খুলনার সংঘাতমুক্ত রাজনীতি…আব্দুল কাইয়ুম

সোমবার রাত নয়টার দিকে যশোর থেকে খুলনায় ঢুকছি। দুটি বৈশিষ্ট্য মন কেড়ে নিল। রাস্তায় ভিড় বা যানজট নেই। চারদিকে গাছপালা। বাতাস পরিষ্কার। বুক ভরে নিঃশ্বাস নেওয়ার মজাই আলাদা। ঢাকার জীবন যে কতটা বিষময়, এক মুহূর্তেই তা স্পষ্ট হয়ে গেল। দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্যটি সত্যিই অবাক করল আমাকে। একটি এয়ারলাইনসের মিনিবাসে আমাদের সঙ্গে আসছিল এক কিশোরী। ঢাকা থেকে প্লেনে এসেছে। খুলনার মূল শহরে ঢোকার একটু আগে সে নেমে গেল। খুলনার কাছাকাছি এসে পথে পথে অনেকেই তাঁদের গন্তব্যে যাওয়ার জন্য নেমে গেছেন। সেও নামল। হয়তো তার বাসা কাছেই। নির্জন, অন্ধকার। কিন্তু সেই কিশোরীর চোখেমুখে কোনো শঙ্কা নেই। বেশ আত্মপ্রত্যয় নিয়ে বাসের যাত্রীদের হাত নেড়ে বিদায় জানাল।
দেশের বিভিন্ন স্থানে ইভ টিজিংয়ের বাড়াবাড়ি। কিন্তু খুলনায় আমরা দেখলাম, রাতে সেই কিশোরী একা, নির্জন পথে, দৃপ্ত পায়ে এগিয়ে যাচ্ছে বাসার দিকে। ভয়ের লেশমাত্র নেই। সাহসী সেই কিশোরী আমাদের সাহসী করে গেল।
খুলনার নবনির্বাচিত মেয়র আজ আনুষ্ঠানিভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করছেন। এ উপলক্ষে তিনি গতকাল সংবাদ সম্মেলন করেছেন। প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে তিনি তাঁর দৃঢ় সংকল্পের কথা বলেছেন। সংবাদ সম্মেলনের পর আমি তাঁর সঙ্গে কথা বলি। জানতে চাই, আগামী দিনগুলোতে তাঁর সামনে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব কী বলে তিনি মনে করেন। তিনি বলেন, মেয়রের দায়িত্ব সুষ্ঠুভাবে পালনের পাশাপাশি রাজনৈতিক সমঝোতা ও সম্প্রীতি বজায় রাখার ওপর তিনি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন। সংবাদ সম্মেলনে তিনি সব দলের নির্বাচিত কাউন্সিলরদের উপস্থিত থাকার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। সবাইকে নিয়ে চলার চেষ্টা তাঁর আছে। তিনি বলেন, যদিও তিনি একটি রাজনৈতিক দলের নেতা, কিন্তু মেয়র হিসেবে তিনি দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে নিজেকে স্থাপন করতে চান। মেয়র হিসেবে তাঁর রাজনৈতিক দর্শন হলো, সংঘাত নয়, সমঝোতা। তিনি বলেন, তাঁর রাজনৈতিক সংস্কৃতি যথেষ্টভাবে প্রমাণ করে, তিনি এ পথে চলতে দলমত-নির্বিশেষে সবার সহযোগিতা পাবেন। তাঁর এ অবস্থান জাতীয় রাজনীতির জটিল জট ছাড়াতে সাহায্য করতে পারে।
খুলনার মানুষের সবচেয়ে বড় কষ্ট কী? সবাই একবাক্যে বলবেন, পদ্মা সেতু যে হলো না, এর চেয়ে বড় অপ্রাপ্তি আর কী হতে পারে। যদি পদ্মা সেতু হতো, তাহলে ঢাকায় চার-পাঁচ ঘণ্টায় যাওয়া যেত। এখন তো নদীভাঙনের সময়। খুলনার ব্যবসায়ী ও সমাজকর্মী লিয়াকত হোসেনের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা হচ্ছিল। তিনি বলছিলেন, কয়েক দিন আগে জরুরি কাজে ঢাকায় যেতে তাঁর ২৬ ঘণ্টা লেগেছিল। মাওয়া ফেরিতে আটকে ছিলেন।
খুলনার মানুষ ঠিক বুঝতে পারে না, কেন বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে ঝগড়ায় জড়িয়ে পড়তে হলো, যে কারণে পদ্মা সেতু আজ অনিশ্চিত। অভিযুক্ত একজন মন্ত্রীকে আগলে রাখা কেন এত জরুরি ছিল? সাধারণভাবে মানুষ মনে করে, ওই একজনের জন্য বিশ্বব্যাংকের বিরাগভাজন হতে হলো। পদ্মা সেতু বিপদে পড়ল। অথচ সেই মন্ত্রীকে শেষ পর্যন্ত আগের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হলো। কিন্তু তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে।
বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া খুলনার সমাবেশে আসছেন ২৯ সেপ্টেম্বর। তার প্রস্তুতি চলছে। হয়তো তিনি এই পদ্মা সেতু ধরে মানুষের মনের কষ্টের কথা আরও তীব্রভাবে সামনে আনবেন। এর আগে মেয়র নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী পরাজিত হয়েছেন। হয়তো তখনো অন্য অনেক অভিযোগের মধ্যে এই পদ্মা সেতুর কথাটি ছিল। এখনো আছে। এসব প্রশ্নের মুখে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে ভোটের হিসাবে কতটা পরিবর্তন ঘটবে, তা দেখার বিষয়।
এসব প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে আওয়ামী লীগকে। কিন্তু পাঁচ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে পরাজয়ের পর আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের মধ্যেও অনেক প্রশ্ন। অনেক বিভ্রান্তি। অনেক দ্বিধাদ্বন্দ্ব। এসব কাটিয়ে উঠতে তাঁদের চাই সবকিছুর পরিষ্কার ব্যাখ্যা। সবার আগে দরকার দলের ভেতর নেতা-কর্মীদের মধ্যে এক হয়ে, এক ধারায় কাজ করার প্রেরণা।
ঠিক এই মুহূর্তে ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় চলছে পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের বিক্ষোভ। ভাঙচুর, কারখানায় আগুন। শ্রমিকেরা বাঁচার মতো সম্মানজনক মজুরির জন্য লড়ছেন আর পুলিশ তাঁদের ছত্রভঙ্গ করতে লাঠি-কাঁদানে গ্যাসের শেল ব্যবহার করছে।
শ্রমিকদের মজুরি যৌক্তিক হারে বাড়াতে হবে। মালিকপক্ষ যে সামান্য মজুরি বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে, তা শ্রমিকেরা মানবেন কেন? একজন নির্মাণশ্রমিকের মজুরি এখন মাসে দাঁড়ায় প্রায় ১০ হাজার টাকা। আর সেখানে মালিকেরা পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের নিম্নতম মজুরি মাত্র ৬০০ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব করেছেন। এতে তাঁদের মজুরি দাঁড়াবে মাত্র সাড়ে তিন হাজারের একটু বেশি। শ্রমিকেরা চেয়েছেন আট হাজার টাকার সামান্য বেশি।
এ নিয়ে দর-কষাকষি হবে। আগেও হয়েছে। কিন্তু এবার নৌমন্ত্রী নিজেই মাঠে নেমে পরিস্থিতি আরও ঘোলা করেছেন। তিনি শ্রমিকদের দাবি আদায়ের জন্য কারখানা বন্ধ রেখে পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের সমাবেশের আয়োজন করেন। যখন সরকার কারখানায় শৃঙ্খলা রক্ষার কথা বলছে, হরতালে অর্থনীতির কত ক্ষতি হয়, তা সবিস্তারে প্রচার করছে, তখন সরকারের একজন মন্ত্রী শ্রমিকদের দাবি আদায়ের কথা বলে কারখানা বন্ধ করে সমাবেশ ডাকছেন। সেদিনই শ্রমিকদের ভাঙচুর নতুন মাত্রা পেল। এখন মন্ত্রী শ্রমিকদের আশ্বাস দিয়ে বলছেন কারখানায় যেতে। কারখানা খুলে দিতে। কিন্তু মজুরি কত হবে, তার ঠিক নেই। শ্রমিকেরা তা মানবেন কেন?
আসলে নৌমন্ত্রী শ্রমিকদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতে চান। এটা বিপজ্জনক। এতে সরকারের কোনো লাভ হয় না। শ্রমিকেরাও প্রতারিত হন। এই অশুভ পাঁয়তারা বন্ধ করতে হবে। দেশে সমস্যার অন্ত নেই। এর মধ্যে মন্ত্রীরা নিজেরাই যদি নতুন নতুন সংকট সৃষ্টির খেলায় মেতে ওঠেন, দেশের পরিস্থিতি যে আরও খারাপের দিকে যাবে, সরকার তা কবে বুঝবে।
বিএনপি তো অনেক সুবিবেচনার পরিচয় দিচ্ছে। তারা ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করবে। নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকারব্যবস্থা করা হয় কি না, সেটা দেখবে। না হলে ‘দেশ অচল’ করার মতো কর্মসূচির কথা তারা বলছে। এখন সরকারের কার্যকর উদ্যোগ দরকার।
বিএনপি চুপচাপ থাকলেও মাঠে চোরাগোপ্তা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে জামায়াত। এরা বিএনপির ‘স্ট্রাইক ফোর্স’ হিসেবে কয়েক বছর ধরেই কাজ করে আসছে। জোটে তাদের ধরে রাখার জন্য বিএনপি মরিয়া হয়ে চেষ্টা করছে। যুদ্ধাপরাধের বিচারে তাদের নেতাদের সর্বোচ্চ শাস্তির রায়ের বিরুদ্ধে কিছু না বললেও জামায়াতের পিঠে হাত বুলিয়ে চলেছে। ফলে তারা প্রায় প্রতিদিনই গাড়ি ভাঙচুর, আগুন, পুলিশের ওপর হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। কত নিরীহ মানুষ তাদের হামলায় প্রাণ দিল। একাত্তরে এই দলের নেতা-কর্মীরা বাঙালি নিধন করেছে, আর আজ তারা পুলিশ ও নিরীহ মানুষ হত্যা করছে।
দেশের বিভিন্ন এলাকায় যখন অস্থিরতা চলছে, তখন খুলনায় কিন্তু পরিস্থিতি অনেকটা শান্ত। এখানে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে খুব বেশি সংঘাত নেই। একসময় খুলনায় একের পর এক রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড হয়েছে। কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) নেতা সর্বজন শ্রদ্ধেয় রতন সেনকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। তাঁর বসতভিটা দখলের জন্য একটি অপরাধী চক্র ভাড়াটে খুনি দিয়ে তাঁকে হত্যা করেছিল। খুলনায় সর্বমহলে সমাদৃত সাংবাদিক মানিক সাহাকেও স্থানীয় কায়েমি স্বার্থের লোকজন হত্যা করেছিল। তাঁর পেছনে ভাড়াটে খুনি লেলিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এরপর আওয়ামী লীগের নেতা মঞ্জুরুল ইমাম, এস এম এ রব ও সাংবাদিক হুমায়ুন কবীর বালু হত্যার শিকার হয়েছেন। কোনো ঘটনারই সুরাহা আজ পর্যন্ত হয়নি। রাজনৈতিক এসব হত্যাকাণ্ড খুলনার রাজনীতি বিষাক্ত করে তুলেছিল। এখন অনেকটাই শান্ত।
বিভিন্ন রাজনৈতিক দল শান্তিপূর্ণভাবে তাদের কর্মসূচি পালন করছে। খুলনায় বিরোধী দলের হরতালগুলো সাধারণত কোনো উত্তাপ ছড়ায় না। সংঘাত প্রায় হয়ই না। খুলনায় সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে মোটামুটি সুসম্পর্ক রয়েছে। এটা দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও একটি ভালো দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
আব্দুল কাইয়ুম: সাংবাদিক।
quayum@gmail.com