এভাবে গণতন্ত্র হয় না…সোহরাব হাসান

জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন থেকে শুরু করে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, দাতা সংস্থার প্রতিনিধিরা বাংলাদেশের আগামী নির্বাচন ও গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশের ব্যবসায়ী, দলীয় বৃত্তের বাইরের বিভিন্ন শ্রেণী ও পেশার মানুষ। কিন্তু এ ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি যাঁদের উদ্বিগ্ন ও বিচলিত হওয়ার কথা, সেই রাজনীতিবিদদের মধ্যে যে তেমন দুশ্চিন্তা নেই, তা বোঝা গেল দুই নেত্রীর বহুলালোচিত টেলিফোন সংলাপে। নিষ্ফল ও সেই টেলিসংলাপটির পর আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতারা এখন নিজ নিজ নেত্রীর সাফল্য নিয়ে আহ্লাদ প্রকাশ করছেন। এক পক্ষ মনে করছে, তাদের নেত্রী অপরিসীম ধৈর্য ধারণ করে জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্যতা অনেক গুণ বাড়িয়ে নিয়েছেন, আরেক পক্ষের দাবি, তাদের নেত্রী আরেকবার নিজেকে আপসহীন প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছেন।
আমি অবাক হব না, এই অতুলনীয় কৃতিত্বের জন্য আওয়ামী লীগ ও বিএনপি যদি বিশাল সমাবেশ ডেকে নিজ নিজ নেত্রীকে সংবর্ধনাও দেয়। ইতিমধ্যে সমর্থক বুদ্ধিজীবীরা ফোনালাপে কোন নেত্রী কত স্কোর করেছেন, প্রতিপক্ষের ছুড়ে মারা বল কত দক্ষতার সঙ্গে আউট করে দিয়েছেন, তার ফিরিস্তি দিতে শুরু করেছেন। কিন্তু এই মাননীয়রা একবারও উপলব্ধি করছেন না, বিশ্বের মানুষ আমাদের কী চোখে দেখছেন। আসলে মাছের পচন ধরে মাথা থেকেই।

উদ্বেগ, শিষ্টাচার ও ন্যায়াচার
গত বুধবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি বিদেশি কূটনীতিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে বলেছেন, বাংলাদেশের ব্যাপারে বন্ধুপ্রতিম দেশগুলোর উদ্বেগ থাকলে রাষ্ট্রদূতেরা তা সরকারকে জানাতে পারেন। এটাই শিষ্টাচার। তিনি কূটনৈতিক শিষ্টাচার সম্পর্কে কূটনীতিকদের সবক দিলেও রাজনৈতিক শিষ্টাচার কে কখন কতটা লঙ্ঘন করেছেন, তা বলেননি। ওই মতবিনিময় অনুষ্ঠানে কূটনীতিকেরা বলেছেন, ‘রাজনৈতিক সংকটের সমাধান না হওয়ায় আমরা হতাশ হয়েছি। বাংলাদেশের বন্ধু হিসেবে আমরা সব দলের অংশগ্রহণে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন দেখতে চাই।’(প্রথম আলো, ৩১ অক্টোবর ২০১৩)
বিদেশি রাষ্ট্রদূতদের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মূলে আগামী নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতা। বান কি মুনও তাঁর সর্বশেষ বিবৃতিতে বাংলাদেশে একটি বিশ্বাসযোগ্য ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের তাগিদ দিয়েছেন। ৬০ ঘণ্টার হরতালের পর দীপু মনি সে ব্যাপারে কি কূটনীতিকদের আশ্বস্ত করতে পেরেছেন? তিনি এও নিশ্চিত করতে পারেননি যে দুই নেত্রীর মধ্যে আলোচনা হবে, সব দল নির্বাচনে অংশ নেবে। বরং পররাষ্ট্রমন্ত্রী কূটনীতির ভাষায়ই বলেছেন, ‘আমরা আশা করি, প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবে বিরোধী দলের নেতা সাড়া দেবেন।’
অন্যদিকে বিরোধী দলও বলেছে, তাদেরও আশা, সরকার বিরোধী দলের নেতার প্রস্তাবে সাড়া দেবে। বাংলাদেশের রাজনীতির দুই প্রধান প্রতিযোগী যখন নিজ নিজ অবস্থানে অনড়, তখন কূটনীতিকদের উদ্বিগ্ন হওয়া এবং দেশের মানুষের অসহায়ত্ব প্রকাশ ছাড়া আর কী করার আছে? কূটনীতিকেরা নির্বাচনের ব্যাপারে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে নতুন কিছু শুনতে চেয়েছিলেন। তাঁরা হতাশ হয়েছেন। দেশবাসী আরও বেশি হতাশ। তিনি যা বলেছেন, তা তাঁরা প্রতিদিন টেলিভিশনেই দেখছেন, পত্রিকায় পড়ছেন। পরিস্থিতি খারাপ হলে কূটনীতিকেরা হয়তো পরিবার-পরিজন নিজেদের দেশে পাঠিয়ে দেবেন। কিন্তু ১৬ কোটি মানুষের তো যাওয়ার জায়গা নেই। রাজনীতিকেরা যদি ন্যায়াচার করতেন, তাহলে পাঁচ বছর পর তাঁদের এভাবে জিম্মি হতে হতো না।

আচরণবিধি, আরপিও এবং দলবদল
সম্প্রতি জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের অনুপস্থিতিতে ১৯৭২ সালের জনপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশের সংশোধনী আইন পাস করিয়ে নিয়েছে সরকারি দল। ২০০৮ সালের সংশোধনীতে যেকোনো ব্যক্তি দলে যোগ দিয়েই প্রার্থী হতে পারতেন না, অন্তত তিন বছর দলের সঙ্গে যুক্ত থাকতে হতো। বর্তমান সংশোধনীতে সেই বিধান তুলে দেওয়া হয়েছে। এখন যেকোনো ব্যক্তি যেকোনো দলে যোগ দিয়েই নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন। নাগরিক সমাজের পাশাপাশি বিরোধী দলের নেতারাও এই বিধানের কঠোর সমালোচনা করেছেন। তাঁদের দাবি, বিএনপিকে বেকায়দায় ফেলতেই এই সংশোধনী আনা হয়েছে। বিএনপি নির্বাচন বর্জন করলেও যাতে দলের অনেক প্রার্থী অন্য দলে যোগ দিয়ে নির্বাচন করতে পারেন, সরকার সেই ফাঁদ পেতেছে। তাঁদের এই অভিযোগ মিথ্যে নয়।
বাংলাদেশের নির্বাচনী রাজনীতিতে দলবদল নীতিবদলের মহামারি চলছে বহু বছর থেকেই। আমরা প্রবলভাবে ক্ষমতাসীনদের সুবিধাবাদী রাজনীতির বিরোধী। একই সঙ্গে এ কথাও বলতে হবে, দলবদলের খেলায় বরাবর বিএনপি ও জাতীয় পার্টি আওয়ামী লীগের চেয়ে এগিয়ে ছিল। আওয়ামী লীগে বিচারপতি নুরুল ইসলাম (এরশাদের উপরাষ্ট্রপতি) ও শামসুল হুদা চৌধুরীদের (জিয়াউর রহমানের মন্ত্রী) সংখ্যা কম। কিন্তু বিএনপির যে দুই বড় নেতা এম কে আনোয়ার ও মওদুদ আহমদ আরপিওর তীব্র বিরোধিতা করেছেন, তাঁদের শানে নজুলটা একবার জানা দরকার। আরপিওর এই অগণতান্ত্রিক ধারাবলেই ১৯৯৬ সালে মওদুদ আহমদ জাতীয় পার্টি ছেড়ে বিএনপিতে যোগ দিয়ে রাতারাতি উপনির্বাচনে প্রার্থী হয়েছিলেন। ১৯৮৬ সালে যে রাজনৈতিক দলটির টিকিটে তিনি নির্বাচিত হয়ে মন্ত্রী হয়েছিলেন, সেই দলটি নির্বাচনই করে জন্মের পাঁচ মাসের মাথায়। আর বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবক্তা জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি নির্বাচনটি করেছিলেন সেনাপ্রধানের পদে থেকে, যা সম্পূর্ণ সংবিধানবিরোধী। পরে তাঁর পদত্যাগ কার্যকর হয়েছিল ভূতাপেক্ষ তারিখ দিয়ে। এম কে আনোয়ার নব্বইয়ে এরশাদের মন্ত্রিপরিষদ সচিব ছিলেন। সেই সুযোগে তিনি এলাকায় অনেক উন্নয়নকাজও করিয়ে নিয়েছিলেন বলে অভিযোগ আছে। স্বৈরাচারের পতনের পর প্রথমে তিনি আওয়ামী লীগের কাছে টিকিট চেয়েছিলেন, সেখানে ব্যর্থ হয়ে বিএনপির কাছে যান এবং সফল হন। একানব্বইয়ের নির্বাচনের পর মন্ত্রীও হন। সে সময় মওদুদ বা এম কে আনোয়ার কেউ আরপিওর এই ধারার প্রতিবাদ করেননি। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব নির্বাচন কমিশন ঘোষিত আচরণবিধি তাদের পকেটে রেখে দিতে বলেছেন। কিন্তু ৬০ ঘণ্টার হরতালে হরতালকারীরা পথচারী ও যানবাহনের চালক ও যাত্রীদের ওপর যে নির্মম আচরণ করেছে, সে সম্পর্কে একটি কথাও বলেননি। নিন্দা জানাননি গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যমকর্মীদের ওপর সন্ত্রাসী হামলারও।

প্রাণহানি, সম্পদহানি, শক্তি প্রদর্শন
দল হিসেবে ৬৭ বছর বয়সী আওয়ামী লীগ অনেক বেশি সংগঠিত বলে নেতারা বড়াই করেন। এর লড়াকু নেতা-কর্মীর সংখ্যাও অন্য যেকোনো দলের চেয়ে বেশি। পঁচাত্তর-পরবর্তী রাজনীতিতে এটি তাঁরা বারবারই প্রমাণ করেছেন। এমনকি এরশাদবিরোধী আন্দোলনে খালেদা জিয়া আপসহীন নেত্রীর শিরোপা পেলেও আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীই বেশি মারা গেছেন, জেল-জুলুমের শিকার হয়েছেন।
এ কথা যেমন সত্য, তেমনি অসত্য নয় যে গত পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকার কারণে দলের ভেতরে কোন্দল, হানাহানির পাশাপাশি টুপাইস কামানোর প্রবণতাও বেড়েছে। যাঁরা নানা উন্নয়ন প্রকল্প, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি ও দখলবাজি, কাবিখা, টাবিখা ইত্যাদির সঙ্গে জড়িত, বিরোধী দলকে মোকাবিলা করতে তাঁরা জীবনের ঝুঁকি নেবেন, সেই ভরসা কম। অন্যদিকে যাঁরা গত পাঁচ বছরে কিছুই পাননি, নেতা, মন্ত্রী, সাংসদেরা যাঁদের এড়িয়ে চলেছেন, তাঁরাও রাস্তায় নামতে উৎসাহী হবেন না। তাই যেসব নেতা ‘আওয়ামী লীগ মাঠে নামলে বিএনপি-জামায়াতের টিকিটিও খুঁজে পাওয়া যাবে না’ বলে আস্ফাালন করেন, তাঁরা বোকার স্বর্গে বাস করছেন বলেই ধারণা করি। পুলিশ, বিজিবির প্রহরা না থাকলে তাঁরা নিজেরাও মাঠে নামতেন কি না, সংশয় আছে।
আর বিএনপি ও জামায়াতের মাঠে নামার মধ্যে একটি মৌলিক পার্থক্য আছে। জামায়াত-শিবির ঝটিকা মিছিল করে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করে, সুযোগ পেলে পুলিশ ও আওয়ামী লীগের কর্মীদের ওপর হামলা চালায়। কিন্তু বিএনপির নেতা-কর্মীদের বিভিন্ন স্থানে সরাসরি দলের সঙ্গে সম্মুখ সমরে লিপ্ত হতে দেখা গেছে। ভবিষ্যতে এই লড়াই কোন দিকে মোড় নেবে, বলা কঠিন। তাই, সরকারি দলের অতি বিশ্বাসী নেতা-মন্ত্রীদের পরিস্থিতি পুনর্মূল্যায়ন করতে বলব। পাঁচ বছর পর পর নির্বাচন নিয়ে মাঠে লাঠালাঠি গণতন্ত্র নয়। গণতন্ত্র হলো জনগণের জন্য জনগণের দ্বারা জনগণের শাসন। কিন্তু আমাদের নেতা-নেত্রীরা ভাবেন, গণতন্ত্র হলো ‘আমাদের জন্য আমাদের দ্বারা আমাদের শাসন।’ যিনি ক্ষমতায় থাকেন, তিনি নিজের সুবিধার জন্য সংবিধান, নির্বাচনী আইন— সবকিছু পরিবর্তন করাকেই অবশ্যকর্তব্য মনে করেন। আবার বিরোধী দলে থাকলে সেগুলো পরিত্যাজ্য ও পরিত্যক্ত হয়ে যায়। এর নাম গণতন্ত্র নয়। এভাবে গণতন্ত্র হয় না।
কয়েক মাস আগেও সব দলের অংশগ্রহণে একটি অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচন হবে বলে আশা করেছিলাম। এখনো করি। তবে সেই আশায় চিড় ধরতে শুরু করেছে। সংসদে আইন সংশোধন বা বৈঠকে সমঝোতার চেয়ে দুই পক্ষই এখন রাজপথে শক্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নিই, রাজপথের শক্তি পরীক্ষায় আওয়ামী লীগ জয়ী হলো। বিরোধী দল বিএনপিকে বাদ দিয়েই তারা একটি নির্বাচন করে ফেলল। সেই নির্বাচনের মাধ্যমে সংসদ ও সরকার গঠিত হবে। সেই সংসদে গৃহপালিত বা না পালিত একটি বিরোধী দলও থাকবে। কিন্তু গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে না। ২০১৪ সালে না হোক, ভবিষ্যতে কোনো নির্বাচনে যদি বিএনপি ক্ষমতায় যায় এবং আওয়ামী লীগ বিরোধী দলের আসনে বসে, তখন কি আওয়ামী লীগ নেতারা পঞ্চদশ সংশোধনী বহাল রাখতে বদ্ধপরিকর হবেন? ইতিহাস তা বলে না।
দেশের সাধারণ মানুষ নির্দলীয় বা সর্বদলীয়—এসব কূটতর্ক বোঝে না। তারা চায় সব দলের অংশগ্রহণে সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন। সেটি শেখ হাসিনা কীভাবে করবেন, সে সিদ্ধান্ত তাঁকেই নিতে হবে। যেহেতু তিনি ক্ষমতায়, বিরোধী দলকে নির্বাচনে আনার দায়িত্বও তাঁর। খালেদা জিয়া ক্ষমতায় থাকলে তাঁকেও একই কথা বলতাম। সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে।
 সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrab03@dhaka.net