মা ন ব তা বি রো ধী অ প রা ধে র বি চা র

কাদের মোল্লার পূর্ণাঙ্গ রায় হয়নি এক মাসেও

একে একে আটটি মামলার রায় হয়েছে। এর মধ্যে একটি মামলা আপিল বিভাগে চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়েছে। তবে আপিলের পূর্ণাঙ্গ রায় এক মাসেও হয়নি। তাই মেয়াদের শেষ প্রান্তে এসেও একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত কোনো ব্যক্তির সাজা এখনো কার্যকর করা যায়নি।
একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার ছিল আওয়ামী লীগের অন্যতম নির্বাচনী অঙ্গীকার। ২০০৯ সালে সরকার গঠনের প্রায় সোয়া এক বছর পর ট্রাইব্যুনাল গঠন করে বিচারপ্রক্রিয়া শুরু করে বর্তমান আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার। তবে প্রচলিত বিচারপদ্ধতির দীর্ঘসূত্রতা ও রাজনৈতিক কর্মসূচির দিনে আদালতে আসামিপক্ষের আইনজীবীদের অনুপস্থিত থাকা, কিছু ক্ষেত্রে যথাযথ পরিকল্পনার অভাব বিচারপ্রক্রিয়ার স্বভাবিক গতি ব্যাহত করেছে। নানা সীমাবদ্ধতা পার হয়ে বিচারের ফল যখন আসতে শুরু করল, তখন সরকারের সময় শেষের পথে। তাই রায় পেলেও রায়ের কার্যকারিতার বিষয়ে অনিশ্চয়তা নিয়ে অপেক্ষা করছেন বিচারপ্রত্যাশীরা।
মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের দাবিতে সোচ্চার নাগরিক সমাজ রায় কার্যকর করা নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকতে চায় না। তাদের দাবি, যেহেতু মানবতাবিরোধী অপরাধী হিসেবে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে চূড়ান্ত রায় হয়েছে, এখন দ্রুত সাজা কার্যকর করা উচিত। পাশাপাশি সুপ্রিম কোর্টের আপিলে বিচারাধীন অন্য চারটি মামলাও যেন দ্রুত নিষ্পত্তি করা হয়, সে প্রত্যাশা তাদের।
কবে নাগাদ কাদের মোল্লার মামলার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ হতে পারে—জানতে চাইলে অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল ও ট্রাইব্যুনালে রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলিদের প্রধান সমন্বয়ক এম কে রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘বেশির ভাগ বিচারকের রায় লেখা শেষ হয়ে গেছে, যিনি সাজাদানের বিষয়ে ভিন্নমত দিয়েছেন, তাঁর অংশ লেখা হচ্ছে বলেই জানি। তাই আশা করছি, দ্রুত সম্পূর্ণ রায় পাওয়া যাবে।’
বিচারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের বিষয়ে দুটি বড় সিদ্ধান্ত নিতে সরকারের অনেক সময় লেগেছে। প্রথমত, বিচারের জন্য ট্রাইব্যুনাল গঠন করতে এক বছরের বেশি সময় লেগেছে। দ্বিতীয়ত, বিচারপ্রক্রিয়া গতিশীল করতে দ্বিতীয় ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়েছে তারও দুই বছর পর। বিচারপ্রক্রিয়া শুরুর তিন বছরের মাথায় প্রথম রায় আসে এই দ্বিতীয় ট্রাইব্যুনাল থেকে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ ও ২-এ এখন পর্যন্ত দেওয়া আটটি মামলার রায়ের মধ্যে ট্রাইব্যুনাল-২ দিয়েছেন পাঁচটি ও ট্রাইব্যুনাল-১ দিয়েছেন তিনটি মামলার রায়।
বিচার চলাকালে নানা প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখেও পড়তে হয়েছে ট্রাইব্যুনালকে। বিচারপতি নিজামুল হকের স্কাইপ কথোপকথন ফাঁস ও এর পরিপ্রেক্ষিতে ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যানের পদ থেকে তাঁর পদত্যাগ ছিল এ বিচারের জন্য সবচেয়ে বড় ধাক্কা। ছোটখাটো নানা সমালোচনার পাশাপাশি এই প্রতিকূলতা ঠেলে এগিয়ে যাওয়া ছিল ট্রাইব্যুনালের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। সর্বশেষ বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে করা মামলার রায়ের খসড়া ফাঁসের ঘটনা ট্রাইব্যুনালের অবকাঠামো ও সার্বিক উন্নয়নের প্রতি সরকারের মনোযোগকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার ও সাজা কার্যকর চান দেশের বেশির ভাগ মানুষ। সম্প্রতি প্রথম আলোর উদ্যোগে পরিচালিত জনমত জরিপেও দেখা গেছে, দেশের ৮০ শতাংশ মানুষ এ বিচারের পক্ষে।
এক মাসেও আসেনি পূর্ণাঙ্গ রায়: আপিল নিষ্পত্তি হওয়া একমাত্র মামলাটি ছিল আবদুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে। চলতি বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি ট্রাইব্যুনাল-২ কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। গত ১৭ সেপ্টেম্বর ট্রাইব্যুনালের দেওয়া সাজা বাড়িয়ে তাঁকে ফাঁসির আদেশ দেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। আপিল বিভাগের ওই সংক্ষিপ্ত আদেশ ঘোষণার পর এক মাস পার হয়েছে, এখনো পূর্ণাঙ্গ রায় পাওয়া যায়নি। রাষ্ট্রপক্ষ বলছে, এ জন্য সাজা কার্যকর করা যাচ্ছে না।
একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির নির্বাহী সভাপতি শাহরিয়ার কবির বলেন, ‘আমরা চাই, যত দ্রুত সম্ভব পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করে তা কারা কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হোক। কারণ, এখনো কাদের মোল্লার রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা চাওয়ার সুযোগ রয়েছে, যার জন্য পূর্ণাঙ্গ রায়ের অনুলিপি লাগবে।’
তবে কাদের মোল্লার পরিবার জানিয়েছে, পূর্ণাঙ্গ রায় পেলে চলমান আইনি লড়াইয়ের অংশ হিসেবে তারা এ রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন করবে। কিন্তু রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমাভিক্ষা চাইবে না। পরিবারের সদস্যদের এভাবেই নির্দেশনা দিয়েছেন কাদের মোল্লা।
কাদের মোল্লার বড় ছেলে হাসান জামিল গত ২৮ সেপ্টেম্বর প্রথম আলোকে বলেছিলেন, ‘রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা চাওয়ার চিন্তা করতেও আব্বা আমাদের নিষেধ করে দিয়েছেন।…তবে আইনি লড়াইয়ের ধারাবাহিকতায় আমরা রিভিউ আবেদন করব।’
তবে আসামিপক্ষের এই আপিল পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) অধিকার নিয়ে বিতর্ক আছে। তবে পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর আসামিপক্ষ পুনর্বিবেচনার আবেদন করলে তখন সর্বোচ্চ আদালতই বলে দেবেন, পুনর্বিবেচনার আবেদন গ্রহণযোগ্য কি না। তাই সবকিছুই এখন নির্ভর করছে পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের ওপর।
আপিলে বিচারাধীন চার মামলা, যুক্ত হচ্ছে আরও দুটি: কাদের মোল্লার মামলা ছাড়াও জামায়াতের সাবেক আমির গোলাম আযম, নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদ ও সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের মামলা আপিল বিভাগের বিচারাধীন আছে। কয়েক দিনের মধ্যে বিএনপির নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও আবদুল আলীমের মামলার রায়ের বিরুদ্ধেও আপিল করা হবে বলে তাঁদের আইনজীবীরা জানিয়েছেন। তবে জামায়াতের সাবেক নেতা আবুল কালাম আযাদ পলাতক থাকায় তাঁর মামলায় আপিল হয়নি। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন।