দি না জ পু র মে ডি কে ল ক লে জ

ওঁরা দিনাজপুরে থাকেন না

দিনাজপুর মেডিকেল কলেজে শিক্ষকদের ৩৫ শতাংশ পদ শূন্য। বাকি পদে যাঁরা আছেন, তাঁদের একটি অংশ নিয়মিত বেতন-ভাতা তুললেও ক্লাস ঠিকমতো নেন না। অধ্যক্ষ নিজেও মাসে সাত দিনের বেশি কলেজে আসেন না।

সরকারি এই মেডিকেল কলেজটির শিক্ষকদের অনেকেই নিজেদের ইচ্ছামতো আসা-যাওয়া করেন। তাঁরা ঢাকা, ময়মনসিংহ ও রাজশাহীতে থাকেন। ছুটি না নিয়েই অনুপস্থিত থাকেন দিনের পর দিন। অনেকে মাসে এক দিন আসেন। অভিযোগ আছে, অধ্যক্ষ নিজেই নিয়মিত উপস্থিত থাকেন না। ফলে অন্যদের ওপর তাঁর নিয়ন্ত্রণ নেই। নিয়মিত ক্লাস না হওয়ার অভিযোগ করেছেন বিভিন্ন শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীরা।

কলেজ সূত্রে জানা গেছে, ১৯৯২-৯৩ শিক্ষাবর্ষে প্রথম ব্যাচে ৫০ জন শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়। সেই অনুযায়ী জনবলকাঠামো তৈরি করা হয়। কিন্তু ২০১২-১৩ শিক্ষাবর্ষ থেকে ১৪৬ জন শিক্ষার্থী ভর্তি হচ্ছেন। বর্তমানে বিভিন্ন বর্ষে মোট শিক্ষার্থী ৯১৭ জন।

শূন্য পদ: সরকারি এই মেডিকেল কলেজটিতে শিক্ষকদের অনুমোদিত পদ ১৫১টি। এর মধ্যে ৫৩টি শূন্য। ৩৩টি বিভাগে অধ্যাপকের পদ ২২টি, কর্মরত আছেন ১২ জন। সহযোগী অধ্যাপকের পদ ৩৪টি, আছেন ১৬ জন। ৪৪ জন সহকারী অধ্যাপকের মধ্যে ১৬টি পদ শূন্য। প্রভাষকের অনুমোদিত পদ ৩৩টি, আছেন ১৯ জন।

অধ্যক্ষের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, কলেজ প্রতিষ্ঠার পর থেকে এনাটমি, ফিজিওলজি, বায়োকেমিস্ট্রি, প্যাথলজি, মাইক্রোবায়োলজি, ফরেনসিক মেডিসিন, কমিউনিটি মেডিসিন, গাইনি, শিশু, সাইকিয়াট্রি, অ্যানেসথেসিওলজি, চর্ম ও যৌন, চক্ষু ও রক্ত পরিসঞ্চালন বিভাগের অধ্যাপক পদ শূন্য। এনাটমি বিভাগে মোট ১১টি পদের মধ্যে একজন করে সহযোগী ও সহকারী অধ্যাপক এবং চারজন প্রভাষকের পদ শূন্য আছে। দুজন সহযোগী, একজন সহকারী, দুজন প্রভাষকসহ ফিজিওলজি বিভাগে পাঁচজন শিক্ষক নেই। প্যাথলজি বিভাগে অধ্যাপক এবং সহযোগী অধ্যাপক পদ দুটিই শূন্য পড়ে আছে।

অধ্যক্ষ হামিদুল হক খন্দকার বলেছেন, শিক্ষকসংকটের বিষয়টি জানিয়ে প্রতি মাসে মন্ত্রণালয়ে চিঠি লেখা হয়। প্রতিটি সভায় আলোচনা হয়। কিন্তু সমাধান হয় না।

নিয়মিত অনুপস্থিত: বায়োকেমিস্ট্রি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক জসিমউদ্দিন মৃধা ঢাকায় থাকেন। দুই মাসে এক দিন কলেজে আসেন। মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক এ কে এম মুসা ময়মনসিংহ শহরে থাকেন। তিন মাসে এক দিন আসেন। একই বিভাগের মো. আবদুর রহমান তিন বছর আগে দিনাজপুরে বদলি হলেও দীর্ঘদিন ঢাকাতেই ছিলেন। এখন আবার ঢাকায় বদলি হয়েছেন। কার্ডিওলজির অধ্যাপক সৈয়দ আজিজুল হক ঢাকায় রোগী দেখেন। ফার্মাকোলজির অধ্যাপক আবুল হাসনাত ফেরদৌস পরিবার নিয়ে ঢাকায় থাকেন। মাসে চার দিন ক্লাস নিয়ে চলে যান। গাইনি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক রোকেয়া খাতুন রাজশাহীতে থাকেন। রেসপিরেটরি বিভাগের অধ্যাপক আতিকুর রহমান ঢাকায় রোগী দেখেন। কখনো কখনো এক দিন বিমানে করে দিনাজপুরে আসেন, ক্লাস নিয়ে পরদিন বিমানে ফিরে যান।

নাক-কান-গলা (ইএনটি) বিভাগের অধ্যাপক সাবাহ উদ্দিন আহমেদ, সহকারী অধ্যাপক মো. সফিউল্লাহ্ ও এ কে এম সোবহান নিয়মিত কলেজে আসেন না। মেডিসিন বিভাগের রাজিবুল আলম, সহযোগী অধ্যাপক মো. আবদুল লতিফ এবং সহকারী অধ্যাপক আমিরুজ্জামান কলেজে অনিয়মিত। গাইনির সহকারী অধ্যাপক নাসিম জাহান, অর্থোসার্জারি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মশিউর রহমান ও মমিনুল আলম, দন্ত বিভাগের অধ্যাপক খুরশিদুজ্জামান, ইউরোলজি বিভাগে সহকারী অধ্যাপক জাহিদ হাসান, রক্ত পরিসঞ্চালন বিভাগে কর্মরত একমাত্র সহকারী অধ্যাপক এ কে এম শামসুদ্দিন নিয়মিত কলেজে আসেন না। নিউরোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মাহবুবুল আলম কলেজে না এলেও দিনাজপুরে জিয়া হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতালে নিয়মিত রোগী দেখেন।

২২ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে জসিমউদ্দিন মৃধা ও রাজিবুল আলম বলেন, তাঁরা ঢাকায় আছেন। এ কে এম মুসা জানান, তিনি ময়মনসিংহে। জসিমউদ্দিন মৃধা বলেন, পারিবারিক ও প্রশিক্ষণের কারণে তিনি ঢাকায়। রাজিবুল আলম বলেন, বিসিপিএসের পরীক্ষাসংক্রান্ত কারণে তাঁকে মাঝেমধ্যে ঢাকায় থাকতে হয়। মুসা বলেন, সেমিনারে যোগ দিতে ঢাকায় এসেছিলেন। দাঁতে ব্যথার কারণে কর্মক্ষেত্রে না গিয়ে ময়মনসিংহে আছেন। তাঁরা তিনজনই বলেছেন, কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়েই তাঁরা কর্মক্ষেত্রে অনুপস্থিত।

অনুপস্থিতির অভিযোগ সম্পর্কে সাবাহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘আমার উপস্থিতি-অনুপস্থিতি সম্পর্কে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ও মন্ত্রণালয় জানে।’

এ বিষয়ে অধ্যক্ষ হামিদুল হক খন্দকার প্রথম আলোকে বলেন, এর আগে ১২ জনকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কোনো সাড়া মেলেনি। তবে বর্তমানে অনেকেই কলেজে আসছেন বলে তিনি দাবি করেন।

তিনি নিজেও ওই দলে: অধ্যক্ষের ক্যাম্পাসে থাকার বিধান থাকলেও হামিদুল হক খন্দকার রংপুরে নিজ বাড়িতে থাকেন। তিনি অর্থোসার্জারি বিভাগের প্রধান। অভিযোগ আছে, রংপুর থেকে মাসে সাত দিনের বেশি কলেজে আসেন না, ক্লাস নেন না। রংপুর শহরের ধাপ এলাকায় তাঁর বাসা। বাসার পাশে লাইফ লাইন কমিউনিটি হাসপাতাল। সেখানে তিনি নিয়মিত রোগী দেখেন। কলেজের কার (ঢাকা-খ ১২-৮৪৫৭) ও মাইক্রোবাস (ঢাকা মেট্রো-চ ৫৩-৬৪৬৯) তাঁর কাছে রংপুরেই থাকে।

কয়েকজন শিক্ষক প্রথম আলোকে বলেছেন, অধ্যক্ষ হামিদুল হক খন্দকার একাডেমিক কাজ করেন না। তাঁর অনুপস্থিতির সুযোগে অন্য শিক্ষকেরাও মাসের পর মাস অনুপস্থিত থাকছেন।

নিজের অনুপস্থিতির কারণ ব্যাখ্যা করে অধ্যক্ষ প্রথম আলোকে বলেন, কলেজের কাজে বিভিন্ন সময় তাঁকে ঢাকায় যেতে হয়। রংপুরে বাস করা এবং ক্লিনিকে রোগী দেখার কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, ‘আমি হার্টের বাইপাস করা মানুষ। তাই পরিবারের সঙ্গে থাকতে স্বাছন্দ্যবোধ করি।’

দিনাজপুর মেডিকেল কলেজের এই দুরবস্থার বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন দিনাজপুর জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক গোপীনাথ বসাক বলেন, ‘সরেজমিন এবং তথ্যের ভিত্তিতে লিখুন। কোনো মন্তব্য করতে চাই না।’