খুব হলো ইলিশ খাওয়া, এবার থামার পালা

বাজারের সবচেয়ে দামি মাছটি এখন সস্তার কাতারে। মাস তিনেক আগেও এক কেজি ওজনের একটি ইলিশ কিনতে গুনে গুনে তিনটি ৫০০ টাকার নোট দিতে হতো। আর এখন একটি নোট দিলেই হয়, কোনো কোনো সময় ৫০ বা ১০০ টাকা ফেরতও পাওয়া যায়। দেশজুড়ে ইলিশের এত প্রাচুর্য গত কয়েক বছরে দেখা যায়নি। গড়পড়তা মধ্য আয়ের পরিবারে যেখানে একটি ইলিশ কেনাই দুষ্কর ছিল, সেখানে এ বছর হালি ধরে বিক্রি হয়েছে মাছটি। ইলিশ খেতে খেতে অভক্তি এসে গেছে কারো কারো মধ্যে।
তবে এবার ক্ষান্ত দেওয়ার পালা। জেলেদের জাল এড়িয়ে যেসব ‘মা’ মাছ এখনো নদীতে ঘুরে বেড়াচ্ছে তাদের স্বস্তি দেওয়ার সময় এসেছে। আগামী ১৩ থেকে ২৩ অক্টোবর ভরা পূর্ণিমায় দেশের নদীগুলোতে ডিম ছাড়বে ‘মা’ ইলিশ। এ সময় তাদের ধরা একেবারেই নিষিদ্ধ। এমনকি পরিবহন, বিক্রি ও মজুদ করলেও যেতে হবে কারাগারে।
মৎস্য অধিদপ্তর বলছে, এ কদিন মা মাছ ধরা থেকে বিরত থাকলে ও পরবর্তী সময়ে জাটকা না ধরলে আগামী বছরও এমন সস্তায় ইলিশ পাওয়া যাবে। তাই জেলে পরিবার থেকে শুরু করে শহুরে ভোক্তা, সবার দায়িত্ব জাতীয় মাছ ইলিশ রক্ষা করা। অবশ্য সরকার ধরা নিষিদ্ধের ১১ দিন ব্যাপক অভিযান পরিচালনা করবে, যাতে নদীতে অসাধু জেলেরা জাল নিয়ে নামতে না পারে।
একটি বড় ইলিশ একসঙ্গে ২২ লাখ ডিম ছাড়তে পারে। ২০০৩ সালে মৎস্য অধিদপ্তর ১১০০ গ্রাম ওজনের একটি ইলিশে ২২ লাখ ৮৬ হাজার ডিম পেয়েছিল। তবে ছোট মাছে ডিমের পরিমাণ কম থাকে। ফলে মা মাছ ডিম ছাড়ার সুযোগ পেলে ও জাটকা নিধন বন্ধ রাখা গেলে সামনেরবারও বাংলাদেশের নদনদী ইলিশে ভরে ওঠার সুযোগ রয়েছে বলে মনে করে মৎস্য অধিদপ্তর।
মোহনা থেকে নদীর ১২০০ থেকে ১৩০০ কিলোমিটার উজানে ও উপকূল থেকে ২৫০ কিলোমিটার দূরত্ব পর্যন্ত সমুদ্রে ইলিশ পাওয়া যায়। দিনে ইলিশ পাড়ি দিতে পারে ৭১ কিলোমিটার পথ। একসময় বাংলাদেশ নামক ব-দ্বীপের সব নদীতেই কম-বেশি ইলিশ মিলত। এমনকি নদীর সঙ্গে সংযোগ আছে এমন বিল ও হাওরেও চলে যেত ইলিশ। কিন্তু বাছবিচারহীন আহরণের ফলে উৎপাদন কমে যায়। আর সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যায় সাধের এ মাছটি। কিন্তু কয়েক বছর ধরে উৎপাদন আবার বাড়ছে। পরিসংখ্যানে বিভ্রান্তি থাকতে পারে, কিন্তু বাজারে গেলেই বোঝা যায় ইলিশের প্রাচুর্য আবার ফিরেছে।
ঢাকার বাজারে এখন বড় আকারের এক কেজি ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ৫০০ টাকা দরে। সর্বনিম্ন ২৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে ছোট ইলিশ। তবে বেশির ভাগ দোকানেই ইলিশ বিক্রি হয় হালি দরে। সে ক্ষেত্রে বড় আকারের ইলিশ এখন প্রতি হালি দুই হাজার টাকায় কেনা যাচ্ছে। মাঝারি আকারের এক হালি ইলিশ এক হাজার টাকা থেকে দেড় হাজার টাকায় বিকোচ্ছে। বিপরীতে এক কেজি রুই মাছ কিনতে এখন চার শ টাকা লাগছে। টেংরা, শিং, মাগুর, আইড় ইত্যাদি দেশীয় প্রজাতির ‘ক্যাটফিশের’ দাম কেজিপ্রতি ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা।
শুধু বাংলাদেশে নয়; ভারত, মিয়ানমার, ইরান ও কখনো কখনো শ্রীলঙ্কার উপকূলেও ইলিশ ধরা পড়ে। বাংলাদেশের চেয়ে মিয়ানমারের ইলিশ আকারে বড়। বাংলাদেশে বেশির ভাগ পৌনে এক কেজি থেকে এক কেজির কিছু বেশি ওজনের ইলিশ ধরা পড়ে। সেখানে মিয়ানমারে দুই কেজি বা তারও বেশি ওজনের ইলিশ ধরা পড়ে।
ভারতে আবার ইলিশের ওজন খুব বেশি বাড়তে পারে না। ওই দেশের হুগলি নদীর মোহনায় ২৫০-৩০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ ধরা পড়ে। তবে ভারত বা মিয়ানমারের ইলিশের সঙ্গে বাংলাদেশের ইলিশের তুলনার কোনো সুযোগ নেই। স্বাদ, গন্ধ ও রঙের দিক দিয়ে বাংলাদেশের ইলিশ সেরা ও সবচেয়ে জনপ্রিয়। পাশাপাশি সব দেশ মিলিয়ে যে পরিমাণ ইলিশ উৎপাদন হয়, তার অর্ধেকের বেশি হয় বাংলাদেশের জলসীমায়।
বাংলাদেশের পদ্মা নদীর ইলিশ সবচেয়ে স্বাদের। এর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাও আছে। ইলিশ সাগর থেকে নদীতে যত দূর আসে তার শরীর থেকে তত বেশি লবণ ঝরে যেতে থাকে। তাতে স্বাদও বাড়তে থাকে। তবে এখন আর পদ্মায় বেশি ইলিশ মেলে না। বরিশাল বিভাগের নদীগুলোই এখন ইলিশে ভরে থাকে।
উৎপাদন বাড়ছে : মৎস্য অধিদপ্তরের হিসাবে ১৯৮৫-৮৬ অর্থবছরে বাংলাদেশে এক লাখ ৯১ হাজার টন ইলিশ উৎপাদিত হয়েছিল। তখন জনসংখ্যা কম ছিল। ফলে ওই পরিমাণ ইলিশ দিয়ে মানুষের চাহিদা ভালোভাবেই মিটত। ২০০১ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত ইলিশ উৎপাদন তার আগের বছরগুলোর তুলনায় কমে যায়। তখন থেকেই মূলত মানুষের নাগালছাড়া হতে শুরু করে ইলিশ। ২০০২-০৩ অর্থবছরে আগের বছরের চেয়ে ১০ শতাংশ কমে ইলিশের উৎপাদন দাঁড়ায় এক লাখ ৯৯ হাজার টনে। এরপর থেকে ইলিশের উৎপাদন ধীরে ধীরে বাড়ছে। ২০১২-১৩ অর্থবছরে ইলিশ উৎপাদন হয়েছে তিন লাখ ৫১ হাজার টন।
উৎপাদন বাড়ার পাশাপাশি রপ্তানি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ইলিশ আরো সহজলভ্য হয়েছে। গত বছর রোজা থেকে ভারতসহ অন্যান্য দেশে ইলিশ রপ্তানি বন্ধ রেখেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। আর এর সুপারিশ করেছিল ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই। তবে পরে এফবিসিসিআই ইলিশ রপ্তানি চালু করার সুপারিশ করলেও তাতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কান দেয়নি। বাংলাদেশ সরকারের শীর্ষ মহলের ইচ্ছার কারণেই ইলিশ রপ্তানি বন্ধ আছে বলে খবর প্রকাশিত হয়েছিল ভারতের আনন্দবাজার পত্রিকায়। ২০১১-১২ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে অন্যান্য দেশে প্রায় ছয় হাজার ১৭৪ টন ইলিশ রপ্তানি হয়। যার বেশির ভাগ হয়েছিল ভারতে। এখনো সীমান্ত দিয়ে ভারতে ইলিশ পাচার হচ্ছে।
১১ দিন ধরা বন্ধ : আশ্বিন মাসে চাঁদ উঠলে পূর্ণিমার দিনসহ আগে ও পরের পাঁচ দিন ইলিশ মাছ সবচেয়ে বেশি ডিম ছাড়ে। এ সময় বাংলাদেশে আইন দ্বারা ইলিশ ধরা, বিক্রি, পরিবহন ও মজুদ করা নিষিদ্ধ। এ বছর এ সময়টি ১৩ থেকে ২৩ অক্টোবর। এই ১১ দিনে ইলিশ ধরা থেকে জেলেদের বিরত রাখতে অভিযান চলবে বলে জানান মৎস্য অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মাসুদ আরা মমী। তিনি বলেন, সম্প্রতি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী আবদুল লতিফ বিশ্বাসের সভাপতিত্বে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট জেলা-উপজেলা প্রশাসনের মধ্যে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। ওই সভায় ১১ দিন ইলিশ ধরা বন্ধ রাখতে নিবিড় তদারকির সিদ্ধান্ত হয়েছে।
মাসুদ আরা মমী আরো জানান, র‌্যাব, পুলিশ, কোস্টগার্ড ও বিমানবাহিনীর সহায়তায় এ সময় অভিযান চালানো হবে। পাশাপাশি ইলিশ ধরে মজুদ রাখা বন্ধ করতে সংশ্লিষ্ট এলাকার বরফকলগুলো বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ সময় কেউ ইলিশ ধরা, মজুদ, বিক্রি ও পরিবহন করলে তাদের দুই বছর পর্যন্ত সাজার বিধান রয়েছে। এর সঙ্গে রয়েছে জরিমানা। কেউ যাতে আগে থেকে ট্রলার নিয়ে মাছ ধরতে বেরিয়ে না পড়ে সে জন্য সংশ্লিষ্ট এলাকায় মাইকিং করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।