দায়িত্বে থাকা নিরাপত্তা সংস্থা ‘এলিট ফোর্স’-এর দ্বিতীয় কর্মী এরশাদ জানান, তিনি বুথের ভেতরে ছিলেন। এনামুল বাইরে থেকে তালা দিয়ে বুথের সামনে অবস্থান করছিলেন। তিনি ঘুমিয়ে পড়ার কারণে বাইরের বিষয়টি টের পাননি। পরে বুথের সামনে রাস্তায় অনেক লোকের অবস্থান টের পান। কিন্তু তালা বন্ধ থাকায় তিনি ভেতর থেকে বাইরেও বের হতে পারছিলেন না। পরে এনামুলের পকেট থেকে চাবি নিয়ে পুলিশ তালা খুলে দিলে তিনি বের হয়ে সহকর্মীর মৃতদেহ দেখতে পান।
নিহতের ভগ্নিপতি জামাল হোসেন জানান, বৃদ্ধ মা-বাবার একমাত্র ভরসা ছিল এনামুল। এক বছর ধরে নিরাপত্তারক্ষী সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এলিট ফোর্সের একজন কর্মী হিসেবে কাজ করছিল। এবারও ঈদুল আজহার সময় বাড়িতে গিয়ে কোরবানি দেওয়ার কথা ছিল। তার কারো সঙ্গে শত্রুতা ছিল না। কারা তাকে হত্যা করতে পারে এ বিষয়টিও তাঁরা ভেবে পাচ্ছেন না।
এলিট ফোর্সের পরিচালক মোহাম্মদ খোরশেদ আলম জানান, রাত ১০টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত এনামুল ও এরশাদ ওই বুথের দায়িত্বে ছিলেন। কর্মীরা ঠিকমতো দায়িত্ব পালন করছে কি-না তা দেখার জন্য তাঁদের নিয়মিত টহল টিম রয়েছে। টহল টিমের ভাষ্যমতে, তারা সর্বশেষ ভোর ৪টা পর্যন্ত বুথে ঠিকমতোই ছিলেন।
মোহাম্মদপুর থানার অফিসার ইনর্চাজ (ওসি) আজিজুল হক বলেন, ‘ব্যক্তিগত শত্রুতার দিকটি বিবেচনায় রেখে তদন্ত শুরু হয়েছে। ইতিমধ্যে খুনিদের ব্যাপারে কিছু ধারণা পাওয়া গেছে। আশা করছি, খুব দ্রুত ঘাতকদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হবে। হত্যার অন্য কোনো কারণ আছে কি না তা-ও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।’