এবার পোশাকশ্রমিকদের নেতা হতে চান নৌমন্ত্রী

এবার পোশাকশ্রমিকদের নেতা হতে চান নৌপরিবহনমন্ত্রী শাহাজান খান। দীর্ঘদিন ধরে তিনি পরিবহনশ্রমিকদের নেতা হয়ে আছেন। এখন আগ্রহ দেখাচ্ছেন দেশের সবচেয়ে বড় শিল্প খাত পোশাক খাতের প্রতি।প্রায় ছয় মাস আগে তিনি গঠন করেছেন গার্মেন্টস শ্রমিক সমন্বয় পরিষদ নামের একটি সংগঠন। আর প্রশাসনের সহায়তায় আয়োজন করা সেই সংগঠনের প্রথম মহাসমাবেশকে কেন্দ্র করে গতকাল গাজীপুর এলাকায় ব্যাপক ভাঙচুর ও রাস্তা অবরোধের ঘটনা ঘটেছে। পরিস্থিতি সামলাতে শতাধিক কারখানা ছুটি দেওয়া হয়। গতকাল শনিবার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এই সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।এই মহাসমাবেশ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তৈরি পোশাকমালিকেরা। সমাবেশের আয়োজক সংগঠনটির আহ্বায়ক নৌপরিবহনমন্ত্রী। মন্ত্রীর কারণেই কোনো তৈরি পোশাকমালিক সরাসরি বক্তব্য দিতে চাননি। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক মালিক বলেন, সড়ক পরিবহনশ্রমিকদের বড় নেতা শাজাহান খান। তিনি এখন পোশাকশ্রমিকদের নেতা হতে চাচ্ছেন। এরই অংশ হিসেবে মজুরি বাড়ানোর মতো জনপ্রিয় বিষয় সামনে রেখে এই মহাসমাবেশের আয়োজন। গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলায় গতকাল পোশাক-শ্রমিকেরা এই মহাসমাবেশকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভ ও ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করেছেন। তাঁরা কারখানা, যানবাহন, আশপাশের ব্যাংক, শোরুমসহ বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর চালিয়েছেন। তাঁরা চন্দ্রা এলাকার একটি কারখানায় ভাঙচুরের সময় ওই কারখানার শ্রমিকদের সঙ্গে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও সংঘর্ষ হয়। এতে দুই পক্ষের অন্তত ৩০ জন আহত হয়েছেন। পরে উপজেলার শতাধিক শিল্পকারখানা ছুটি ঘোষণা করা হয়।

ঢাকায় পোশাকশ্রমিক মহাসমাবেশে যোগ দিতে কারখানা ছুটি না দেওয়ার প্রতিবাদ এবং ন্যূনতম বেতন বাড়ানোর দাবিতে শ্রমিকদের একটি অংশ বিক্ষোভ ও ভাঙচুর চালায়। গার্মেন্টস শ্রমিক সমন্বয় পরিষদের উদ্যোগে গতকাল সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ওই মহাসমাবেশের আয়োজন করা হয়।

এই মহাসমাবেশে যোগ দিতেই পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা কারখানা বন্ধ রাখার দাবি জানান। কিন্তু মালিকপক্ষ কারখানা বন্ধ করতে অস্বীকৃতি জানানোয় সকাল সাড়ে আটটার দিকে কালিয়াকৈর উপজেলার মৌচাক এলাকার পূর্বাণী গ্রুপ, চন্দ্রা এলাকার নায়াগ্রা টেক্সটাইল, ড্রেসম্যান, চন্দ্রা পল্লী বিদ্যুৎ এলাকার আইমন টেক্সটাইল অ্যান্ড হোসিয়ারি লিমিটেড, ইকুটেক্স লিমিটেডসহ বেশ কিছু পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা কাজ বন্ধ করে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে নেমে আসেন।

পরে শ্রমিকেরা সংঘবদ্ধ হয়ে কালিয়াকৈর উপজেলার মৌচাক, সফিপুর ও চন্দ্রা এলাকায় ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করেন। এ সময় তাঁরা অর্ধশতাধিক যানবাহন ভাঙচুর করেন। বিক্ষুব্ধ শ্রমিকেরা লাঠিসোঁটা ও ইটপাটকেল নিয়ে সফিপুর বাজারের হাজি ওসমান আলী মার্কেটের দ্বিতীয় তলার শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক ও সিঙ্গার প্লাসের শোরুমসহ বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বাইরের কাচ ভাঙচুর করেন। পরে তাঁরা কালিয়াকৈর উপজেলার চন্দ্রা থেকে মৌচাক তেলিচালা পর্যন্ত যেসব কারখানা ছুটি দেওয়া হয়নি, সেসব কারখানায় ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন। এ সময় অনেক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়।

বাংলাদেশ তৈরি পোশাক উৎপাদক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সহসভাপতি শহীদুল্লাহ আজিম প্রথম আলোকে বলেন, ‘সমাবেশে যাওয়ার ব্যাপারে সমিতির পক্ষ থেকে আমরা কাউকে হ্যাঁ-ও বলিনি, না-ও বলিনি। আর অধিকার আদায়ের জন্য সমাবেশে যাওয়া তো যে কারোরই গণতান্ত্রিক অধিকার। আমরা এতে বাধা দেওয়ার কে?’

কোনো কোনো পোশাক কারখানার মালিক শ্রমিকদের সমাবেশে যেতে না দেওয়ার কারণেই ভাঙচুর-বিক্ষোভ হয়েছে কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘যা হয়েছে, তা বিচ্ছিন্ন ঘটনা। একটা শ্রেণীই থাকে, বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে পুঁজি করে অচলাবস্থা তৈরি করতে। এ ক্ষেত্রেও তা-ই হয়েছে।’

গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য ফোরামের মোশরেফা মিশু প্রথম আলোকে বলেন, ‘গাজীপুর এলাকায় পোস্টারিং হচ্ছিল কারখানা বন্ধ রাখার। আর শ্রমিকদের নিয়ে সমাবেশের মূল উদ্যোক্তা ছিলেন নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান। শিপমেন্টের অজুহাতে যেখানে শ্রমিকদের সাপ্তাহিক ছুটিই বাতিল করা হয়, কারখানা বন্ধের কথা শুনে তাই তাঁরা একরকম খুশি হয়েছিলেন। কিন্তু অনেক মালিক বাস্তবে কারখানা বন্ধ না করায় বিক্ষুব্ধ হয়েছেন শ্রমিকেরা।’

শ্রমিকেরা ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করার কারণে সকাল সাড়ে আটটা থেকে এই মহাসড়ক ও নবীনগর-কালিয়াকৈর সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এতে শত শত যান আটকা পড়ে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। এতে যাত্রীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। পরে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে পুলিশ গিয়ে শ্রমিকদের সড়ক থেকে সরিয়ে দিলে যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক হয়।

এর আগে সকাল ১০টার দিকে উপজেলার চন্দ্রা এলাকার নায়াগ্রা টেক্সটাইলের শ্রমিকেরা ওয়ালটন কারখানায় হামলা চালান। এ সময় ওয়ালটন কারখানার শ্রমিকেরা প্রতিরোধ করলে দুই পক্ষে পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। খবর পেয়ে গাজীপুর শিল্প পুলিশ ও কালিয়াকৈর থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে শ্রমিকদের লাঠিপেটা করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। পুলিশের লাঠিপেটা, দুই পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া এবং সংঘর্ষে কমপক্ষে ৩০ জন আহত হয়েছেন।

গাজীপুর শিল্পাঞ্চলের সহকারী পুলিশ সুপার মো. মোশারফ হোসেন জানান, শ্রমিক অসন্তোষ ও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং অনাকাঙ্ক্ষিত ভাঙচুর এড়াতে কারখানা কর্তৃপক্ষ গাজীপুর সদরের বোর্ডবাজার, কোনাবাড়ী, ভোগড়া, তোলিপাড়াসহ আশপাশের অর্ধশতাধিক কারখানা গতকাল ছুটি দিয়েছে।

আমাদের টঙ্গী (গাজীপুর) প্রতিনিধি জানান, কালিয়াকৈর উপজেলায় শ্রমিক অসন্তোষের খবর পেয়ে টঙ্গী শিল্প এলাকার কারখানা ছুটি ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ।

সাভার থেকে নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, সাভার ও আশুলিয়া এলাকায় সকালে যথাসময়ে কাজে যোগ দেন শ্রমিকেরা। বেলা ১১টার পর তাঁরা মহাসমাবেশে যোগ দিতে কারখানা কর্তৃপক্ষের কাছে ছুটি দাবি করেন। শ্রমিকদের দাবির মুখে অধিকাংশ কারখানা ছুটি ঘোষণা করা হয়।

তবে সাভার পৌর এলাকার জেকে গার্মেন্টস ছুটি দিতে অপারগতা জানালে শ্রমিকেরা কারখানার ভেতরে বিক্ষোভ শুরু করেন। নিরাপত্তাকর্মীরা বাধা দিলে তাঁরা ভাঙচুর করেন। পরে কারখানাটি ছুটি ঘোষণা করা হয়। একইভাবে সাভারের উলাইলের আল-মুসলিম গ্রুপের একটি কারখানার শ্রমিকদের ছুটি দেওয়া হয়নি। বিকেল তিনটার দিকে তাঁরা কারখানায় ভাঙচুর করে বের হয়ে যান। তাঁরা কারখানাসংলগ্ন ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধের চেষ্টা করলে পুলিশ বাধা দেয়।

নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার কাঠের পুল এলাকায় রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানা পলমল গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান এন কে কে নিটওয়্যার লিমিটেডের শ্রমিকদের ছুটি না দেওয়ায় তাঁরা কারখানার ভেতরে দুটি ব্যক্তিগত গাড়ি ও তিনটি কাভার্ডভ্যান ভাঙচুর করেন। একপর্যায়ে তাঁরা কারখানা থেকে বেরিয়ে পোস্ট অফিস-হাজীগঞ্জ সড়ক অবরোধের চেষ্টা করেন।

এদিকে ন্যূনতম মজুরি আট হাজার টাকা করার দাবিতে শ্রমিক ফ্রন্টের উদ্যোগে ফতুল্লার পঞ্চবটি বিসিক শিল্পনগরে সকাল আটটা থেকে নয়টা পর্যন্ত মানববন্ধন করা হয়।