কৌশলে সময়ক্ষেপণ করছে আসামিপক্ষ

একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দেওয়া রায়গুলোর ব্যাপারে সুপ্রিম কোর্টে যেসব আপিল হয়েছে, তাতে আসামিপক্ষ সময়ক্ষেপণের কৌশল নিয়েছে। নানা অজুহাতে তারা আপিলের বিচার বিলম্ব করতে চাইছে। গতকাল বুধবারও ট্রাইব্যুনাল ঘোষিত জামায়াত নেতা কামারুজ্জামানের মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে দায়ের করা আপিল শুনানি কার্যতালিকায় ছিল। কিন্তু হরতালের অজুহাত দেখিয়ে আসামিপক্ষের আইনজীবী আদালতে যাননি। তাই শুনানি হয়নি। এ ছাড়া কামারুজ্জামানের পক্ষে আপিলের সারসংক্ষেপ জমা দেওয়ার কৌশলে সময় নেওয়া হয়েছে। এর আগেও দণ্ডপ্রাপ্ত জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর করা আপিলের সারসংক্ষেপ জমা দিতে একই কৌশল নেওয়া হয়েছে। আসামিপক্ষের সময়ক্ষেপণের এসব অপকৌশলের কারণে আপিল নিষ্পত্তিতে বিলম্ব হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার আপিল নিষ্পত্তির বিষয়ে রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, আগে কাদের মোল্লার মামলায় আপিল হয়েছে। তাই সেই মামলার বিচার আগে শেষ হয়েছে। এরপর সাঈদীর মামলায় শুনানি হবে। পর্যায়ক্রমে কামারুজ্জামান, গোলাম আযম ও মুজাহিদের আপিলের ওপর শুনানি হবে। তিনি বলেন, একটি বেঞ্চে এসব মামলার শুনানি হচ্ছে।
এসব আপিল নিষ্পত্তি হতে কত দিন লাগতে পারে এমন প্রশ্নের জবাবে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, পর্যায়ক্রমে শুনানি হবে। তাতে যত দিন লাগে। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আপিল বিভাগে শুনানি করতে আসামিপক্ষ বিলম্ব করছে। আজ (বুধবার) আপিল বিভাগে কামারুজ্জামানের আপিল কার্যতালিকায় ছিল। কিন্তু হরতালের অজুহাত দেখিয়ে তারা আদালতে না আসায় শুনানি হয়নি। এ কারণে শুনানি কত দিন লাগবে তা বলা যাচ্ছে না।
জামায়াত নেতাদের পক্ষে আইনজীবী অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সময়ক্ষেপণের অভিযোগ সত্য নয়। আপিল বিভাগে এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ মামলায় সারসংক্ষেপ জমা দিতে যে সময় দরকার হয়, তার চেয়ে অনেক কম সময় পাচ্ছি আমরা। তাড়াহুড়ো করে এটা করতে হচ্ছে। ফলে ভুল থেকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।’ তিনি বলেন, হরতালের দিনে সাধারণত সুপ্রিম কোর্টে বিচার কাজ পরিচালিত হয় না। এটা সবারই জানা। তাই হরতালের দিনে আদালতে না যাওয়াকে সময়ক্ষেপণ বলার কোনো সুযোগ নেই।
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লার সাজার বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে করা দুটি আপিল নিষ্পত্তি হয়েছে ১৭ সেপ্টেম্বর, মঙ্গলবার। এখন দেশের সর্বোচ্চ আদালতের সামনে জামায়াতে ইসলামীর আরো চার নেতার ছয়টি আপিল বিচারাধীন। এই ছয় আপিলের মধ্যে সর্বপ্রথম জামায়াতের নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর আপিলের ওপর শুনানি হবে। আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর এ আপিলের ওপর শুনানির দিন ধার্য রয়েছে। সাঈদীর সাজার বিরুদ্ধে দুটি আপিলের শুনানির পর পর্যায়ক্রমে মুহাম্মদ কামারুজ্জামান, গোলাম আযম ও আলী আহসান মুহাম্মাদ মুজাহিদের সাজার বিরুদ্ধে চারটি আপিলের শুনানি হবে বলে জানা গেছে।
প্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেনের নেতৃত্বে আপিল বিভাগের পাঁচ বিচারপতির যে বেঞ্চে আবদুল কাদের মোল্লার আপিলের শুনানি হয়েছে, সেই বেঞ্চেই সাঈদীসহ অপরাপর জামায়াত নেতাদের আপিলের শুনানি হবে। ফলে চার নেতার দাখিল করা আপিলের ওপর পর্যায়ক্রমে এ বেঞ্চে শুনানি হবে। আপিল বিভাগে বর্তমানে প্রায় ১১ হাজার মামলা বিচারাধীন। এসব মামলা বিচারের জন্য দুটি বেঞ্চ রয়েছে। প্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেনের নেতৃত্বে এক নম্বর বেঞ্চ বসছেন এবং বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানার নেতৃত্বে দ্বিতীয় বেঞ্চ বসছেন। এ দুটি বেঞ্চের মধ্যে ১ নম্বর বেঞ্চে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার আপিলের বিচার হচ্ছে।
একাত্তরে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় গণহত্যা, হত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট, ধর্মান্তরকরণ, দেশান্তরসহ মানবতাবিরোধী নানা অপরাধের অভিযোগের বিচার চলছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে। হাইকোর্টের বিচারপতিদের নিয়ে এ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়েছে। দুটি ট্রাইব্যুনাল বিচারকাজ পরিচালনা করছেন। প্রত্যেক ট্রাইব্যুনালে হাইকোর্টের তিনজন করে বিচারপতি রয়েছেন। ২০১০ সালের ২৫ মার্চ প্রথম ট্রাইব্যুনাল এবং গত বছর ২২ মার্চ দ্বিতীয় ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়। এ দুটি ট্রাইব্যুনাল থেকে ইতিমধ্যে ছয়টি মামলায় রায় ঘোষিত হয়েছে। এর মধ্যে ট্রাইব্যুনাল চারটি মামলায় মৃত্যুদণ্ড এবং দুটি মামলায় কারাদণ্ড দিয়েছেন। ট্রাইব্যুনাল থেকে সাঈদী, মুজাহিদ, কামারুজ্জামান ও মাওলানা আবুল কালাম আযাদকে মৃত্যুদণ্ড এবং কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন ও গোলাম আযমকে ৯০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তবে গোলাম আযমের রায়ে বলা হয়, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি কারাবন্দি থাকবেন।
সাজাপ্রাপ্ত এই ছয়জনের মধ্যে পাঁচজন কারাবন্দি। আর আবুল কালাম আযাদ পলাতক। তাঁর অনুপস্থিতিতেই বিচারে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। কারাবন্দি পাঁচজনের মধ্যে গত ৫ ফেব্রুয়ারি ট্রাইব্যুনাল-২ কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। তাঁর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের ছয়টি অভিযোগ ছিল। এর মধ্যে ট্রাইব্যুনাল পাঁচটিতে সাজা ও একটিতে খালাস দেন। এ রায়ের বিরুদ্ধে সরকারপক্ষ ৩ মার্চ একটি ও কাদের মোল্লা ৪ মার্চ পৃথকভাবে আরেকটি আপিল দাখিল করেন। এ দুটি আপিলের ওপর শুনানি শেষে আপিল বিভাগ ছয়টি অভিযোগেই কাদের মোল্লাকে সাজা দিয়েছেন। এর মধ্যে একটি অভিযোগে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এ আপিল শুনানির জন্য প্রস্তুত হওয়ার পর ১ এপ্রিল থেকে শুনানি হয়। এ মামলায় কয়েকটি আইনগত প্রশ্ন দেখা দেওয়ায় অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র সাতজন আইনজীবীর মতামত দেওয়া হয়। ফলে কাদের মোল্লার আপিলের শুনানিতে কিছুটা বেশি সময় লেগেছে। এ মামলায় বিচার গত ২৩ জুলাই রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখা হয়। গত মঙ্গলবার রায় দেওয়া হয়।
এ অবস্থায় আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর সাঈদীর মামলায় শুনানির জন্য দিন ধার্য রয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি সাঈদীকে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে ট্রাইব্যুনাল-১-এর দেওয়া রায়ের বিরুদ্ধে আসামিপক্ষ ও সরকারপক্ষ পৃথক দুটি আপিল করেছে। সাঈদীর বিরুদ্ধে সরকারপক্ষের উত্থাপিত ২০টি অভিযোগের মধ্যে আটটি রাষ্ট্রপক্ষ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়। এই আটটি অভিযোগের মধ্যে দুটি অপরাধের দায়ে সাঈদীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। ছয়টি অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হলেও সেগুলোতে সাজা দেওয়া হয়নি। এ ছাড়া ১২টি অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় সেগুলো থেকে সাঈদীকে খালাস দেওয়া হয়। মৃত্যুদণ্ডের সাজার বিরুদ্ধে সাঈদী ও ১২টি অভিযোগ থেকে খালাস দেওয়ার বিরুদ্ধে সরকারপক্ষ আপিল করে। গত ২৮ মার্চ সাঈদী ও সরকারের পক্ষে এ আপিল করা হয়। এ আপিল এখন শুনানির অপেক্ষায়। প্রথম ২ মে শুনানির দিন ধার্য ছিল। কিন্তু তা হয়নি। গত ১৭ সেপ্টেম্বর শুনানির জন্য ছিল। কিন্তু আসামিপক্ষ সময় চাওয়ায় ২৪ সেপ্টেম্বর দিন ধার্য করা হয়েছে।
এ ছাড়া গত ৯ মে ট্রাইব্যুনাল-২ জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামানকে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে রায় দেন। এ রায়ের বিরুদ্ধে কামারুজ্জামান আপিল করেছেন। সরকার এ মামলায় আপিল করেনি। তাঁর বিরুদ্ধে সাতটি অভিযোগের মধ্যে পাঁচটি অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় দুটিতে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। অন্য তিনটি অপরাধের মধ্যে দুটিতে যাবজ্জীবন ও একটিতে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। অবশিষ্ট দুটি অভিযোগ প্রমাণ করতে না পারায় তা থেকে তাঁকে খালাস দেওয়া হয়। ট্রাইব্যুনালের সাজার বিরুদ্ধে গত ৬ জুন আপিল করেন কামারুজ্জামান। এ আপিলের সারসংক্ষেপ এখনো আসামিপক্ষ জমা দেয়নি। সারসংক্ষেপ জমা দিতে আরো সময় চেয়ে কামারুজ্জামানের আইনজীবীরা আবেদন করেছেন। গতকাল আপিল বিভাগের ১ নম্বর বেঞ্চে এ সারসংক্ষেপ জমা দেওয়ার দিন ছিল। কিন্তু হরতালের কারণে কামারুজ্জামানের আইনজীবীরা হাজির না হওয়ায় পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য হয়নি। সারসংক্ষেপ জমা দেওয়ার পর আপিল শুনানির জন্য প্রস্তুত হবে।
গত ১৫ জুলাই জামায়াতের সাবেক আমির গোলাম আযমের বিরুদ্ধে রায় দেন ট্রাইব্যুনাল-১। রায়ে তাঁকে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের প্রধান ষড়যন্ত্রকারী ও পরিকল্পনাকারী হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তাঁকে ৯০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র, পরিকল্পনা, উসকানি, সহযোগিতা এবং কুমিল্লার ছিরু মিয়াসহ ৩৮ ব্যক্তিকে হত্যা ও নির্যাতনের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় এ সাজা দেন ট্রাইব্যুনাল। রাষ্ট্রপক্ষ তাঁর বিরুদ্ধে পাঁচ ধরনের ৬১টি ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ উত্থাপন করে। এ রায় সরকারপক্ষ বা আসামিপক্ষের কারোরই পছন্দ না হওয়ায় উভয় পক্ষ আপিল করেছে। নিজেকে নির্দোষ দাবি করে খালাস চেয়ে গত ৫ আগস্ট গোলাম আযম এবং তাঁর মৃত্যুদণ্ড চেয়ে ১২ আগস্ট সরকারপক্ষ আপিল দাখিল করেছে। এ আপিল শুনানির জন্য প্রস্তুত হয়নি বলে জানা গেছে।
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদের বিচারে গত ১৭ জুলাই রায় দেয় ট্রাইব্যুনাল-২। তাঁর বিরুদ্ধে আনা সাতটি অভিযোগের মধ্যে পাঁচটি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় তিনটিতে মৃত্যুদণ্ড, একটিতে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও একটিতে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। দুটি অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত না হওয়ায় তাঁকে বেকসুর খালাস দেওয়া হয়। এ রায়ের বিরুদ্ধে শুধু মুজাহিদ আপিল করেছেন গত ১১ আগস্ট। এ আপিলও শুনানির জন্য প্রস্তুত হয়নি।
এ ছাড়া মাওলানা আবুল কালাম আযাদ পলাতক থাকায় তাঁর আপিল করার সুযোগ নেই।