এবার ১৮-দলীয় জোট ভাঙতে তৎপর সরকার

বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮-দলীয় জোটকে ভেঙে এর শরিক কয়েকটি দলকে শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে আনার তৎপরতা চলছে। ইতিমধ্যে অন্তত পাঁচটি দলের সঙ্গে সরকারের পক্ষ থেকে নানা মাধ্যমে যোগাযোগ শুরু হয়েছে।

আওয়ামী লীগের একাধিক সূত্র থেকে জানা গেছে, এসব দলের সঙ্গে সরকারের একজন মন্ত্রীকে পরোক্ষভাবে যোগাযোগ বজায় রাখার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে পরিকল্পনা বাস্তবায়নে মূল কাজ করছে সরকারের একাধিক সংস্থা।

সরকার ও দলীয় সূত্রগুলো জানায়, যেসব দলের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে এবং বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিলে ১৮-দলীয় জোটে তাঁদের মনোনয়ন পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা আছে—এমন দলগুলোকে লক্ষ্য করে জোট ভাঙার এই পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।

এর মধ্যে ১৮-দলীয় জোটের শরিক একটি দলের মহাসচিব নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেছেন, গত সপ্তাহে দুই দফা তাঁর সঙ্গে সরকারের পক্ষ থেকে ফোনে যোগাযোগ ও প্রলোভন দেখানো হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, ১৮-দলীয় জোট ভাঙার পাশাপাশি বিএনপিতে সংস্কারপন্থী হিসেবে কোণঠাসা হয়ে আছেন বা বিভিন্ন কারণে বিক্ষুব্ধ আছেন—এমন নেতাদের তালিকা তৈরি করেছে একটি গোয়েন্দা সংস্থা। তাঁদের বেশির ভাগ স্থানীয় বা আঞ্চলিক পর্যায়ের নেতা। তাঁদেরও দল ছেড়ে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার জন্য প্রলোভন, ক্ষেত্রবিশেষ ফাঁদে ফেলার কৌশল গ্রহণ করা হচ্ছে।

একজন মন্ত্রীসহ আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে দেওয়া প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাব বিরোধীদলীয় নেত্রী খালেদা জিয়া মানবেন না, এ বিষয়ে সরকার প্রায় নিশ্চিত। সরকারও এ বিষয়ে ছাড় দেবে না। তাই বিএনপি বর্জন করলেও নির্বাচন যাতে অংশগ্রহণমূলক দেখানো যায়—এ লক্ষ্যে বিরোধী জোট ভাঙার এই পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে মনে করা হচ্ছে, এতে একই সঙ্গে বিএনপি বা বিরোধী জোটকে মাঠের আন্দোলনে দুর্বল করাও সম্ভব হবে।

বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮-দলীয় জোটের শরিকদের মধ্যে রাজনৈতিক দল হিসেবে নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধন আছে ১৩টির। এর মধ্যে বিএনপিসহ জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী ঐক্যজোট, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি), খেলাফত মজলিস, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম চারদলীয় জোটের পুরোনো শরিক দল। পরে জোটভুক্ত হওয়া ১২টি দলের মধ্যে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি), জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা), বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি, ন্যাশনাল পিপলস পার্টি (এনপিপি), বাংলাদেশ মুসলিম লীগ (বিএমএল) ও ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এনডিপি) নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত দল। বাকি বাংলাদেশ ইসলামিক পার্টি, বাংলাদেশ লেবার পার্টি, বাংলাদেশ পিপলস লীগ, ন্যাপ ভাসানী ও ডেমোক্রেটিক লীগের (ডিএল) নিবন্ধন নেই।

১৮-দলীয় জোটের একাধিক সূত্র থেকে জানা গেছে, জোটের পুরোনো শরিক ধর্মভিত্তিক একটি দলসহ আরও কয়েকটি দলকে নির্বাচনে আনার চেষ্টা চলছে। বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিলে এই দলগুলোর সঙ্গে আসন ভাগাভাগি নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে জটিলতার আশঙ্কা রয়েছে। জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মহাসচিব মুফতি ওয়াক্কাছকে গত মাসে ঢাকায় কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের একটি বৈঠক থেকে আকস্মিকভাবে গ্রেপ্তার করা হয়। এই গ্রেপ্তারকে জোটের কোনো কোনো শরিক তাঁর দলকে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার চাপ বলে মনে করছেন।

এ ছাড়া অলি আহমদের নেতৃত্বাধীন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) শীর্ষ পর্যায়ের নেতৃত্বে সম্প্রতি দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। একটি গোয়েন্দা সংস্থা এই দ্বন্দ্বকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সরকারের একজন মন্ত্রী দাবি করেন, বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮-দলীয় জোটের মধ্যে থাকা অন্তত পাঁচটি দল সরকারের ইচ্ছার কাছাকাছি এসে যোগাযোগ রাখছে। বিএনপির সঙ্গে আসন ভাগাভাগিতে সুবিধা করতে পারবে না—এমন দলগুলো রয়েছে এই তালিকায়। এই দলগুলো কি ইসলামপন্থী, না এর বাইরের—জানতে চাইলে ওই মন্ত্রী বলেন, ‘ইসলামপন্থী ও বাইরের দুই রকমই আছে।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘আমার মনে হয় না, ১৮ দলের কোনো শরিক সরকারের এই ফাঁদে পা দেবে। আর যদি দু-একটি দল যায়ও, তাতে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মৌলিক আন্দোলনে তেমন কোনো প্রভাব পড়বে না। কারণ, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবির সঙ্গে জনগণ সম্পৃক্ত।’

আগে নিবন্ধিত এক দল থেকে অন্য দলে গিয়ে তিন বছর পর নির্বাচনে অংশ নেওয়ার শর্ত ছিল। সম্প্রতি নির্বাচন কমিশন গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশের (আরপিও) এ-সংক্রান্ত ধারা সংশোধন করেছে। এর যেকেনো ব্যক্তি এক দল থেকে আরেক দলে যোগ দিয়েই নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এ সুযোগটি কাজে লাগাতে সরকারের একটি সংস্থা ইতিমধ্যে কাজ করছে।

সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, সারা দেশে বিএনপির স্থানীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে ১৫০ জন নেতাকে লক্ষ্য করে এগোচ্ছে সরকার। এর মধ্য থেকে অন্তত অর্ধেককে নির্বাচনে আনা সম্ভব হবে বলে আশা করছে ওই সংস্থাটি।

আওয়ামী লীগের একজন জ্যেষ্ঠ নেতা আলাপকালে এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘দেখেন, সামনে চমক আছে। বিএনপির অনেক নেতা দলছুট হয়ে নির্বাচনে অংশ নেবেন না—এটার নিশ্চয়তা কী? আরপিও তো সেভাবেই হয়েছে।’

অবশ্য আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য নূহ-উল-আলম লেনিন দাবি করেন, ১৮-দলীয় জোট যদি ভাঙে, সেটা তাদের কারণে ভাঙবে। এ ক্ষেত্রে সরকারের কোনো ভূমিকা রাখার দরকার পড়বে না।