মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার

কাদের মোল্লার চূড়ান্ত রায় আজ

জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লার দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে করা তাঁর ও সরকারপক্ষের আপিলের রায় আজ মঙ্গলবার হতে পারে। এটিই হতে যাচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের দণ্ডের বিরুদ্ধে আপিলের প্রথম রায়।মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ গত ৫ ফেব্রুয়ারি কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছিলেন। এ রায়ের পর তাঁর সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে তরুণ সমাজের ডাকে শাহবাগে গড়ে ওঠে গণজাগরণ মঞ্চ। পরে দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে আপিলের সমান সুযোগ রেখে ১৭ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) সংশোধন বিল, ২০১৩ জাতীয় সংসদে পাস হয়। আগে আইনে সরকারের দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে আপিল করার সুযোগ ছিল না। গত ৩ মার্চ সর্বোচ্চ শাস্তি চেয়ে আপিল করে রাষ্ট্রপক্ষ। আর সাজা থেকে অব্যাহতি চেয়ে পরদিন আপিল করেন কাদের মোল্লা। গত ১ এপ্রিল থেকে শুনানি শুরু হয়।গতকাল সোমবার বিকেলে সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে দেখা যায়, আপিল বিভাগের আজ মঙ্গলবারের কার্যতালিকায় ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার বনাম আবদুল কাদের মোল্লা’ নামে দুটি আপিল রায় ঘোষণার জন্য ১ নম্বর ক্রমিকে রয়েছে।প্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেনের নেতৃত্বাধীন পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চ এ রায় দেবেন। বেঞ্চের বিচারপতিরা হলেন বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা, বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞা, বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন ও বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী।

আসামি ও সরকার—উভয় পক্ষের দুটি আপিলের ওপর ৩৯ কার্যদিবস শুনানি শেষে ২৩ জুলাই আপিল বিভাগ রায় অপেক্ষমাণ (সিএভি) রাখেন। শুনানি শেষ হওয়ার ৫৪ দিনের মাথায় আজ রায় ঘোষিত হতে যাচ্ছে।

ট্রাইব্যুনালের রায়: ট্রাইব্যুনাল-২ কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে আনা মানবতাবিরোধী অপরাধের ছয়টি অভিযোগের মধ্যে মিরপুরের আলুব্দী গ্রামে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ এবং হযরত আলী, তাঁর পরিবারের সদস্যদের হত্যা ও ধর্ষণের দায়ে তাঁকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। এ ছাড়া পল্লব হত্যা, কবি মেহেরুননিসা ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের হত্যা, সাংবাদিক খন্দকার আবু তালেব হত্যার দায়ে তাঁকে ১৫ বছর কারাদণ্ড দেওয়া হয়। আর কেরানীগঞ্জের ঘাটারচর ও ভাওয়াল খানবাড়ি হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ থেকে তাঁকে খালাস দেওয়া হয়।

আপিল ও শুনানি: রায় ঘোষণার ২৭ দিনের মাথায় ছয় অভিযোগের মধ্যে পাঁচটিতে দেওয়া সাজাকে অপর্যাপ্ত দাবি করে সর্বোচ্চ সাজা চেয়ে আপিল করে সরকার। পাশাপাশি একটি অভিযোগ থেকে তাঁকে দেওয়া খালাসের আদেশও বাতিলের আরজি জানানো হয়।

অপর পক্ষে ট্রাইব্যুনালে দেওয়া যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ বাতিল ও সাজা থেকে অব্যাহতি চেয়ে আপিল করেন কাদের মোল্লা।

দুটি প্রশ্ন ও অ্যামিকাস কিউরি: শুনানিতে দুটি গুরুত্বপূর্ণ আইনগত প্রশ্ন ওঠায় জ্যেষ্ঠ সাত আইনজীবীকে অ্যামিকাস কিউরি (আদালতের আইনি সহায়তাকারী) মেনে মতামত নেন আদালত। অ্যামিকাস কিউরিরা হলেন টি এইচ খান, রফিক-উল হক, এম আমীর-উল ইসলাম, মাহমুদুল ইসলাম, রোকনউদ্দিন মাহমুদ, আজমালুল হোসেন কিউসি এবং এ এফ হাসান আরিফ।

প্রশ্ন দুটি হলো, দণ্ড ঘোষণার পর আইনে আনা সংশোধনী কাদের মোল্লার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য কি না এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইন, ১৯৭৩-এর অধীনে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইন প্রযোজ্য হবে কি না।

সংশোধনী কাদের মোল্লার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে বলে মত দেন রফিক-উল হক, এম আমীর-উল ইসলাম, মাহমুদুল ইসলাম, রোকনউদ্দিন মাহমুদ ও আজমালুল হোসেন কিউসি। প্রযোজ্য নয় বলে মত দেন টি এইচ খান এবং এ এফ হাসান আরিফ।

প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইনের প্রয়োগ প্রশ্নে রফিক-উল হকের মত, বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থায় এবং ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইনে প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইন (কাস্টমারি ইন্টারন্যাশনাল ল) প্রয়োগের সুযোগ নেই।

এম আমীর-উল ইসলাম প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইন প্রয়োগের পক্ষে মত দেন। ১৯৭৩ সালের ট্রাইব্যুনাল আইনে প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইনের প্রতিফলন রয়েছে বলে মত দেন রোকনউদ্দিন মাহমুদ।

মাহমুদুল ইসলাম বলেন, সাধারণভাবে প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইন প্রযোজ্য হবে না। একই ধরনের মত দিয়ে আজমালুল হোসেন বলেন, বিচারের ক্ষেত্রে এই আইনের সঙ্গে আন্তর্জাতিক প্রথাগত আইন সাংঘর্ষিক হলে দেশীয় আইনই প্রাধান্য পাবে।

টি এইচ খানের মত ছিল, প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইন প্রযোজ্য হবে। তবে দেশীয় আইনের সঙ্গে আন্তর্জাতিক আইন সাংঘর্ষিক হলে সে ক্ষেত্রে দেশীয় আইন প্রাধান্য পাবে। প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইন প্রযোজ্য হবে বলে মত দেন হাসান আরিফ।

রায় দেখে কর্মসূচি দেবে জামায়াত: আজ রায় কাদের মোল্লার বিপক্ষে গেলে জামায়াত হরতাল কর্মসূচি ঘোষণা করে আবার সহিংস প্রতিক্রিয়া দেখাতে সাংগঠনিকভাবে প্রস্তুতি নিয়েছে বলে জানা গেছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ ও মজলিসে শুরার দুজন সদস্য জানান, রায়ে যদি ট্রাইব্যুনালের আদেশ বহাল রাখা হয়, তাহলে একধরনের প্রতিক্রিয়া দেখানো হবে। যদি এর চেয়ে বড় ধরনের কোনো সাজা হয়, তাহলে সর্বোচ্চ প্রতিক্রিয়া দেখানোর বিষয়ে দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আলোচনা হয়েছে।

তবে, আগের মতো এবার রায় ঘোষণার আগেই হরতাল না ডেকে রায় দেখে কর্মসূচি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দলটি। এ ক্ষেত্রে টানা ৩৬ অথবা ৪৮ ঘণ্টা হরতাল ডাকার কথা বিবেচনায় রাখা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়।

জানতে চাইলে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য ও দলের সাংসদ হামিদুর রহমান আযাদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা ন্যায়বিচারের ব্যাপারে আশাবাদী। যদি সরকার অন্যায় হস্তক্ষেপ করে, সে ক্ষেত্রে জনগণ অবশ্যই ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করবে।’ ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়াটা কেমন হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, রায়ের ওপরই তা নির্ভর করবে।

শাহবাগে ফের গণজাগরণ মঞ্চ: আপিলের রায় হবে জানার পর গতকাল সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে শাহবাগে আবারও অবস্থান নিয়েছে গণজাগরণ মঞ্চ। সাত মাস আগে এই শাহবাগেই জন্ম নিয়েছিল গণজাগরণ মঞ্চ। আজ রায় ঘোষণার আগ পর্যন্ত তরুণেরা সেখানে অবস্থান নিয়ে থাকবেন।

গতকাল সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে মঞ্চের কর্মীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি থেকে মিছিল নিয়ে শাহবাগে গিয়ে অবস্থান নেন।

সন্ধ্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি মিলনায়তনে ‘যুদ্ধাপরাধের বিচার: বিদ্যমান অবস্থা ও করণীয়’ শীর্ষক এক মুক্ত আলোচনায় মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকার সন্ধ্যা থেকে টানা অবস্থানের ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, কাদের মোল্লার সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি নিয়ে তাঁদের আন্দোলন গড়ে উঠেছিল। সেই দাবি যদি বাস্তবায়ন করা না হয়, তাহলে পরবর্তী সময়ে কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।

প্রসঙ্গত, মানবতাবিরোধী অপরাধের ছয়টি মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ইতিমধ্যে রায় ঘোষণা করেছেন। এর মধ্যে পাঁচটি রায়ের বিরুদ্ধে আপিল হয়েছে।