এবার কেন্দ্রীয় নেতাদের ওপর চড়াও তৃণমূল

এবার কেন্দ্রীয় নেতাদের দুষলেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের তৃণমূলের নেতারা। আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে গতকাল শুক্রবার গণভবনে কুমিল্লা (উত্তর ও দক্ষিণ), চট্টগ্রাম (উত্তর, দক্ষিণ ও মহানগর), পাবনা ও রংপুর জেলার নেতাদের মতবিনিময় সভায় এই অভিযোগ করা হয়েছে। বৈঠকে উপস্থিত একাধিক নেতা এ কথা জানিয়েছেন।
মতবিনিময় সভায় এর আগে সূচনা বক্তব্যে বিরোধী দল বিএনপিকে উড়ে এসে জুড়ে বসা দল হিসেবে ইঙ্গিত করেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘এই জুড়ে বসাদের দেশের প্রতি দরদ থাকে না। দরদ তাদেরই থাকে, যারা সৃষ্টি করে। একমাত্র আওয়ামী লীগই পারে জনগণের কল্যাণ করতে। কারণ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বেই বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে।’
আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, ক্ষমতায় আসার আগে দেওয়া ওয়াদার চেয়ে সরকার বেশি উন্নয়ন করেছে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে দেশ পুরস্কার পায় আর বিএনপি ক্ষমতায় গেলে আন্তর্জাতিক তিরস্কার নিয়ে আসে দেশের জন্য। বিএনপি ক্ষমতায় এলে দেশের উন্নয়নের ধারা ব্যাহত হবে। তাই শান্তি ও সমৃদ্ধির ধারাবাহিকতা রক্ষায় জনগণ আবারও আওয়ামী লীগকে নির্বাচিত করবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আওয়ামী লীগকে জনগণ ভোট দেবে। কারণ আওয়ামী লীগ জঙ্গিবাদ দূর করেছে, একাডেমিক বিভিন্ন পরীক্ষায় পাসের হার বেড়েছে, স্বাক্ষরতার হার বেড়েছে, বিনা মূল্যে দরিদ্র মানুষ চিকিৎসা পাচ্ছে, দেশের সব শিক্ষার্থী বিনা মূল্যে বই পাচ্ছে। বিএনপি ক্ষমতায় এলে মানুষ এসব সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবে। তাদের এক নেতা তো বলেই দিয়েছেন যে তারা (বিএনপি) ক্ষমতায় এলে কমিউনিটি ক্লিনিকে তাদের সেই ছাগল প্রজেক্ট চালু করা হবে।
বিরোধী দল সরকারের বিরুদ্ধে মিথ্যাচার করছে অভিযোগ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিরোধীদলীয় নেত্রী ভাঙা রেকর্ডের মতো মিথ্যা কথা বলতেই থাকেন। তারা এখন সারা দেশে কিছু মহিলা নামিয়েছে। তারা ইসলামের নামে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে।
এরপর তৃণমূলের নেতারা সভায় বক্তব্য দেন। পাবনার ভাঙ্গুরা উপজেলার নেতা বাকি বিল্লাহ বলেন, ‘কেন্দ্রীয় নেতারা ঢাকায় সভা-সমাবেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে এখন থেকে পথে-প্রান্তরে ঘুরে বেড়ালে স্বল্প সময়ের মধ্যেও আমরা অনেক কিছু গুছিয়ে আনতে সক্ষম হব। তাই কেন্দ্রীয় নেতাদের মাঠে-ময়দানে যেতে হবে। সর্বস্তরের মানুষের সঙ্গে মিশতে হবে।’ সারা দেশে আওয়ামী লীগের সব অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের কোন্দলের চিত্র তুলে ধরে তা নিরসনের পরামর্শ দেন তিনি।
চাটমোহরের সভাপতি অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন সাবু পাবনা-৩ আসনের সংসদ সদস্য মকবুল হোসেনের বিরুদ্ধে স্থানীয় জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মাহমুদকে সরকারি খরচে বিদেশ পাঠানোর অভিযোগ করেন। তাঁর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ারও পরামর্শ দেন এই তৃণমূল নেতা।
এদিকে কুমিল্লা ও রংপুরের নেতারা তাঁদের জেলায় মহাজোটের শরিক দলগুলোকে আগের থেকে আরো কম আসন ছাড় দেওয়ার পরামর্শ দেন। তাঁরা বলেন, এখানে দলের অবস্থান ভালো। তাই দলীয় প্রার্থীকেই এসব জেলায় বেশি মনোনয়ন দেওয়া উচিত। তবে শেখ হাসিনা মহাজোটগতভাবে নির্বাচন হবে জানিয়ে বলেন, যেখানে যাঁর জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা বেশি, সেখানে তাঁকেই মনোনয়ন দেওয়া হবে।
রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের নেতারা শেখ হাসিনার কাছে আবারও তাঁদের এলাকার সন্তান প্রযুক্তিবিদ সজীব ওয়াজেদ জয়কে আগামী নির্বাচনে মনোনয়ন দেওয়ার দাবি জানান। তবে এ ব্যাপারে কোনো কথা না বলে স্মিত হেসেছেন দলীয় সভাপতি।
কুমিল্লার দেবীদ্বার উপজেলার সভাপতি বক্তব্য দিতে গিয়ে দলীয় দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি চান। তিনি বলেন, ‘১৮ বছর ধরে একই দায়িত্বে আছি। আমার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এ দায়িত্ব ধরে রাখলে আগামীতে কিভাবে দল চলবে? আমাকে অব্যাহতি দিয়ে এখানে নতুন কাউকে দায়িত্ব দেওয়া হোক।’
সূত্র জানায়, চট্টগ্রামের রাজনীতির দিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চট্টগ্রামের নেতাদের ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার নির্দেশ দেন। চট্টগ্রামের তিনটি সাংগঠনিক জেলার নেতারাও ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার অঙ্গীকার করেন। পরে তৃণমূল নেতারা চট্টগ্রামে সব কটি আসনে যাঁরা এবার ভালো কাজ করেছেন, তাঁদের মনোনয়ন দেওয়া এবং যাঁরা দলকে তোয়াক্কা না করে কাজ করেছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি করেন। জবাবে শেখ হাসিনা বরাবরের মতোই বলেছেন, ‘যে প্রার্থীকে নৌকা প্রতীক দেওয়া হবে, তাঁর পক্ষে কাজ করতে হবে। আমাদের লক্ষ্য নৌকার বিজয়।’
মতবিনিময় সভায় উপস্থিত ছিলেন আবদুল লতিফ সিদ্দিকী, কাজী জাফর উল্লাহ, শেখ ফজলুল করীম সেলিম, সতীশ চন্দ্র রায়, ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, নূহ উল আলম লেনিন, আবুল হাসনাত আব্দুল্লাহ, মাহবুব-উল-আলম হানিফ, মৃণাল কান্তি দাস প্রমুখ।