এমপিও জালিয়াতিতে জড়িত সংঘবদ্ধ চক্র

মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতরে (মাউশি) ভুয়া এমপিওভুক্তির ঘটনা ঘটছেই। সংঘবদ্ধ চক্র জড়িত এ কাজে। চলতি বছরের জুন পর্যন্ত অন্তত ৭০০ শিক্ষকের এমপিও ভুয়া বলে অভিযোগ উঠেছে। বিভাগীয় তদন্তে ২৮৭টি ভুয়া চিহ্নিত করা হয়েছে। এগুলোর সরকারি সুবিধা স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৬টি ভুয়া এমপিওভুক্তির বিষয়ে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ জানিয়ে প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ভুয়া এমপিওর বেশিরভাগ কাগজপত্র জেলা শিক্ষা অফিস কর্তৃক প্রস্তাবিত নয়। আবার প্রস্তাবিত এমপিওভুক্তদের মধ্যে অনেকেরই শিক্ষক প্রাপ্যতা নেই অথবা প্রাপ্যতা থাকলেও মহিলা কোটা পূরণ হয়নি। বেশিরভাগ ভুয়া এমপিও সহকারী গ্রন্থাগারিককে সহকারী শিক্ষক হিসেবে দেখানো হয়েছে। এমন অনেক প্রতিষ্ঠানকে এমপিওভুক্তির আওতায় আনা হয়েছে যেসব প্রতিষ্ঠানের কোনো অস্তিত্ব নেই। নেই কোনো ভবন, শিক্ষক-শিক্ষিকা-ছাত্রছাত্রী এমনকি সাইনবোর্ডও নেই। মাউশির পাশাপাশি এ বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনও (দুদক) অনুসন্ধান করছে। এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ আলোকিত বাংলাদেশকে বলেন, শিক্ষা অধিদফতরকে দুর্নীতিমুক্ত করতে প্রয়োজনী সব রকম উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এমপিওভুক্তিতে জালিয়াতির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। এ বিষয়ে দুদকের তদন্তে অধিকতর স্বচ্ছতার স্বার্থে সার্বিক সহযোগিতা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর অবৈধভাবে যেসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক এমপিওভুক্তি করা হয়েছে তার মধ্যে ২৮৭টি ভুয়া বলে চিহ্নিত হয়েছে। বিভাগীয় তদন্তে মাউশি কর্মকর্তাদের ব্যাপক অনিময় ও জালিয়াতি ধরা পড়েছে।   এ অবস্থায় পৃথকভাবে অভিযোগ পেয়ে অনুসন্ধানে নেমেছে দুদক। অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে চিহ্নিত ২৮৭ শিক্ষক এমপিওভুক্তির বিষয়ে বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদন এবং এমপিওভুক্তির নথিপত্র চেয়ে মাউশির মহাপরিচালককে ২২ আগস্ট চিঠি দেন দুদকের সহকারী পরিচালক (অনুসন্ধান ও তদন্ত-১) আবদুছ ছাত্তার সরকার। চিঠিতে তিনি নথিপত্র সরবরাহের জন্য ২৯ আগস্ট সময় বেঁধে দেন। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে নথি সরবরাহ করা হয়নি। দুদক দ্বিতীয় দফা তাগিদ দিলে মাউশির মহাপরিচালক প্রফেসর ফাহিমা খাতুন ৫ সেপ্টেম্বর নথিপত্র দুদকে হস্তান্তর করেন। নথি পেয়ে দুদক কর্মকর্তারা জিজ্ঞাসাবাদের জন্য মাউশির সংশ্লিষ্ট ১৮ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে তলব করেন। তারা হলেন উপপরিচালক ড. সাধন সরকার, সহকারী পরিচালক আবদুল কুদ্দুস চৌধুরী, উচ্চমান সহকারী মোঃ নাসির উদ্দিন, আমির হোসেন, অফিস সহকারী মোঃ মিজানুর রহমান, মোঃ শাহেদ আজগর, মোস্তফা মাহমুদ, কাজী কামরুজ্জামান, আবদুল মোন্নাফ আকন্দ, বেলাল হোসেন, অডিট শাখার অফিস সহকারী মোঃ নুরে আলম, মোঃ বশির হাওলাদার, হিসাব শাখার মতিউর রহমান, ষাঁট মুদ্রাক্ষরিক আসমা পারভিন, ইএমআইএস সেলের সিনিয়র ডাটাএন্ট্রি অপারেটর মোঃ মোখলেচুর রহমান, মোঃ জিয়াউর রহমান, রোমানা রহমান ও নজিবুদদৌলা। এর মধ্যে ১০ জনকে গত সপ্তাহে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। বাকিদের চলতি সপ্তাহে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে বলে দুদক সূত্র জানিয়েছে।

বিভাগীয় তদন্ত : এমপিওভুক্তির দুর্নীতি বিষয়ে বিভাগীয় তদন্ত করছেন মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতরের পরিচালক (মনিটরিং অ্যান্ড ইভালুয়েশন) প্রফেসর দিদারুল আলম এবং বেসরকারি কলেজ শাখার উপপরিচালক মোঃ মেজবাহ উদ্দিন। তারা এরই মধ্যে আংশিক প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন। তদন্ত প্রতিবেদনে ১৬টি ভুয়া এমপিও শনাক্ত করা হয়েছে ও এতে ৪ জন শাখা সহকারীর তত্ত্বাবধানে কয়েকজন কর্মকর্তাকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। অভিযুক্তরা হলেন মাউশির ডিলিং অ্যাসিসটেন্ট আলমগীর হোসেন মোল্লা, মাসুদ রানা, নাসিরউদ্দিন এবং মোঃ হান্নান। তবে, তদন্ত প্রতিবেদনে মূল হোতাদের কাউকে অভিযুক্ত করা হয়নি। এ বিষয়ে দুদকের কর্মকর্তারা জানান, বিভাগীয় তদন্তে কাউকে বাঁচানোর চেষ্টা করা হলেও দুদকের অনুসন্ধানে ছাড় পাবে না। এমনকি বিভাগীয় তদন্তের দায়িত্বে যারা আছেন তাদেরও অনিয়ম অনুসন্ধান করবে দুদক।

যে সব বিষয়ে অভিযোগ : বিভাগীয় প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভুয়া এমপিওর বেশিরভাগ কাগজপত্র জেলা শিক্ষা অফিস কর্তৃক প্রস্তাবিত নয়। জেলা শিক্ষা অফিস কর্তৃক প্রস্তাবিত এমপিওভুক্তদের মধ্যে অনেকের শিক্ষক প্রাপ্যতা নেই। প্রাপ্যতা থাকলেও মহিলা কোটা পূরণ হয়নি। বেশিরভাগ ভুয়া এমপিও সহকারী গ্রন্থাগারিককে সহকারী শিক্ষক হিসেবে দেখানো হয়েছে। এসব এমপিওর জন্য ৫০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকা পর্যন্তÍ ঘুষ নেয়া হয়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা শিক্ষকের অস্তিত্ব নেই এমন প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি ব্যবহার করেও জালিয়াতির মাধ্যমে এমপিওভুক্তি দেখানো হয়েছে। এছাড়া, ২৭১ জন শিক্ষকের এমপিও সরাসরি ইএমআইএস সেল থেকে পাঠানো হয়েছে। ওই সিটগুলোতে কিছু স্বাক্ষর জাল রয়েছে। শাখা সহকারীদের স্বাক্ষর জাল। সংশ্লিষ্ট সহকারী পরিচালক (এডি) এমপিওপ্রতি ৫ হাজার এবং উপপরিচালক (ডিডি) ১০ হাজার টাকা ঘুষ নিয়ে নথিপত্র ছাড়াই তথ্য ফরমে (শিটে) স্বাক্ষর করে এমপিওভুক্তির জন্য সেলে পাঠিয়েছেন। এ ঘটনায় সেলের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী জড়িত। এসব জেনেই এমপিও করেছেন সংশ্লিষ্টরা। অবশিষ্ট এমপিও যাচাইয়ের জন্য শাখা সহকারীদের কাছে খসড়া কপি সরবরাহ করা হয়নি। অভিযোগে আরও বলা হয়, অভিযুক্তদের ফরম যাচাইয়ের জন্য সময় ছিল দু’ঘণ্টা। ইএমআইএস সেলের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে ওই ২৭১ জন শিক্ষকের এমপিওভুক্তির ঘটনায় উল্লিখিত ৮ জন অফিস সহকারী জড়িত। প্রশাসনের পক্ষে এমপিওর তালিকা সেলে পাঠানো এবং বিল তৈরির কাজ করেন হিসাব শাখার কর্মকর্তা মোঃ মতিউর রহমান। জালিয়াত চক্রের সঙ্গে মতিউর রহমানের সম্পৃক্ততা রয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

এমপিওভুক্তির নিয়ম : বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ সম্পন্ন হওয়ার পর জেলা শিক্ষা অফিস প্রয়োজনীয় কাগজপত্র মাউশিতে পাঠাবেন। তা গৃহীত হলে সংশ্লিষ্ট ডিলিং ওই কাগজপত্র নথিতে এমপিওভুক্তির প্রস্তাব দেন। ওই নথি সহকারী পরিচালক, উপপরিচালক এবং পরিচালক কর্তৃক অনুমোদিত হলে একটি শিট তৈরি করে ইএমআইএস সেলে পাঠানো হয়। এতে ডিলিং, এডি এবং ডিডির স্বাক্ষর থাকে। ইএমআইএস সেল তা এন্ট্রি করে খসড়া কপি যাচাইয়ের জন্য মাউশির ডিলিংদের কাছে প্রেরণ করে। যাচাই করে সেলে প্রেরণ করা হলে সেল সংশোধন করে চূড়ান্ত প্রিন্ট দিয়ে শাখায় পাঠায়। তারপর কর্মকর্তাদের স্বাক্ষরযুক্ত সিল দিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকে পাঠানোর পর মাউশির ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়। ফলে এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িতরা দায় এড়াতে পারেন না। কিন্তু, ভুয়া এমপিওভুক্তির ক্ষেত্রে পরস্পর যোগসাজশে মিলেমিশে অপকর্মগুলো করে থাকেন এবং সে অনুযায়ী নেপথ্যের কাজগুলো আড়াল করে এমপিওভুক্তির তালিকা ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়।

একই ঘটনা বিএনপি-জামায়াত জোট আমলেও : ওয়ান-ইলেভেন পরবর্তী তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে ভুয়া এমপিওভুক্তির বিষয়েও অনুসন্ধান চালায় দুদক। সেসময় দুদকের কর্মকর্তারা বিগত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার আমলের পাঁচ বছরের (২০০১ থেকে ২০০৫ সাল) ভুয়া এমপিওভুক্তির তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেন। অনুসন্ধানে ওই পাঁচ বছরে ভুয়া এমপিওভুক্তির মাধ্যমে রাষ্ট্রের ১২১ কোটি টাকা আত্মসাতের তথ্য পাওয়া যায়। প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি অনুসন্ধানের আওতায় ২০০৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে দুদকের উপপরিচালক সৈয়দ ইকবাল হোসেনকে প্রধান করে ৪ সদস্য বিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটি শিক্ষা সম্পর্কিত অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি ব্যানবেইজের দুর্নীতিও অনুসন্ধান করে। অনুসন্ধান শেষে ওই বছরের আগস্টে ব্যানবেইজের দুর্নীতি বিষয়ক একটি প্রতিবেদন দুদকের শাখায় দাখিল করা হয়। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ব্যানবেইজ, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও শিক্ষা অধিদফতরের অসাধু কর্মকর্তারা পরস্পর যোগসাজশে ২০০১ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে দেশের অসংখ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষকের নামে এমপিওভুক্তি দেখিয়েছেন। এক্ষেত্রে আবেদন না করেই সরাসরি এমপিও তালিকাভুক্ত হয়ে বিপুল সংখ্যক প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট শিক্ষকরা বেতনের সরকারি অংশ ও সুবিধাদি পেয়ে আসছেন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষকের কোনো অস্তিত্ব নেই এমন অনেক প্রতিষ্ঠানের নামেও এমপিওভুক্তি দেখিয়ে প্রতি বছর কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হচ্ছে। এভাবে ওই পাঁচ বছরে রাষ্ট্রের অন্তত ১২১ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ১৯৯৭ সালে প্রণীত এমপিওভুক্তি নীতিমালা অনুযায়ী কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষক এমপিওভুক্তির আবেদন করলে তা শিক্ষা অধিদফতরের নির্ধারিত বাছাই কমিটি সরেজমিন তদন্ত সাপেক্ষে সুপারিশসহ এমপিওভুক্তির অনুমোদনের জন্য ব্যানবেইজে পাঠায়। ব্যানবেইজের নির্ধারিত যাচাই কমিটি ওই সুপারিশের ভিত্তিতে পর্যালোচনা শেষে অনুমোদন দিয়ে থাকে। অনুমোদন অনুযায়ী এমপিওভুক্তির তালিকা ব্যানবেইজ থেকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয় এবং সে অনুযায়ী সরকার অর্থ বরাদ্দ দেয়। কিন্তু, এসব নিয়মের তোয়াক্কা না করে ওই ৫ বছরে ব্যানবেইজের অসাধু কর্মকর্তারা মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে কোনো আবেদন ও শিক্ষা অধিদফতরের সুপারিশ ছাড়াই সরাসরি নামে-বেনামে এমপিওভুক্তির তালিকা তৈরি করে মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে। সরকারও এ তালিকা অনুযায়ী অর্থ বরাদ্দ দিয়েছে। এ বিষয়ে দুদক কর্মকর্তারা আলোকিত বাংলাদেশকে বলেন, লে. জেনারেল (অব) হাসান মশহুদ চৌধুরী দুদকের চেয়ারম্যান থাকাকালে খোদ শিক্ষা মন্ত্রণালয় এমপিওভুক্তির দুর্নীতি প্রতিরোধে ব্যবস্থা নেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। সেই থেকে দুদক এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। তবে, মন্ত্রণালয় ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হলে দুদক পদক্ষেপ নেবে বলে জানানো হয়েছিল। অপরদিকে শিক্ষা ক্ষেত্রে দুর্নীতি বন্ধের পদক্ষেপ হিসেবে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ২০০৫ সালে এমপিওভুক্তির কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করে। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসেও প্রায় দেড় বছর এ কার্যক্রম বন্ধ ছিল। এমপিওভুক্তি চালু করার পর আবার একই কায়দায় দুর্নীতিও চালু হয়ে গেছে।