ঐশীর প্রশ্নবিদ্ধ রিমান্ড…শেখ হাফিজুর রহমান

গত ১৫ আগস্ট রাতে চামেলীবাগে তাঁদের ফ্ল্যাটে নৃশংসভাবে খুন হন পুলিশের পরিদর্শক মাহফুজুর রহমান ও তাঁর স্ত্রী স্বপ্না রহমান। সংবাদে যখন বলা হয়, পুলিশ দম্পতির ১৭ বছরের মেয়ে ঐশী রহমান এবং তার বন্ধুবান্ধব হচ্ছে সন্দেহভাজন হন্তারক, তখন আমরা আঁতকে উঠি। শহুরে বাবা-মা ও সন্তানের পারস্পরিক বোঝাপড়া নিয়ে নানা রকম কথা হতে থাকে। শিশু-কিশোরদের নিঃসঙ্গতা, তাদের ওপর প্রযুক্তির নেতিবাচক প্রভাব, মূল্যবোধের অবক্ষয়ের কারণে তাদের বিচ্যুতি ও অপরাধে জড়িয়ে যাওয়ার বিষয়গুলো উঠে আসে আলোচনার শীর্ষে। এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যে বা যারা জড়িত থাকুক, তাদের অবশ্যই দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত। তবে এই হত্যাকাণ্ডের তদন্ত ও প্রাক্-বিচারিক কর্মকাণ্ডে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এ ছাড়া ঐশী রহমানের মানসিক অবস্থাও বিবেচনায় নেওয়া হয়নি।
২৫ আগস্টের খবর হচ্ছে, ঐশী স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে তার বাবা-মাকে খুন করার কথা স্বীকার করেছে। এর আগে তাকে পুলিশি রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়ার পর ঐশী ও গৃহকর্মী সুমিকে কিশোরী উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল (পরে ঐশীকে কাশিমপুর কারাগারে পাঠানো হয়)। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কিশোরী বিবেচনায় ঐশী ও সুমিকে যদি কিশোরী উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠিয়ে দেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে তাদের পুলিশি রিমান্ডে নেওয়া ও স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি আদায় করার পুরো প্রক্রিয়াটি আইনগতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। শিশু আইন অনুযায়ী দুজন কিশোরীকে এভাবে পুলিশি রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা যায় না। এ ক্ষেত্রে প্রবেশন কর্মকর্তার উপস্থিতি ও সংশ্লিষ্টতার আইনগত বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
১৭ বছরের ঐশীকে কেন পুলিশি রিমান্ডে নেওয়া হলো? পুলিশি রিমান্ড ও পুলিশি নির্যাতন এখন সমার্থক হয়ে গেছে। সংবিধানে আছে, পুলিশ কাউকে গ্রেপ্তার করলে গ্রেপ্তারের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিকে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করতে হবে। অথচ ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করার আগেই গ্রেপ্তারকৃত পুরুষ নির্যাতিত হতে পারেন, আর নারী শিকার হতে পারেন ধর্ষণের। গ্রেপ্তার করার পর কিন্তু ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে উপস্থিত করার আগেই পুলিশি নির্যাতনে জামাল নামের এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়। (তথ্যসূত্র: দ্য ডেইলি স্টার, ৩০ এপ্রিল ২০০২)। একইভাবে গ্রেপ্তারের পর ধর্ষণ করা হয় নিপু রানীকে। ফলে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করার আগেই তাঁকে চিকিৎসকের কাছে নিতে হয়। (তথ্যসূত্র: দৈনিক জনকণ্ঠ, ১২ জুন ২০০২)।
ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমোদন নিয়েও যখন কোনো অভিযুক্ত ব্যক্তিকে পুলিশি রিমান্ডে নেওয়া হয়, তখনো তাঁর ওপর চালানো হয় অমানুষিক নির্যাতন। এটা এখন নৈমিত্তিক ঘটনা। পুলিশি হেফাজতে পুলিশি নির্যাতন ও অসংখ্য মৃত্যু এবং পুলিশি রিমান্ডে কোনো অভিযুক্তকে ন্যস্ত করার ক্ষেত্রে ম্যাজিস্ট্রেটদের অপর্যাপ্ত মনোযোগের ব্যাপারে হাইকোর্টের বিচারকেরা তাঁদের চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। ব্লাস্ট বনাম বাংলাদেশ ও অন্যান্য (55 DLR (HCD) (2003) (363) ও সাইফুজ্জামান বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য (56 DLR (HCD) (2004) (324) মামলায় হাইকোর্টের বিচারকেরা পুলিশ ও ম্যাজিস্ট্রেটদের প্রতি অনেকগুলো নির্দেশনা দিয়েছেন। ব্লাস্ট বনাম বাংলাদেশ ও অন্যান্য মামলার ১১ নম্বর নির্দেশনায় বিচারপতি মোহাম্মদ হামিদুল হক ও বিচারপতি সালমা মাসুদ চৌধুরী বলেন, যদি তদন্তকারী কর্মকর্তা কোনো অভিযুক্তকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে চান, তাহলে তিনি জেলের মধ্যে ওই ব্যক্তিকে (কিশোর বা কিশোরীর ক্ষেত্রে ‘নিরাপদ স্থানে’) জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারবেন।
গ্রেপ্তারকৃত ঐশী ও সুমিকে আদালতে হাজির করে পুলিশ যে রিমান্ডের আবেদন জানাল এবং ম্যাজিস্ট্রেট পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করলেন, পুরো বিষয়টি তাহলে হাইকোর্টের নির্দেশনার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। অথচ পুলিশ ও ম্যাজিস্ট্রেটদের হাইকোর্টের নির্দেশনা মেনে চলার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। উল্লেখ্য, ৫ সেপ্টেম্বর ঐশী আইনজীবীর মাধ্যমে তার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রত্যাহারের আবেদন করেছে। সে জানিয়েছে, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করে পুলিশ তাকে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে বাধ্য করেছে। এদিকে এক রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ১১ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট ডিভিশন ঐশী রহমানের মানসিক অবস্থা ও মাদক গ্রহণের ইতিহাস নিরূপণের নির্দেশ দিয়েছেন।
বয়স ও মানসিক অবস্থা বিবেচনায় ঐশী ও সুমিকে তাদের আইনজীবীর সামনে জিজ্ঞাসাবাদ করা উচিত ছিল এবং জিজ্ঞাসাবাদের সময় একজন মনোবিজ্ঞানী, একজন অপরাধবিজ্ঞানী, একজন সমাজবিজ্ঞানী ও একজন প্রবেশন কর্মকর্তারও উপস্থিত থাকা উচিত ছিল। কেউ প্রশ্ন করতে পারেন, বর্তমান আইনে তো আইনজীবী ছাড়া আর কারও উপস্থিত থাকার বিধান নেই। সে ক্ষেত্রে আইন সংশোধন করে নতুন বিধান সংযুক্ত করা প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।
নগরায়ণের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের জীবনযাপনের ধরন বদলে যাচ্ছে, ব্যস্ততা বাড়ছে, জটিলতা বাড়ছে। কিশোর-কিশোরীরা প্রতিনিয়ত সুস্থ-স্বাভাবিক জীবন থেকে বিচ্যুত হচ্ছে। অনেকে হয়ে উঠেছে অপরাধপ্রবণ। এ ধরনের পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য প্রায় অকার্যকর সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর করার পাশাপাশি পুলিশ এবং ফৌজদারি ব্যবস্থাকেও ঢেলে সাজাতে হবে।
শেখ হাফিজুর রহমান: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষক ও অপরাধবিজ্ঞান গবেষক।
hrkarzon@yahoo.com