বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদন

খেলাপি ঋণের জালে পাঁচ সরকারি ব্যাংক

দেশের ব্যাংক খাত নিয়ে উদ্বেগজনক তথ্য দিল বাংলাদেশ ব্যাংক। দেখা যাচ্ছে, রাষ্ট্রমালিকানাধীন পাঁচ ব্যাংকেই রয়েছে দেশের মোট খেলাপি ঋণের দুই-তৃতীয়াংশ। এই পাঁচ ব্যাংকেই আছে মোট আমানতের প্রায় ২৫ শতাংশ, অথচ মোট খেলাপি ঋণের প্রায় ৬৩ শতাংশও তাদের দখলে।বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, তহবিল ব্যবস্থাপনায় অদক্ষতা, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ঋণ বিতরণ এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার খাতে দায়বদ্ধ অর্থায়নের কারণে ব্যাংকগুলোর এই উদ্বেগজনক চিত্র।বাংলাদেশ ব্যাংক গতকাল রোববার ২০১২ সালের ডিসেম্বরভিত্তিক আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এই প্রতিবেদনটিতে ব্যাংক খাতের এই চিত্র রয়েছে।সামগ্রিকভাবে দেশের ব্যাংকগুলোর পরিস্থিতি এ রকম যে, যদি দেশের শীর্ষ তিন ঋণগ্রাহক খেলাপিতে পরিণত হয়, তবে ৪১ ব্যাংকের মধ্যে ২৪টি ব্যাংকই বড় ধরনের মূলধন ঘাটতিতে পড়বে। আবার প্রতি ব্যাংকের শীর্ষ ১০ ঋণগ্রহীতা খেলাপি হয়ে গেলে মূলধন পর্যাপ্ততার হার নেমে আসবে সাড়ে ৩ শতাংশে। অথচ মূলধন রাখতে হয় ন্যূনতম ১০ শতাংশ।আর্থিক স্থিতিশীলতার প্রতিবেদনে কোনো ব্যাংকের নাম উল্লেখ করা হয়নি। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকেরই ডিসেম্বরভিত্তিক ঋণ শ্রেণীকরণ ও প্রভিশনিং (নিরাপত্তা সঞ্চিতি) প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাষ্ট্রমালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংক সোনালী, জনতা, অগ্রণী এবং বিশেষায়িত কৃষি ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকেই রয়েছে সর্বাধিক খেলাপি ঋণ। আর ২০১৩ সালের জুনভিত্তিক হিসাবে কৃষি ব্যাংক বাদে বাকি চার ব্যাংকেই খেলাপি ঋণ পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। যোগাযোগ করা হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ প্রথম আলোকে বলেন, সমস্যা সমাধানের পূর্বশর্ত হচ্ছে তাকে স্বীকার করে নেওয়া। তিনি বলেন, মএখন অর্থমন্ত্রী যদি বলেন তিন-চার হাজার কোটি টাকা বড় কিছু নয়, তাহলে সমস্যাকে চাপা দেওয়া হবে। তাতে সমস্যা সৃষ্টি যাঁরা করেন তাঁরা উৎসাহিত হবেন।’

ইব্রাহিম খালেদ আরও বলেন, ত্রুটি স্বীকার করে একটা সংস্কার কর্মসূচির মধ্যে ব্যাংক খাতকে ঢুকতে হবে। দরকার হলে অভ্যন্তরীণ চাপ ঠেকাতে বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় ৯০-৯৫ সময়ের মতো সংস্কার কর্মসূচির দিকে আগাতে হবে। তিনি বলেন, ‘তার আগে রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকগুলোতে সরকার নিয়োগ করা চেয়ারম্যান, পরিচালক ও প্রধান নির্বাহীদের বঙ্গবন্ধুর ভাষায় যাঁদের বলা চলে চাটার দল, তাঁদের ব্যাংক থেকে বহিষ্কার করতে হবে। তা না হলে সংস্কারকাজ আগাবে না।ম

খেলাপি ঋণের ৬৩ শতাংশ পাঁচ ব্যাংকের কাছে কেন্দ্রীভূত হওয়ার পরও বাংলাদেশ ব্যাংক অবশ্য ব্যাংক খাতকে স্থিতিশীল বলছে। প্রতিবেদন উন্মোচন করে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আতিউর রহমান বলেন, ‘মাইক্রো (ব্যাস্টিক) পর্যায়েও আর্থিক খাতে স্থিতিশীলতা আশু কোনো হুমকির মুখে নয়, তবে সব ব্যাংকের অবস্থা সমান সন্তোষজনক পর্যায়ে রয়েছে সে দাবি আমি করব না।’ প্রতিবেদনে সামগ্রিকভাবে বর্তমান আর্থিক ঝুঁকি মধ্যম পর্যায়ে রয়েছে বলে জানানো হয়েছে।

আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদনে আরও কিছু উদ্বেগজনক তথ্য দেওয়া হয়েছে। দেখা গেছে, ২০১২ সালে ব্যাংকগুলো প্রতি ১০০ টাকা সম্পদের বিপরীতে মাত্র ৬০ পয়সা মুনাফা করেছে। অথচ এর আগের বছরে মুনাফা হয়েছিল ১ টাকা ৩০ পয়সা। আবার ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের বিপরীতে মূলধন পর্যাপ্ততার হার দাঁড়িয়েছে ১০ দশমিক ৪৬ শতাংশ। আগের বছর যা ছিল ১১ দশমিক ৩০ শতাংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডিসেম্বর শেষে সামগ্রিক ব্যাংক খাতে ৪২ হাজার ৭২৫ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ রয়েছে। এর মধ্যে রাষ্ট্রীয় মালিকানার তিনটি বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত দুটি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ২৬ হাজার ৮০০ কোটি টাকা, যা মোট খেলাপি ঋণের ৬২ দশমিক ৭০ শতাংশ।

তবে জুন হিসাবে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ৫২ হাজার ৩০৯ কোটি টাকা।

সামগ্রিক চিত্রটি এ রকম: শ্রেণীকৃত ঋণের ৬৩ শতাংশই পাঁচ ব্যাংকের, আর এই শ্রেণীকৃত ঋণের ৬৭ শতাংশ মন্দ বা ক্ষতিজনক মানের। এর অর্থ এসব ঋণ আদায়ের সম্ভাবনা খুবই কম। এই ব্যাংকগুলো সবই সরকারি খাতের। এর মধ্যে তিনটি বাণিজ্যিক ও দুটি বিশেষায়িত ব্যাংক। শ্রেণীকৃত ঋণের ৩৭.৩ শতাংশ বাকি ৪২ ব্যাংকের কাছে।

প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশের ব্যাংক খাতের মোট শ্রেণীকৃত বা খেলাপি ঋণের ৬৬.৭ শতাংশ মন্দ বা ক্ষতিজনক মানের। ১৪.২ শতাংশ সন্দেহজনক এবং ১৯.১ শতাংশ নিম্নমানের।

তবে সামগ্রিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে উল্লেখ না থাকলেও গত প্রায় পাঁচ বছর ধরেই রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর পরিস্থিতি ক্রমশ খারাপ হয়েছে। এর মধ্যে শেষ দুই বছরে সংকট আরও বেড়েছে। তবে ব্যাংকগুলোর মালিক রাষ্ট্র, সেটাই রক্ষাকবচ। ফলে সরকার জনগণের করের টাকা দিয়ে মূলধন জোগান দিয়ে ব্যাংকগুলোকে রক্ষা করে আসছে। যেমন, নতুন করে পাঁচ হাজার কোটি টাকার মূলধন দিচ্ছে সরকার। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রগুলো বলছে, রাষ্ট্র খাতের ব্যাংকগুলোর শাখা দেশজুড়ে বিস্তৃত। ফলে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আমানতকারীর কাছ থেকে ব্যাংকগুলোর তহবিল এসেছে। এই ব্যাংকগুলোর আমানত তাই অনেকখানি ঝুঁকির মুখে। ব্যাংক খাতের ২৫ ভাগের মতো আমানত রয়েছে এই পাঁচ ব্যাংকে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সূত্রগুলো আরও জানায়, দুই বছর ধরে রাষ্ট্র খাতের বেসিক ব্যাংকে অন্তত সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার ভুয়া, জালিয়াতি ও অনিয়মের মাধ্যমে ঋণ বিতরণ হয়েছে। আবার সামগ্রিকভাবে ব্যাংকগুলো হল-মার্ক, বিসমিল্লাহ গ্রুপ ও বড় কয়েকটি জালিয়াতির ঘটনার কারণে অস্থিরতার মধ্যে রয়েছে। তবে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেওয়া কিছু পদক্ষেপের কারণে সামনের দিনে এই পরিস্থিতি থাকবে না বলে আশা করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

ব্যাংকগুলোতে শীর্ষ নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ নূরুল আমিন বলেন, চট্টগ্রামকেন্দ্রিক ১০ থেকে ১৫টি প্রতিষ্ঠান অধিকাংশ ব্যাংকেরই সর্বোচ্চ ঋণগ্রহীতা। আবার তারাই ঋণখেলাপি। ব্যাংক খাতের এই চিত্র হতাশাজনক। একই সঙ্গে খেলাপি ঋণের ৬৩ শতাংশ পাঁচটি ব্যাংকে থাকায় তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

দেশে অর্থনীতিতে কোনো বিপর্যয় ঘটলে ব্যাংকগুলোর সহ্য বা সহনক্ষমতা কতখানি, তা-ও পরীক্ষা করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ব্যাংকিং ভাষায় একে বলে হয় স্ট্রেস টেস্টিং। একটি অর্থনৈতিক মডেল তৈরি করে পরীক্ষাগুলো করা হয়েছে। এসব পরীক্ষা করা হয়েছে ঋণ ঝুঁকি, তারল্য ঝুঁকি, সুদ হার ঝুঁকি, বিনিময় হার ঝুঁকি ও শেয়ারের মূল্য ঝুঁকিকে বিবেচনায় এনে। এতে বলা হচ্ছে, ব্যাংক খাতে মাত্র ৩ শতাংশ খেলাপি ঋণ বাড়লে নতুন করে আরও আটটি ব্যাংকের মূলধন পর্যাপ্ততার হার প্রয়োজনের তুলনায় কমে যাবে।

ব্যাংক-সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক ব্যাসেল কমিটি নির্ধারিত প্রয়োজনীয় মূলধন হচ্ছে, ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের ১০ শতাংশ। বর্তমানে দেশের ৪৭টি ব্যাংকের মধ্যে তিনটি ব্যাংকে প্রয়োজনীয় পর্যাপ্ত মূলধন নেই। আরও তিনটি ব্যাংকের মূলধন ঋণাত্মক অর্থাৎ মূলধন তো নেইই, উপরন্তু বড় লোকসান ও নিরাপত্তা সঞ্চিতির ঘাটতিতে রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নর আতিউর রহমান গতকাল কেন্দ্রীয় ব্যাংকে প্রতিবেদনটির বিভিন্ন দিক উল্লেখ করে সাংবাদিকদের বলেন, আর্থিক খাত স্থিতিশীলতায় রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকসহ সব ব্যাংকে সুশাসন এবং কঠোর অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ বিষয়ে দিকনির্দেশনা দিলেও অনেক ক্ষেত্রে এগুলোর বাস্তবায়ন চিত্র আশাপ্রদ নয়। এ জন্য তিনি ব্যাংকগুলোর পর্ষদ সদস্য ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে আরও দায়িত্ববান হয়ে কাজ করতে বলেছেন।

সামগ্রিক পরিস্থিতির ব্যাখ্যা দিয়ে ডেপুটি গভর্নর এস কে সুর চৌধুরী বলেন, শেয়ারবাজার পরিস্থিতি এবং ঋণ শ্রেণীকরণের নতুন নীতিমালার কারণে ব্যাংকগুলোর মুনাফায় একধরনের নেতিবাচক পরিস্থিতি ছিল। তবে এখন আর ব্যাংকের ঋণ আগের মতো কেন্দ্রীভূত নেই। এ ছাড়া আগে কিছু ক্ষেত্রে অতি উৎসাহী (অ্যাগ্রেসিভ) বিনিয়োগ ছিল। এখন পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন।