নিম্নতম মজুরি বোর্ডের ৫৩০০ টাকার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান, আজ আপিল করবে মালিকপক্ষ

কারখানা বন্ধের হুমকি দিলেন মালিকেরা

নিম্নতম মজুরি বোর্ডের প্রস্তাব আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাখ্যান করে মালিকেরা বলছেন, তাঁরা সাড়ে চার হাজার টাকার বেশি মজুরি দিতে পারবেন না। আর এই দাবি মানা না হলে কারখানা বন্ধের হুমকি দিয়েছেন তাঁরা।
তৈরি পোশাকমালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে এসব কথা বলেন সমিতির সভাপতি আতিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘শিল্পের সামর্থ্য বিবেচনা না করেই বোর্ড আমাদের বাদ দিয়ে পাঁচ হাজার ৩০০ টাকার মজুরি প্রস্তাব করেছে। কিন্তু এটি কোনোভাবেই বাস্তবসম্মত, গ্রহণযোগ্য ও যৌক্তিক নয়।’
সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন নিট পোশাকমালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি সেলিম ওসমান, বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি আব্দুস সালাম মুর্শেদী ও সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন, বর্তমান সহসভাপতি এস এম মান্নান ও শহিদুল্লাহ আজিম, বিকেএমইএর সহসভাপতি মোহাম্মদ হাতেম প্রমুখ। এর আগে দুপুরে মজুরি বিষয়ে বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর সদস্যদের নিয়ে একটি মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়।
মজুরি বোর্ডের সমালোচনা করে সভাপতি বলেন, ‘তাজরীন ও রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর আমরা যখন শিল্পকে নিরাপদ, ঝুঁকিহীন ও কমপ্ল্যায়েন্ট করার মহাসংগ্রামে লিপ্ত, তখনই অযৌক্তিক মজুরি বৃদ্ধির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।’ তিনি বলেন, ‘মজুরি বোর্ড বারবার প্রতিযোগী দেশ চীন ও ভিয়েতনামের উদাহরণ দেয়। কিন্তু চীনে দুই ডলারে একটি ডিম পাওয়া যায়। আর বাংলাদেশে দুই ডলারেই এক ডজন ডিম পাওয়া যায়। তাই চীনে শ্রমিকদের মজুরি আমাদের চেয়ে বেশি হবে, এটাই স্বাভাবিক।’
বিজিএমইএর সভাপতি আতিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা বুধবার (আজ) মজুরি বোর্ডে লিখিতভাবে আপত্তি জানাব। ১৫ দিনের মধ্যে আমাদের দাবি বাস্তবায়ন করা না হলে বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর সদস্যরা তাঁদের কারখানা বন্ধ করে দেবেন।’
মতবিনিময় সভার কথা উল্লেখ করে বিজিএমইএর সভাপতি বলেন, সমিতির সদস্যরা নিম্নতম মজুরি বোর্ডের প্রস্তাব মানতে অপারগতা জানিয়েছেন। সদস্যরা মনে করেন, অন্যায়ভাবে এটি চাপিয়ে দেওয়া হলে ব্যবসা পরিচালনা করা সম্ভব হবে না। সে ক্ষেত্রে তাঁরা ব্যবসা গুটিয়ে নিতে চান। এ জন্য প্রস্থান নীতি (এক্সিট পলিসি) করার দাবি করেছেন সদস্যরা।
আতিকুল ইসলাম আরও বলেন, ‘সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দুই সমিতি শিগগিরই একটি নোটিশ জারি করবে, কে কে ব্যবসা ছাড়তে চান। তারপর আগ্রহী ব্যক্তিরা শ্রমিকসংখ্যাসহ লিখিতভাবে সমিতির কাছে জমা দেবেন।’ সরকারের প্রতি অনুরোধ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের একটি এক্সিট পলিসি দিন। আমরা শ্রমিকদের বকেয়া মজুরি দিয়ে চলে যাব। তবে ব্যাংকের কোনো দায়দেনা আমরা নেব না।’
লিখিত বক্তব্যে সমিতির সভাপতি বলেন, ‘অর্থনীতির সূত্র অনুযায়ী, প্রান্তিক উত্পাদনশীলতা দিয়ে শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণ হয়। কিন্তু এ ক্ষেত্রে তা হয়নি। আমাদের মতে, প্রস্তাবিত মজুরি বাংলাদেশের পোশাকশ্রমিকদের প্রান্তিক উত্পাদনশীলতার সমতুল্যের চেয়ে অনেক বেশি।’
পোশাকশিল্প বর্তমানে প্রতিকূল অবস্থায় আছে দাবি করে আতিকুল ইসলাম বলেন, ‘বিশ্বমন্দার কারণে পোশাকের দাম আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে। চলতি বছরের জানুয়ারি-মার্চ সময়ে আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক আমদানি মূল্য ৩ শতাংশ এবং ইউরোপে ১৩ দশমিক ৩১ শতাংশ কমেছে।’
বিজিএমইএর সভাপতি আরও বলেন, ‘২০১০ সালের পর ব্যবসা পরিচালনায় ব্যয় বেড়েছে ১৩ শতাংশ। ২০০৯-১০ অর্থবছরে যেখানে উেস কর ছিল শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ, বর্তমানে তা বাড়িয়ে করা হয়েছে শূন্য দশমিক ৮০ শতাংশ। ফলে পোশাকশিল্প চাপের মধ্যে আছে।’ সব মিলিয়ে শিল্পের ৩৭ শতাংশ সক্ষমতা কমেছে বলে দাবি করেন তিনি।
আতিকুল ইসলাম চীন, ভিয়েতনাম, পাকিস্তান ও ভারতের উদাহরণ দিয়ে বলেন, ‘এসব দেশের সরকার পোশাকশিল্পকে শক্তিশালী করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছে। আর তখন আমরা হঠকারী আচরণ করছি। শিল্পের মূলে কুঠারাঘাত করতে উদ্যত হয়েছি। যার প্রকৃষ্ট উদাহরণ প্রস্তাবিত মজুরি।’
বিজিএমইএর সভাপতি আরও বলেন, ‘আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই, পোশাকশিল্পের বর্তমান অথনৈতিক অবস্থা মোটেও সুসংগত নয়। এ পরিস্থিতিতে জোর করে প্রস্তাবিত মজুরি চাপিয়ে দেওয়া হলে শিল্পকে ধরে রাখা যাবে না। ৭০ শতাংশ ক্ষুদ্র ও মাঝারি কারখানা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। যদিও দেশের রপ্তানি আয়ে এদের অবদানই বেশি।’
বিকেএমইএর সভাপতি সেলিম ওসমান মজুরি বোর্ডের প্রস্তাবের বিরোধিতা করে বলেন, ‘ওই জিনিস মেনে নেওয়া যায় না, যেটিতে আমরা বেঁচে থাকতে পারব না।’ বিজিএমইএর সভাপতি সবশেষে সরকারের কাছে মজুরি বৃদ্ধির প্রস্তাবটি বিবেচনার পাশাপাশি ব্যাংকঋণের সুদের হার কমিয়ে আনা, গ্যাস-বিদ্যুতের নিশ্চয়তা দেওয়াসহ বেশ কয়েকটি দাবি জানান।