খেলার ক্লাবে জুয়া চালাতে ৫৬ রিট

রাজধানীর স্পোর্টিং ক্লাবগুলোতে রাত হলেই বসে জুয়ার আড্ডা। এটি টিকিয়ে রাখতে গত সাড়ে চার বছরে হাইকোর্টে ৫৬টি রিট করেছেন জুয়াড়িরা। শুধু রাজধানীই নয়, বিভিন্ন জেলাতেও অবাধে চলছে জুয়া। পুলিশ ও র‌্যাব সূত্র জানায়, এ বছরের সাত মাসেই রিট হয়েছে ৩৪টি। এগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া আবেদনকারীর ‘আইনানুগ ব্যবসা’য় বাধা বা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না করার জন্য মামলার বিবাদীদের আদেশ দিয়েছেন আদালত।

তবে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম প্রথম আলোকে বলেন, ‘এই রিটগুলোর চূড়ান্ত শুনানি হয়নি। আদালত কিছু সময় দিয়েছেন। আদালতে থাকা আইন কর্মকর্তারা এসব বিষয়ে আপত্তি দেন। তবে হাইকোর্টে যে পরিমাণ মামলা নাকচ হওয়া উচিত, তা তো হচ্ছে না। আদালত অনুমতি দিলে আমরা তো অসহায়।’

বঙ্গীয় প্রকাশ্য জুয়া আইন (১৮৬৭ সালে প্রণীত) অনুযায়ী, যেকোনো ঘর, স্থান বা তাঁবু জুয়ার আসর হিসেবে ব্যবহূত হলে তার মালিক বা রক্ষণাবেক্ষণকারী, জুয়ার ব্যবস্থাপক বা এতে কোনো সাহায্যকারী তিন মাসের কারাদণ্ড বা অনূর্ধ্ব ২০০ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন। এ রকম কোনো ঘরে তাস, পাশা, কাউন্টার বা যেকোনো সরঞ্জামসহ কোনো ব্যক্তিকে ক্রীড়ারত (জুয়ারত) বা উপস্থিত দেখতে পাওয়া গেলে তিনি এক মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড অথবা ১০০ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন। পুলিশ জুয়ার সামগ্রীর খোঁজে যেকোনো সময় (বল প্রয়োগ করে হলেও) তল্লাশি চালাতে পারবে বলেও আইনে উল্লেখ রয়েছে।

তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, হাইকোর্টের আদেশ নিয়ে রাজধানীর ক্লাবগুলোতে বছরের পর বছর ধরে নিপুণ, চড়চড়ি, ডায়েস, ওয়ান-টেন, ওয়ান-এইট, তিন তাস, নয় তাস, রেমি, ফ্ল্যাসসহ বিভিন্ন ধরনের তাস খেলা বা কথিত ‘ইনডোর গেমস’-এর নামে জুয়া খেলা চলছে।

ঢাকার ক্লাবগুলোর যেখানে জুয়া, সেখানেই সরকারি দলের নেতারা। রাজধানীর জুয়ার প্রধান কেন্দ্র মতিঝিল-ফকিরাপুলের জুয়া নিয়ন্ত্রণ করেন যুবলীগের ঢাকা মহানগরের একজন শীর্ষস্থানীয় নেতা।

মতিঝিলের দুটি ক্লাবের তিনজন শীর্ষ ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, খেলাধুলার চর্চার জন্য ঢাকার মহল্লাকেন্দ্রিক গড়ে ওঠা অন্তত ১০টি ক্লাব এখন শুধুই জুয়ার আখড়া। পুরোনো ও বড় ক্লাবগুলোতেও চলছে জুয়ার আসর। এসব ক্লাবে জুয়া নিয়ন্ত্রণ করছেন সরকারি দলের কয়েকজন নেতা। জুয়ার উপার্জনের বেশির ভাগই চলে যাচ্ছে তাঁদের পকেটে। রাতভর জুয়া চালানোর পর পেশাদার প্রতিযোগিতাগুলোতে ক্লাবগুলো ভালো দল নামাতে পারছে না। নেই খেলোয়াড় তৈরির কোনো আয়োজনও।

একটি ক্লাবের শীর্ষ ব্যক্তি বলেন, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে জুয়ার জন্য পৃথক ক্যাসিনো রয়েছে, বড় হোটেল বা চিত্তবিনোদন কেন্দ্রগুলোতে জুয়ার আসর বসে। কিন্তু ক্লাবগুলোতে এ রকম প্রকাশ্য জুয়ার আসর ক্রীড়া অঙ্গনকে কলুষিত করছে। জুয়ার আসর মানেই অপরাধীদের আনাগোনা।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক কর্মকর্তা বলেন, জুয়ার আসরগুলো টিকিয়ে রাখতে এগুলোর আয়োজকেরা পরিকল্পিতভাবে একের পর এক রিট আবেদন করছেন। আদালতের নির্দেশনা থাকার কারণে আসরগুলো বন্ধ করা যাচ্ছে না।

জুয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দুজন প্রথম আলোকে বলেন, জুয়ার আসর পরিচালনা করে ক্লাব ভেদে প্রতিদিন কয়েক লাখ থেকে কয়েক কোটি নগদ টাকা ওঠে। সেই টাকার ভাগ ক্লাব নিয়ন্ত্রণকারী রাজনীতিকদের মাধ্যমে সরকারি দলের কেন্দ্রীয় পর্যায়েও পৌঁছে যায়। তাঁরা সংশ্লিষ্ট থানার পুলিশকে নিয়মিত নির্দিষ্ট অঙ্কের ঘুষ দেন। প্রতি মাসেই থানাগুলোর দায়িত্বপ্রাপ্ত একজন এসে সেই টাকা নিয়ে যান।

যত রিট: জুয়া টিকিয়ে রাখতে রিটকারী ক্লাবগুলোর মধ্যে রয়েছে আরামবাগ ক্লাব, দিলকুশা ক্লাব, ডিটিএস ক্লাব, আজাদ বয়েজ ক্লাব, মুক্তিযোদ্ধা ক্লাব, বিজি প্রেস স্পোর্টস অ্যান্ড রিক্রিয়েশন ক্লাব, ফকিরাপুল ইয়ংম্যান্স ক্লাব, ক্লাব প্যাভিলিয়ন ফকিরাপুল, ব্রাদার্স ইউনিয়ন ক্লাব, ঢাকা ওয়ান্ডারার্স ক্লাব, আরামবাগ ক্রীড়া সংঘ ও বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা পুনর্বাসন সোসাইটি ক্রীড়াচক্র বিমানবন্দর কমান্ড।

রাজধানীর বাইরে রয়েছে বগুড়ার রহমান নাগ্রো ক্রিকেট ক্লাব, চাঁদপুরের মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব, ভাই ভাই স্পোর্টিং ক্লাব, ফ্রিডম ফাইটার (৫ নম্বর গুপ্তি ইউনিয়ন পরিষদ), নোয়াখালীর শহীদ শাহ আলম স্মৃতি সংসদ হলরুম সোনাইমুড়ী, নারায়ণগঞ্জের সানারপাড় বর্ণালী সংসদ, বরিশালের সেতুবন্ধন ক্লাব ও লাইব্রেরি, চট্টগ্রামের মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব ও বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ।

পুলিশ ও র‌্যাব সূত্র জানায়, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর জুয়া টিকিয়ে রাখতে ২০০৯ সালে চারটি রিট আবেদন করে চারটি ক্লাব। এসব রিট আবেদনে বিবাদী করা হয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পুলিশের মহাপরিদর্শক, সংশ্লিষ্ট এলাকার পুলিশ কমিশনার বা পুলিশ সুপার, সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি), সংশ্লিষ্ট এলাকার র‌্যাব ব্যাটালিয়ন ও ডিবির কর্মকর্তাদের। ওই তিন ক্লাবের রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট তিন মাস থেকে এক বছরের জন্য বিবাদীদের যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া আবেদনকারীর ব্যবসায় বাধা বা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না করার জন্য আদেশ দেন।

২০০৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর জুয়া খেলার প্রতিবন্ধকতার ওপর নিষেধাজ্ঞা চেয়ে হাইকোর্টে এক দিনে দুটি রিট করা হয়। রিটগুলো করেন ঢাকা ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের পক্ষে রাশিদুল হক ভূঁইয়া ও আরামবাগ ক্রীড়া সংঘের এ এফ এম শাহাজাদুল ইসলাম। একই বছরের ৮ সেপ্টেম্বর ও ১৮ অক্টোবর আরও দুটি রিট করেন যথাক্রমে চাঁদপুরের ভাই ভাই স্পোর্টিং ক্লাবের সেলিম খান ও ঢাকার তেজগাঁওয়ের বিজি প্রেস স্পোর্টস অ্যান্ড রিক্রিয়েশন ক্লাবের সাইফুল ইসলাম।

২০১০ সালের ২৫ মে একই বিষয় নিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো রিট করেন ঢাকা ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের রাশিদুল হক ভূঁইয়া। এর পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্টের বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দীন চৌধুরী ও দেলওয়ার হোসেইনের বেঞ্চ যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া তিন মাসের জন্য আবেদনকারীর আইনানুগ ব্যবসায় বাধা বা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না করার জন্য বিবাদীদের আদেশ দিয়েছেন। এই রিটে বিবাদী করা হয় স্বরাষ্ট্রসচিব, পুলিশের মহাপরিদর্শক, ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার, র‌্যাব-১০-এর অধিনায়ক, গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ও মতিঝিল থানার ওসিকে। আবেদনকারীর পক্ষে আইনজীবী রোকনউদ্দিন মাহমুদ ও মাসুদ আহমেদ সাঈদ শুনানি করেন।

২০১০ সালের ১১ জুলাই ঢাকার ব্রাদার্স ইউনিয়ন ক্লাবের নুরুল আমিন রুহুল আরেকটি রিট করেন। সেখানেও স্বরাষ্ট্রসচিব, পুলিশের মহাপরিদর্শক, ঢাকার পুলিশ কমিশনার, র‌্যাব-৩-এর অধিনায়ক, মতিঝিল জোনের সহকারী কমিশনার, ডিবি, মতিঝিল থানার ওসি এবং ব্রাদার্স ইউনিয়ন ক্লাবের সাধারণ সম্পাদককে বিবাদী করা হয়। এখানেও বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দীন চৌধুরী ও শেখ মো. জাকির হোসেইনের বেঞ্চ তিন মাসের জন্য যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া আবেদনকারীর আইনানুগ ব্যবসায় বাধা বা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না করার জন্য বিবাদীদের আদেশে দিয়েছেন। রিটকারীর পক্ষে শুনানিতে অংশ নেন এ এম আমিনউদ্দীন ও মুন্সী মনিরুজ্জামান।

এভাবে ওই বছরের ১১ জুলাই ঢাকার ব্রাদার্স ইউনিয়ন ক্লাবের নুরুল আমিন রুহুল, ১৯ জুলাই বরিশালের সেতুবন্ধন ক্লাব ও লাইব্রেরির ফোরকান হাওলাদার, ২৭ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম মোহামেডান স্পোটিং ক্লাবের মনির হোসেন, ৪ অক্টোবর বগুড়ার রহমান নাগ্রো ক্রিকেট ক্লাবের এ কে এম মিঠু, ১১ অক্টোবর চাঁদপুরের ভাই ভাই স্পোর্টিং ক্লাবের পক্ষে দ্বিতীয়বারের মতো ইয়াসিন খান, ১১ নভেম্বর চাঁদপুরের মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের পক্ষে শাহ আলম, ৬ ডিসেম্বর ফকিরাপুল ইয়ংম্যান্স ক্লাব এবং ১৪ ডিসেম্বর চট্টগ্রামের মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ক্রীড়াচক্রের পক্ষে জাফরউল্লাহ একই বিষয় নিয়ে আলাদা রিট আবেদন করেছেন।

২০১১ সালের ১ মার্চ, ১৭ জুলাই ও ২৪ অক্টোবর তিনটি পৃথক রিট হয়েছে। এগুলো করেছেন যথাক্রমে চাঁদপুরের গুপ্তি ইউনিয়ন পরিষদের মুক্তিযোদ্ধাদের নামে তামিম খান, নোয়াখালীর সোনাইমুড়ীর শহীদ শাহ আলম স্মৃতি সংসদের তৌহিদুল ইসলাম ও বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা পুনর্বাসন সোসাইটি ক্রীড়াচক্র বিমানবন্দর কমান্ডের পক্ষে শফিকুল ইসলাম।

পুলিশ ও র‌্যাব সূত্র জানিয়েছে, ২০১২ সালে ছয়টি ও চলতি বছরের সাত মাসে ৩৪টি রিট আবেদন করেছেন জুয়া পরিচালনাকারীরা। সরকারের শেষ সময় হওয়ার কারণে আইনি ভিত্তি পেতে রিটের সংখ্যা বেড়েছে বলে তারা মনে করছে।

এ বিষয়ে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক এ টি এম হাবিবুর রহমান বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য হিসেবে সব সময় আইনের আওতায় কাজ করে থাকি। হাইকোর্ট থেকে কোনো নির্দেশ জারি হলে সেটা প্রতিপালন করা আমাদের জন্য বাধ্যতামূলক।’

এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (জনসংযোগ) মাসুদুর রহমান বলেন, ‘যেসব রিটে আমাদের বিবাদী করা হয়েছে, সেসব ক্ষেত্রে এগুলো বন্ধ করার পক্ষে আমরা আমাদের যুক্তি উপস্থাপন করেছি। এরপর মহামান্য আদালত আদেশ দিয়েছেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের কোনো মন্তব্য নেই।’