এ মাসেই সর্বদলীয় সরকার!

চলতি মাসের দ্বিতীয়ার্ধে অর্থাৎ তৃতীয় বা শেষ সপ্তাহে মন্ত্রিসভা ভেঙে দিয়ে নির্বাচনকালীন সর্বদলীয় সরকার গঠন করা হবে। এ সরকারই আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পন্ন করবে। সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী ব্যক্তিরাই এ সরকারের অংশ হবেন। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণামাত্রই সর্বদলীয় সরকার গঠন করা হবে। সরকারের প্রভাবশালী এক মন্ত্রীসহ একাধিক সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই মন্ত্রী কালের কণ্ঠকে বলেন, আগামী ২০ নভেম্বরের পর নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা করা হবে। এর পরই হবে সর্বদলীয় সরকার। তবে নির্বাচন কমিশন সূত্র জানায়, চলতি মাসের শেষ সপ্তাহে নির্বাচন কমিশন সচিবালয় দশম সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করবে।

এসব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে দশম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের পর জানুয়ারিতেই নতুন সরকার গঠিত হবে বলে ক্ষমতাসীন দলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে।

এদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেওয়া নির্বাচনকালীন সর্বদলীয় সরকারের প্রস্তাব সংসদে অনুমোদনের জন্য আগামীকাল সোমবার শুরু হওয়া মুলতবি অধিবেশনেই আলোচনার জন্য উত্থাপন করা হবে। বিরোধী দল সর্বদলীয় সরকারে যুক্ত না হলে সংসদের অনুমোদন নিয়ে তাদের বাদ দিয়েই নির্বাচনকালীন এ সরকার গঠন করবে সরকার।

সরকারের সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, ১৮ দলীয় জোট আলোচনায় আসবে না- এটা আওয়ামী লীগ ধরেই নিয়েছে। তাই তাদের বাদ দিয়েই সর্বদলীয় সরকার গঠনের কাজ চলছে। এ ছাড়া সর্বদলীয় সরকার নিয়ে অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা, পরামর্শ গ্রহণও অব্যাহত রেখেছেন শেখ হাসিনা।

সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সর্বদলীয় এ সরকারে আরো যাঁরা শরিক হচ্ছেন তাঁদের মধ্যে রয়েছেন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ, ড. আবুল মাল আবদুল মুহিত, বেগম মতিয়া চৌধুরী, ওবায়দুল কাদের, সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন, জাসদের সাধারণ সম্পাদক হাসানুল হক ইনু, জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, জি এম কাদের, আওয়ামী লীগের অন্য নেতা ড. আব্দুর রাজ্জাক, ডা. দীপু মনি প্রমুখ। টেকনোক্র্যাট কোটায় ১০ জনের একজন হিসেবে থাকতে পারেন ব্যারিস্টার শফিক আহমেদও। জানা গেছে, এ সরকারের কাঠামোয় ১৫ থেকে ২০ জন পর্যন্ত সদস্য থাকতে পারেন। সর্বশেষ আলাপ-আলোচনা বা সমঝোতার মাধ্যমে যদি রাজনৈতিক সমাধান হয়, তবে বিএনপির কমপক্ষে পাঁচজন নির্বাচিত সংসদ সদস্যকে সর্বদলীয় সরকারের অংশ করতে পারেন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। এ ছাড়া সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী দল লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টিকে (এলডিপি) এ সরকারে আমন্ত্রণ জানানো হবে বলে নিশ্চিত করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একটি সূত্র।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী জাফর উল্যাহ কালের কণ্ঠকে বলেন, তফসিল ঘোষণামাত্রই সর্বদলীয় সরকার গঠন করা হবে এবং সেই সরকার নির্বাচন সম্পন্ন হওয়া পর্যন্ত দেশ পরিচালনা করবে। তখন ছোট পরিসরে মন্ত্রিসভা থাকবে। তারা রুটিন কাজ করবে।

কখন এ সর্বদলীয় সরকার গঠন করা হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তফসিল ঘোষণামাত্রই বর্তমান মন্ত্রিসভা ভেঙে দেওয়া হবে এবং সর্বদলীয় সরকারের ছোট একটি মন্ত্রিসভা করা হবে।

আওয়ামী লীগের সম্পাদকমণ্ডলীর এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তফসিল ঘোষণার পরপরই ছোট মন্ত্রিসভা গঠন করা হবে। সেখানে সব দলের অংশগ্রহণ থাকবে। ওপরে উল্লিখিত সর্বদলীয় সরকারের ‘শর্ট লিস্ট’ সম্পর্কেও অবহিত করেন তিনি।

মহাজোটের নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও দপ্তরবিহীন মন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত সরকারের এই উদ্যোগ শুরুর বিষয়টি জনসমক্ষে নিয়ে আসেন। গতকাল শনিবার রাজধানীতে বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোটের এক আলোচনা সভায় তিনি বলেন, নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের প্রক্রিয়া শুরুর অংশ হিসেবে অচিরেই বর্তমান সরকারের মন্ত্রীরা পদত্যাগ করবেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে তাঁরা পদত্যাগপত্র জমা দেওয়ার পরপরই সর্বদলীয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মন্ত্রিসভা গঠনের কাজ শুরু হবে।

আওয়ামী লীগের আরেক প্রভাবশালী নেতা তোফায়েল আহমেদও সর্বদলীয় সরকার গঠনের প্রক্রিয়া শুরুর বিষয়টি জানিয়ে বিরোধী দলকে এ মন্ত্রিসভায় তাদের সদস্যদের নাম অন্তর্ভুক্ত করতে তালিকা দেওয়ার আহ্বান জানান। সংসদ ও সংসদের বাইরে বিভিন্ন অনুষ্ঠানেও তিনি বিরোধী দলকে সংবিধানের পথে চলতে অনুরোধ করেন। তোফায়েল আহমেদ বলেন, নির্বাচন কারো জন্য থেমে থাকবে না। সর্বদলীয় মন্ত্রিসভায় বিরোধী দল না এলে তাদের বাদ দিয়েই এই মন্ত্রিপরিষদ গঠন করা হবে এবং সংবিধানের আলোকে যথাসময়ে নির্বাচন হবে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ১৮ অক্টোবর সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রথম নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে সৃষ্ট জটিলতা নিরসনে এই সর্বদলীয় সরকারের প্রস্তাব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘আমরা সব দলকে সঙ্গে নিয়েই জাতীয় সংসদ নির্বাচন করতে চাই। বিরোধী দলের কাছে আমার প্রস্তাব, নির্বাচনকালীন আমরা সব দলের সমন্বয়ে সরকার গঠন করতে পারি। আমাদের লক্ষ্য অবাধ, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠান। বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের মধ্য থেকেও আপনারা নাম দিতে পারেন, যাঁদের অন্তর্বর্র্তীকালীন মন্ত্রিসভায় সদস্য করে সর্বদলীয় সরকার গঠন করতে পারি। নির্বাচনে যাতে কারো কোনো সন্দেহ না থাকে, সব সন্দেহ দূর করে আমরা যাতে সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে পারি, যে নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ ভোট দিয়ে তাদের মনমতো সরকার গঠন করতে পারবে। আমি বিরোধী দলের নেতাকে অনুরোধ করছি, তিনি এই ডাকে সাড়া দেবেন। আমার এ অনুরোধ তিনি রক্ষা করবেন এবং আমাদের যে সদিচ্ছা, সেই সদিচ্ছার মূল্য তিনি দেবেন।’

জানুয়ারির মধ্যে নতুন সরকার : আশরাফ

এদিকে গতকাল জাতীয় সমবায় পুরস্কার-২০১১ উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বলেছেন, জানুয়ারির মধ্যেই নতুন সরকার গঠন করা হবে। রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তিনি আরো বলেন, ‘আগামী জানুয়ারিতে নতুন সরকার আসবে। আর বিরোধী দল কোনো ইম্পসিবল (অসম্ভব) অবস্থা সৃষ্টি করলে, সেটা কিভাবে পসিবল (সম্ভব) করতে হয়, সেটা আমাদের জানা আছে। হরতাল অবরোধ মোকাবিলা আমাদের কাছে মূল ইস্যু নয়। আমাদের মূল ইস্যু হলো আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন কিভাবে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করা যায়।’

বিরোধী দলের ৬০ ঘণ্টার টানা হরতালের বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘সংলাপে আমাদের আমন্ত্রণ এখনো অব্যাহত আছে। আমরা তাঁর (খালেদা জিয়া) জন্য অপেক্ষায় আছি, তিনি কবে আসবেন। আশা করি, যে দিন তিনি সুবিধা পাবেন, সেদিনই আসবেন। সংলাপের রাস্তা সব সময় খোলা। হরতাল ও অবরোধ আলোচনার ক্ষেত্রে কোনো বাধা নয়।’

সৈয়দ আশরাফ বলেন, সংঘাত-অরাজকতা কখনো সমাধান আনে না। অতীতেও সংলাপের মাধ্যমে সংকটের নিরসন হয়েছে। বর্তমানেও আলোচনার মাধ্যমে সংকটের নিরসন হবে, আশা করি। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সব দল অংশগ্রহণ করবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।