এর সঙ্গে চুলের সম্পর্ক কী?..আনিসুল হক

আমার মনে হয়, আমি যথেষ্ট দেরি করে ফেলেছি। এ নিয়ে কথা ও কার্টুন যা হওয়ার হয়ে গেছে। তবু, নিতান্ত বিবেকের দংশনে মুখ খুলতে বাধ্য হলাম। কেননা বাংলা বাগধারা বিষয়ে একটা ভুল ব্যাখ্যা সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাচ্ছে, তা দেখা ও শোনার পরে চুপ করে থাকাটা অন্যায়। একচুল নড়া হবে না, এই কথাটার সঙ্গে চুলের আসলে কোনো সম্পর্ক নেই। এখানে সম্পর্কটা নড়ার, না-নড়ার। একচুল একটা পরিমাপের একক মাত্র। এখানে একচুল দৈর্ঘ্যের একটা ইউনিট। একচুল নড়া হবে না, এর মানে কারও চুল কিংবা পরচুলা নড়বে না, তা নয়; এটার মানে হলো, কেউ একজন তাঁর কোনো একটা অবস্থান থেকে সামান্য পরিমাণও নড়বেন না।বাগধারাকে শাব্দিক অর্থে নেওয়ার কিছু নেই। চাঁদের মতো মুখ মানে সত্যিকারের চাঁদের মতো মুখ নয়। চাঁদে কলঙ্ক আছে, দুরবিন দিয়ে দেখলে অনেক খানাখন্দও দেখা যাবে, কিন্তু চাঁদের মতো মুখ মানে সুন্দর মুখ। তেমনি আঙুল ফুলে কলাগাছ হওয়ার সঙ্গে কলাগাছের কোনো সম্পর্ক নেই, এমনকি আঙুলেরও নেই। নইলে আঙুলের পক্ষে ফুলে কলাগাছ তো কলাগাছ, কলার সমান হওয়াও সম্ভব না।আমাদের এক নেত্রী মধুরভাষিণী। তিনি যখন কথা বলেন, মনে হয়, জ্যোৎস্না ঝরছে; মনে হয়, কানে মধু লাগছে; মনে হয়, বসন্তের মধুর বাতাস বয়ে গেল অস্তিত্বের ওপর দিয়ে। তিনি খুব ভালোবাসেন সংবিধান। তাই তিনি দৃঢ়প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন, সংবিধান থেকে তিনি একচুলও নড়বেন না। তাঁর কথা আমাদের সংবিধানপ্রেমিক দেশবাসীকে যারপরনাই:আশ্বস্ত করেছে। আমাদের আরেক নেত্রীও সংবিধানপ্রেমিক। তবে আমাদের দেশে সংবিধানপ্রীতির একটা বাস্তব শর্ত আছে। ক্ষমতায় থাকলেই কেবল আমরা সংবিধানকে ভালোবাসি। যেমন ক্ষমতায় থাকাকালেই কেবল মনে হয়, হরতাল উন্নয়নের শত্রু, দেশের অগ্রগতির জন্য বাধা। ক্ষমতার বাইরে থাকলে হরতাল হলো গণতান্ত্রিক অধিকার। আমাদের যে নেত্রী এখন বলছেন, সংবিধান থেকে তিনি একচুল নড়বেন না, আল্লাহ না করুন, তিনি যদি ক্ষমতার বাইরে থাকেন, তাঁকেই আমরা দেখব, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের জন্য আন্দোলন করছেন।

যা হোক, কথা হচ্ছিল একচুল নড়া না-নড়া নিয়ে। এটার সঙ্গে চুলের কোনো সম্পর্ক নেই, পরচুলার তো সম্পর্ক নেই-ই।

তবে কে নড়বে, কে নড়বে না, নড়লে চুল পরিমাণ নড়বে, নাকি বিঘত পরিমাণ—এই বিষয়টা আসলে নির্ভর করছে জনগণের চাওয়ার ওপরে। জনগণের চাওয়াই হলো সংবিধান। জনগণের চাওয়া যদি আসে সুনামির মতো, তখন কত কিছুই নড়েচড়ে, ভেসে যায়। আর জনগণ যদি না চায়, যদি জোয়ার না আসে, তাহলে নড়াচড়ার দরকার পড়ে না।

তার পরেও কথা আছে। মানুষ ভাবে এক, আর হয় আরেক। সেই ১৯৯৬ সালে ডা. বি. চৌধুরী টেলিভিশনের ‘সবিনয়ে জানতে চাই’ অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, বিএনপি আগামী ৫০ বছরেও বিরোধী দলে যাবে না, কথাটা ফলেনি। এমনি কতজনের কত স্বপ্ন-সাধ উড়ে গেল ঝোড়ো হাওয়ায়।

রবীন্দ্রনাথের গানটির মতো:

ঝড়ে যায় উড়ে যায় গো আমার মুখের আঁচলখানি।

ঢাকা থাকে না হায় গো, তারে রাখতে নারি টানি।।

আমার রইল না লাজলজ্জা, আমার ঘুচল গো সাজসজ্জা—

তুমি দেখলে আমারে এমন প্রলয়-মাঝে আনি

আমায় এমন মরণ হানি।।

বাগধারা ও প্রবাদগুলোয় মানুষের বহু বছরের জ্ঞান সঞ্চিত থাকে। আমরা কতগুলো বাগধারা কিংবা প্রলাপ এখন স্মরণ করতে পারি।

১. সুসময়ে অনেকে বন্ধু বটে হয়, অসময়ে হায় হায় কেউ কারও নয়।

২. মানুষ ভাবে এক, আর হয় আরেক।

৩. ইতিহাসের শিক্ষা হলো, ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা নেয় না।

৪. জিয়নকালে মরণ নাই, মরণকালে ওষুধ নাই।

৫. যে যায় লঙ্কায় সেই হয় রাবণ।

৬. ফুটন্ত কড়াই থেকে জ্বলন্ত উনুনে।

 

তবে ইদানীং জ্ঞানীগুণী ব্যক্তিরা নিজেরাই প্রবচন রচনা করেন।

যেমন হুমায়ুন আজাদ রচনা করেছিলেন প্রবচনগুচ্ছ। তাঁর দুটো প্রবচন:

১. আমরা প্রশংসা করি সিংহের, কিন্তু পছন্দ করি গর্দভকে।

২. আওয়ামী লীগ যার প্রতিদ্বন্দ্বী, জয়ের জন্য তাকে কিছুই করতে হয় না।

 

আর আহমদ ছফার একটা প্রবচন বহু উদ্ধৃত:

আওয়ামী লীগ যখন জেতে একা জেতে, আর যখন হারে তখন পরাজিত হয় সমস্ত বাংলাদেশ।

আওয়ামী লীগের ১৯৯১ সালের নির্বাচনের পরে এক বালক বলেছিল, সব কারকে সপ্তমী বিভক্তির উদাহরণটা আওয়ামী লীগের মনে রাখা উচিত।

পাগুটাদীপতি:

পাগলে কিনা বলে

গুরুজনে করো নতি

টাকায় কী না হয়

দীনে দয়া করো

পরাজয়ে ডরে না বীর

তিলে তৈল থাকে।

 

আমি এগুলোর ব্যাখ্যা করার সাহস রাখি না। এক নম্বরটাই তো আমি পার হতে পারব না।

 

আনিসুল হক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।