বিদেশী ঋণ অপব্যবহার রোধ

কঠোর অবস্থানে কেন্দ্রীয় ব্যাংক

বিদেশী ঋণের অপব্যবহার রোধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বিদেশী ঋণ অপব্যবহারের বিষয়টি প্রমাণিত হওয়ার পর বেসরকারি খাতে এ ধরনের ঋণ অনুমোদন ও যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে নিয়মের কড়াকড়ি আরোপ শুরু করেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি।

জানা যায়, বেসরকারি খাতের বেশকিছু প্রতিষ্ঠান বিদেশ থেকে ঋণ এনে শর্ত ভঙ্গ করে অননুমোদিত খাতে ব্যবহার করেছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংককে অবহিত করে বিনিয়োগ বোর্ড। বিনিয়োগ বোর্ডের চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে পর্যবেক্ষণ শুরু করে বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা পরিদর্শন বিভাগ। এতে বড় কয়েকটি গ্রুপের ঋণ অপব্যবহারের তথ্য বেরিয়ে আসে।

বিদেশী ঋণ অপব্যবহার করা প্রতিষ্ঠানের তালিকায় থাকা প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান মেসার্স সিলভান এগ্রিকালচার এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি) থেকে ঋণ নিয়ে শর্ত ভঙ্গ করে অন্য সহযোগী প্রতিষ্ঠানের দায় পরিশোধ করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করে গ্রুপটি। এছাড়া ইন্টারন্যাশনাল ফিন্যান্স করপোরেশন (আইএফসি) ও নেদারল্যান্ডসের এফএমও থেকে ঋণ এনে দেশীয় উত্স থেকে নেয়া ঋণ পরিশোধের প্রমাণ মিলেছে অনন্ত অ্যাপারেলসের বিরুদ্ধে।

এ ঋণের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে না পারায় স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হলে দুঃখ প্রকাশ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে চিঠি দিয়েছে ব্যাংকটি। অনন্ত অ্যাপারেলসের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বিনিয়োগ বোর্ডকে চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এছাড়া এপেক্স গ্রুপের বিরুদ্ধে বিদেশী ঋণ এনে বিনিয়োগ না করে স্থায়ী আমানত (এফডিআর) হিসেবে ব্যাংকে রাখার প্রমাণ মিলেছে। এসব ঘটনায় চিন্তিত হয়ে পড়েছে বেসরকারি খাতে বিদেশী ঋণ অনুমোদন কমিটি। ফলে নতুন করে বিদেশী ঋণ অনুমোদনে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে।

এরই মধ্যে কমিটি নাজ বাংলাদেশ লিমিটেড ও ইপিলিয়ান লিমিটেডের ঋণ অপব্যবহারের দায়ে ইস্টার্ন ব্যাংককে জরিমানা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।  জরিমানা আরোপের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন বলে জানা গেছে। পাশাপাশি ঋণপ্রস্তাব পরিপূর্ণ না হওয়ায় প্রাণ-আরএফএল, বিল্ড ট্রেড, নভোএয়ার, বাংলা ট্র্যাক, সাউথ ইস্ট গার্মেন্ট, প্রিসিজন এনার্জি, জেএম ফ্যাব্রিকস, আর ইন্টারন্যাশনাল ও ডেনিটেক্সের ঋণ অনুমোদন আটকে দিয়েছে এ-সংক্রান্ত কমিটি।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, বিদেশী ঋণ নিয়ে কোনো অনিয়ম সহ্য করা হবে না। যত বড় প্রতিষ্ঠান বা ব্যাংক হোক না কেন, কেউ ছাড় পাবে না। সব বিদেশী ঋণ পরিদর্শন করা হচ্ছে, কেউ অনিয়ম করলে ক্রমান্বয়ে তা শনাক্ত হবে। ঋণ অনুমোদনেও কঠোরতা অবলম্বন করা হচ্ছে।

জানা গেছে, ঋণ অপব্যবহারের বিষয়টি প্রমাণিত হওয়ায় বিদেশী ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে কঠোরতা আরোপ করা হয়েছে। এ ধরনের ঋণ অনুমোদনের জন্য এখন ১৯ ধরনের নথিপত্র জমা দিতে হচ্ছে। এর বাইরেও কিছু শর্ত পূরণ করতে হচ্ছে। এর মধ্যে প্রকল্পে কমপক্ষে ৩০ শতাংশ ইকুইটি বিনিয়োগ করা, সুদের হার সর্বোচ্চ সাড়ে ৪ শতাংশ হওয়া এবং শুধু মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানিতে ঋণ অনুমোদন দেয়া। এছাড়া খেলাপিরা যাতে এ ঋণ না পায়, তা নিশ্চিত করতে সর্বশেষ সিআইবি প্রতিবেদন পরীক্ষা করা হচ্ছে। এসব তথ্য সঠিক প্রমাণিত হওয়ার পরই ঋণ অনুমোদন দেয়া হচ্ছে। আবার অনেক ক্ষেত্রে বৈদেশিক মুদ্রা পরিদর্শন বিভাগের প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে অনুমোদন করা হচ্ছে। ফলে নতুন করে বিদেশী ঋণ নিয়ে অপব্যবহারের আশঙ্কা নেই বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

নব্বইয়ের দশক থেকেই দেশের ব্যবসায়ীরা বিদেশী ঋণ গ্রহণ করে আসছেন। তবে ১৯৯৯ সালে তত্কালীন অর্থ সচিব ড. আকবর আলি খান বাছাই কমিটির মাধ্যমে অনুমোদন ও তদারকি প্রস্তাব দিলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তা অনুমোদন করেন। এ সময়ে গভর্নরকে প্রধান করে বেসরকারি খাতে বিদেশী ঋণ অনুমোদন কমিটি গঠন করা হয়, যাতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়, শিল্প মন্ত্রণালয়, বিনিয়োগ বোর্ড ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একজন করে প্রতিনিধি রাখা হয়। এর পর থেকেই এ কমিটির মাধ্যমে বিদেশী ঋণ অনুমোদন হয়ে আসছে।

বিনিয়োগ বোর্ড থেকে পাওয়া তথ্যমতে, ২০০৯ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত এ কমিটি ৬১৬ কোটি ৪৩ লাখ ডলার বিদেশী ঋণ অনুমোদন করেছে। এর মধ্যে ২০০৯ সালে ৪৭ কোটি, ২০১০ সালে ৩০ কোটি, ২০১১ সালে ৯০ কোটি, ২০১২ সালে ১৪৬ কোটি, ২০১৩ সালে ১১৭ কোটি ও ২০১৪ সালে ১৮৩ কোটি ডলারের ঋণ অনুমোদন করা হয়।