কিছু একটা হবে কেউ বিশ্বাস করে না…আবু আহমেদ

চারদিকে একটা হতাশা ও শঙ্কার আবহ সৃষ্টি হয়েছে। দেশে রাজনৈতিক সংকট এমন অবস্থায় পৌঁছে গেছে যে এখন আর কেউ বিশ্বাস করে না, রাজনীতিবিদরা এ সংকট থেকে দেশ ও জনগণকে মুক্তি দেবে। এ সংকটের জন্য দেশের জনগণ রাজনীতিবিদদেরই দোষ দিচ্ছে, বিশেষ করে যাঁরা সরকারে আছেন, তাঁদের। কারণ এ সংকট তাঁদেরই সৃষ্টি। রাস্তায় হাঁটা ১০ জন মানুষকে জিজ্ঞাসা করলে তাদের আটজনই উত্তর দেবে, ভাই, আমাদের কপালে দুঃখ আছে, বর্তমান সংকট নিরসনের জন্য কোনো রকমের সংলাপই হবে না। আর এ সংকট থেকে উত্তরণও ঘটবে না। অবস্থাটা হলো এমন যে তারা এটাকে তাদের নিয়তি বলে মেনে নিচ্ছে এবং সম্ভাব্য সংকটের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া দেখার জন্য মানসিকভাবে তৈরি হচ্ছে। বাংলাদেশ স্বাধীনতা-উত্তরকালে অনেক রাজনৈতিক সংকটের মধ্যেই ছিল, যার অধিকাংশই নির্বাচন কিভাবে হবে, কোন ধরনের সরকারের অধীনে হবে ইত্যাদিকে কেন্দ্র করে। কিন্তু প্রতিবারই রাজনৈতিক নেতারা একটা সমাধানে পৌঁছার উদ্যোগ নিয়েছিলেন, শুধু বর্তমানের এ সংকট ছাড়া। এ সংকট থেকে উত্তরণ ঘটত যদি একটা অর্থবহ সংলাপের উদ্যোগ নেওয়া হতো। অবশ্য সে সংলাপের উদ্যোগটা নিতে হতো সরকারকেই। সরকারই এ ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছে। এক ধরনের ক্ষমতাকেন্দ্রিক কদর্য রাজনীতি দেশের মানুষকে বর্তমানের অনিশ্চয়তা ও শঙ্কার মধ্যে নিক্ষেপ করেছে। সরকার কেন সংলাপের বদলে একতরফা নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে? জনমনে ভাবনা হলো, কোনো রকমের নির্বাচন হলেও সরকার ক্ষমতায় থাকতে পারবে পুলিশ-র‌্যাবের সহায়তা নিয়ে বিরোধী দলগুলোর সম্ভাব্য বিশৃঙ্খল অবস্থা দমন করে। সরকারপ্রধান কয়েক মাস ধরেই তাঁর প্রতীক নৌকায় ভোট চাওয়া শুরু করেছেন। অথচ বিরোধী দলের নির্বাচনে যাওয়ার কোনো প্রস্তুতিই নেই। নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বলতে যেটা বোঝায়, বর্তমান অবস্থায় বিরোধী দল সেটা পাবে না বলে তারাও মনে করে এবং সুধীসমাজও তাই মনে করে। দলীয় সরকারের অধীনে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আগেও হয়নি, এখনো হবে বলে কেউ মনে করে না। বর্তমান সরকারের ভালো কাজগুলো এ সরকারের আমলে সংঘটিত কেলেঙ্কারির ঢেউয়ে ভেসে গেছে। সরকারের জনসমর্থন তলানিতে। বাংলাদেশে সব সময় যারা সরকারে থাকে, তাদের ভোটের মাধ্যমে জনগণ সরিয়ে দিতে চায়। এ ব্যাপারটা তো প্রমাণিত হয়েছে ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮ সালের নির্বাচনগুলোতে। সেই হটে যাওয়ার মানসিকতা, ক্ষমতায় যারা থাকে তাদের থাকতে হবে। এটাই গণতন্ত্রের দাবি। আজ তো দেশের ৮০ শতাংশ মানুষ নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন চায়। জনগণের এ আকাঙ্ক্ষাকে সরকার যতই অস্বীকার করছে, ততই মানুষের ক্ষোভ আর হতাশা বাড়ছে। ছয় মাস আগেও মানুষ মনে করেছিল, নির্বাচনকালীন সরকার পদ্ধতি নিয়ে একটা কিছু হবে। এখন আর কেউ তা ভাবে না। বাংলাদেশের বিদেশি বন্ধুরা সংলাপের কথা বলতে বলতে হয়রান হয়েছে। এখন তারাও বলা বন্ধ করে দিয়েছে। বাংলাদেশের সামনে কোনো সংকট থাকত না, তা যদি শাসনতন্ত্র থেকে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধানটা সরকার বাতিল করে না দিত। অতি তাড়াহুড়া করে সরকার এ বিধান তুলে দিয়েছে। আর সেদিন থেকেই জনগণের মধ্যে হতাশা ও শঙ্কা তৈরি হওয়া শুরু হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কোনো কিছুর ব্যাপারে আবার সিদ্ধান্ত নিতে চাইলে জনমত জরিপ করে নেয়। জনগণের মতের ভিত্তিতে মৌলিক বিষয়গুলোতে সিদ্ধান্তে পৌঁছা হয়। আর বাংলাদেশের গণতন্ত্রে জনমত জরিপের কোনো ব্যবস্থা নেই। সরকারি উদ্যোগে কোনো জরিপ করা হলেও এক শ্রেণীর রাজনীতিবিদ এর ফল নিয়ে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করেন। বাংলাদেশে গণতন্ত্র টেকসই হতে দেয়নি এক শ্রেণীর রাজনীতিবিদই। গণতন্ত্র বলতে তাঁরা বুঝিয়েছেন জোরজবরদস্তি করে ভোট আদায়। ভোট কেনাবেচাও হয়। কেনাবেচার দৌড়ে সৎ রাজনীতিবিদরা পেছনে পড়তে বাধ্য। আজকে রাজনীতিবিদরা যত পারেন দুর্নীতি করেন। দুর্নীতির অর্থের কিছু অংশ জনগণের জন্য ব্যয় করে তাদের খুশি রাখেন, শুধু তাদের কাছে ভোট চান। সেদিন বাংলাদেশে সোনার মানুষ পাওয়া নিয়ে রাজনীতিবিদদের এক সমাবেশে যোগাযোগমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে সোনার মানুষ পেতে হলে রাজনীতিবিদদের আগে সোনার মানুষ হতে হবে, তাঁদের দুর্নীতিমুক্ত থাকতে হবে। যোগাযোগমন্ত্রী তাঁর এ বক্তব্যের মাধ্যমে দেশের জনগণের ভাবনাই প্রতিফলিত করেছেন। রাজনীতিবিদরা যদি সৎ না হন, তাহলে পুলিশ অফিসার বা অন্য পেশার মানুষ সৎ হবে কেন? তাই আজ বাংলাদেশে অতি কদাচিৎ মেলে- এমন একটা গুণ সততা। সর্বত্র দুর্নীতির প্রসার ঘটেছে। এ সমাজে একটা দুদক গঠন করে দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জেতা যাবে না। নির্বাচন কমিশনের কাজ হলো নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের ব্যবস্থা করা। কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, এ কমিশন কোনো রকমের একটা নির্বাচন অনুষ্ঠান করার জন্যই যেন তৈরি। কার বিরুদ্ধে কে নির্বাচন করবে? এমপিদের পদ খালি হলো না, অথচ সে পদে নির্বাচন হবে? আর নির্বাচন কমিশন কি একটা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড সবার জন্য নিশ্চিত করতে পারবে? সরকার না চাইলে পারবে না। আর দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন কমিশন যতটা স্বাধীন ও নিরপেক্ষ হতে চাইবে, ততটা স্বাধীন ও নিরপেক্ষ হতে পারবে না। সুতরাং কোনো রকমে একটা নির্বাচন অনুষ্ঠানের দিকে এই কমিশনের আগ্রহ দেখানো ঠিক হবে না। অবস্থা হলো, নির্বাচন হলে জনগণ যেখানে খুশি হওয়ার কথা, সেখানে তারা শঙ্কিত। নির্বাচন কমিশন জনগণের অনুভূতিকে আমলে নেওয়ার চেষ্টা করছে? অনেকেই মনে করে, পুরো নির্বাচনপ্রক্রিয়ার সংস্কার প্রয়োজন। সাবেক রাষ্ট্রপতি জেনারেল এরশাদ আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের কথা বলছেন। এ ধরনের প্রতিনিধিত্ব অন্য দেশেও আছে। ওসব পদ্ধতিও বিবেচনার যোগ্যতা রাখে।
লেখক : অর্থনীতিবিদ ও অধ্যাপক
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়