ক্রসফায়ারের তালিকা অনুমোদন করেন তিনি!

সাহাদাত হোসেন পরশ
উচ্চতা পাঁচ ফুট আট ইঞ্চির ওপর। সবসময় দামি শার্ট-প্যান্ট পরেন। কোমরে পিস্তল। আর প্যান্টের সঙ্গে ঝোলানো ভিজিটিং কার্ড। সেখানে লেখা_ ‘আবুল হোসেন। এডিসি-সিআইডি বাংলাদেশ। পুলিশ আইডি নম্বর-৮৫০৪৪০৯১৮২।’ রাজধানীর মুগদার ৩২ বছর বয়সী ইমাম শাহজাদা ভাসানী দীর্ঘদিন ধরেই আবুল হোসেন পরিচয়ে এডিসি হিসেবে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রতারণার বিশাল জাল ফেলেন। চলেন দেহরক্ষী নিয়ে দামি গাড়িতে। ইতিমধ্যেই এডিশনাল এসপি পরিচয়ে রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নিয়েছেন। আর পুলিশ হাসপাতালের নিচুপদের পুলিশ সদস্যরাও তাকে সমীহ করে চলেন। কারা ‘ক্রসফায়ারে’র তালিকাভুক্ত হবে, চূড়ান্তভাবে কোন তালিকা অনুমোদন পাবে_ এমন দায়িত্ব তাকে সরকার দিয়েছে বলে পরিচয় দেন হরহামেশাই। কোথাও বলেন তিনি ইন্টারপোলের বাংলাদেশ প্রতিনিধি হিসেবেও রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ অনেক বিষয় দেখভাল করছেন।
শুধু তাই নয়, পুলিশের গাড়ি নিলামে বিক্রির কথা বলে ইতিমধ্যে দুই ব্যক্তির কাছ থেকে ২০ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। আর কয়েক ব্যক্তির সঙ্গে গাড়ি নিলামের ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে চুক্তি করেছেন। আর বরিশাল সার্কিট হাউসে এসপি পরিচয়েই তিন দফায় ভিআইপি কক্ষ বরাদ্দ নিয়ে থেকেছেন। এ পরিচয় ব্যবহার করে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়পড়ূয়া তরুণীদেরও ফাঁদে ফেলেছেন তিনি। তবে শেষ পর্যন্ত আসল গোয়েন্দা পুলিশের হাতে বন্দি পুলিশ পরিচয় দেওয়া এই বহুরূপী প্রতারক। গতকাল ডিবির ডিসি (দক্ষিণ) কৃষ্ণপদ রায়ের তত্ত্বাবধানে এডিসি ছানোয়ার হোসেন ও এসি মাহমুদা আফরোজ লাকীর নেতৃত্বে একটি বিশেষ টিম মতিঝিল এলাকার ভিক্টোরিয়া ক্লাব থেকে শাহজাদাকে গ্রেফতার করে। ওই সময় তিনি এডিসি হিসেবে তার পরিচয়পত্র ও কোমরে অস্ত্র নিয়ে জুয়া খেলছিলেন।
ডিবির এডিসি ছানোয়ার হোসেন জানান, দুই মাস আগে এমদাদ হোসেন দীপু নামে এক কাপড় ব্যবসায়ীর সঙ্গে এই ভুয়া পুলিশ কর্মকর্তার পরিচয় হয়। ওই সময় তিনি তাকে এডিসি পরিচয় দিয়ে তার নাম আবুল হোসেন কানন বলে জানান। এ সময় আবুল হোসেনের সঙ্গে আরও তিন ব্যক্তি ছিলেন। যাদের তিনি সঙ্গীয় ফোর্স বলে পরিচয় করিয়ে দেন। ওই পরিচয়ের সূত্র ধরেই গত ৫ আগস্ট দীপুকে ফোন করে আবুল জানান, ভারতীয় বিপুল পরিমাণ রেমন্ড কাপড় তারা জব্দ করেছেন। এসব কাপড় সাশ্রয়ী মূল্যে বিক্রি করা হবে। এরপর দীপুর বাসায় তিনি কয়েকদফা যান। কাপড় বিক্রি ও আরেকটি সরকারি গাড়ি নিলামে পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে তার কাছ থেকে ২০ লাখ টাকা নেন। এরপর কয়েকদিন পার হলেও কাপড় ও গাড়ি না পাওয়ায় দীপু তার সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাননি। এ ঘটনায় পর দীপু শাহজাহানপুর থানায় মামলা করেন। মামলা নম্বর- ২৪। মোহাম্মদ সালাউদ্দিন নামে আরও এক ব্যক্তিকে নিলামে পুলিশের মোটরসাইকেল পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে এক লাখ ৩৮ হাজার টাকা নেন। বিশ্বাস ঠিক রাখার জন্য রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতালের ওয়েটিংরুমে ওই টাকা লেনদেন হয়। পরে তার সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেন আবুল। এ ঘটনায় মতিঝিল থানায় মামলা হয়েছে। মামলা নম্বর-৪৬।
গতকাল গ্রেফতারের পর বেরিয়ে আসে আবুলের প্রতারণার ভয়ঙ্কর তথ্য। তার গ্রামের বাড়ি ভোলার বোরহানউদ্দিনে। ২০০৮ সাল থেকে তিনি ২২তম বিসিএসের পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে পরিচয় দিয়ে আসছিলেন। তার প্রকৃত নাম ইমাম শাজহাদা ভাসানী। আগের বিয়ে গোপন করে মুগদায় আরেকটি বিয়ে করেছেন।
ডিবির ডিসি কৃষ্ণপদ রায় সমকালকে জানান, আকুপাংচার করানোর সময় সিআইডির এক পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে তার পরিচয় হয়। এরপর একদিন সিআইডিতে যান শাহজাদা। সেখানে ভিজিটর কার্ড নিয়ে ওই পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে দেখা করেন। ফেরার সময় তিনি কার্ডটি ফেরত দেননি। প্রথমে সিআইডির ভিজিটর কার্ড নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় ঘোরেন। এরপর নিজেই অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের নকল কার্ড তৈরি করেন।
প্রতারক শাহজাদার সঙ্গে আলাপকালে জানান, সিআইডির ভিজিটর কার্ড নিয়ে ঘোরার সময় অনেকে সালাম দিত, সম্মান করত। এরপর এডিসি পদ দিয়ে একটি পরিচয়পত্র তৈরি করি। কেন এমন প্রতারণা করে আসছিলেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আকুপাংচার করে সাত লাখ টাকা জমিয়েছিলাম। তবে কয়েকজনের পাল্লায় পড়ে জুয়া খেলে সব টাকা হারিয়ে ফেলি। এরপর পুলিশ পরিচয়ে কার্ড তৈরি করে টাকা আদায় করা শুরু করি। কীভাবে সার্কিট হাউস বরাদ্দ নিলেন_ এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, প্রথমবার একজন এডিশনাল সেক্রেটারির পরিচয়ে সেখানে যাই। পরের দুই দফা সার্কিট হাউসে বেড়াতে যাওয়ার পর সার্কিট হাউসের লোকজনকে বলি, ‘পুলিশ হিসেবে নিজের পরিচয় দিতে সবসময় ভালো লাগে না। সিআইডিতে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হিসেবে আছি। এরপর থেকে সার্কিট হাউসের নাজির সাহেব খুব খাতির করতেন।’ পিস্তল কীভাবে পেলেন এমন প্রশ্নে তিনি বলেন_ ‘কক্সবাজার থেকে খেলনা পিস্তল কিনেছি। তবে দেখতে আসল পিস্তলের মতো। এরপর আসল পিস্তলের কভার কিনে দিয়েছে রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতালের এক স্টাফ।’ ক্রসফায়ার নিয়ে কি বলতেন এমন প্রশ্নের উত্তরে বলেন_ ‘আমি ক্রসফায়ারে চূড়ান্তভাবে কাদের নাম অনুমোদন দেওয়া হবে এ দায়িত্বে থাকার কথা বলেছি। এও বলেছি, ফাইলে আমার স্বাক্ষর হওয়ার পর ক্রসফায়ার হয়ে থাকে।’
এসি মাহমুদা আফরোজ জানান, ভুয়া পুলিশ কর্মকর্তার কাছে সরকারি বিভিন্ন সংস্থার লোগো ব্যবহার করে চুক্তিপত্র তৈরি ও চালান তৈরির কাগজপত্র পাওয়া গেছে। তার অন্য সহযোগীদেরও গ্রেফতারে অভিযান চলছে।