গণতন্ত্রের ঠিকাদার…মোহাম্মদ নুরাল হক

বর্তমান বিশ্বে গণতন্ত্রের ঠিকাদার বলতে এককভাবে পশ্চিমা দেশগুলোর নেতৃত্বে আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রকে বোঝায়। ওরা বিভিন্ন রঙের ও ঢঙের খাঁটি গণতন্ত্রের উদ্ভাবক তথা প্রস্তুতকারক। গণতন্ত্রের একক লালনকারীর দাবিদার এবং আজ সারাবিশ্বে গণতন্ত্রের একক রফতানিকারক। গণতন্ত্র রফতানির এই জনহিতকর কাজটি তারা শুরু করেছে আফগানিস্তান, ইরাক ও লিবিয়া দখলের মধ্য দিয়ে। অর্থাৎ আরব বিশ্ব তথা মধ্যপ্রাচ্যে। যে দেশগুলো আবার মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ। কেন আরব বিশ্ব তথা মধ্যপ্রাচ্য? এর পক্ষে-বিপক্ষে শত শত যুক্তি আলোচিত হয়ে আসছে এবং ভবিষ্যতেও আলোচিত হতে পারে। তবে সবচেয়ে বড় কারণটি হলো, যুক্তরাষ্ট্রের একান্ত প্রতিনিধি দেশ ইসরায়েল এই এলাকায় অবস্থিত। ইসরায়েলকে যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক আরব বিশ্ব তথা এই এলাকায় যেনতেনভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত করতেই হবে। সেটিই পশ্চিমাদের মূল লক্ষ্য। ভাবখানা এমন যে, ইসরায়েল ব্যতীত যুক্তরাষ্ট্র শূন্য। আবার যুক্তরাষ্ট্র ব্যতীত ইসরায়েল শূন্য। যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক মধ্যপ্রাচ্যকে গণতন্ত্রীকরণের মূল উদ্দেশ্য হিসেবে যা বোঝা যায় তা হলো, মধ্যপ্রাচ্যকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বন্ধুতে পরিণত করা।
বিষয়টিকে ওরা আবার মধুমাখা ভাষায় নামকরণ করেছে ‘আরব বসন্ত’। এ ব্যাপারে মধ্যপ্রাচ্যসহ বর্তমান বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলোর বন্ধু নির্বাচনের পছন্দ-অপছন্দের বিষয়টি একেবারেই মূল্যহীন, গৌণ এবং যুক্তরাষ্ট্রের কাছে নিতান্তই অপছন্দনীয়। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রকে বন্ধু হিসেবে মানতেই হবে। ৯/১১-এর পর সাবেক প্রেসিডেন্ট বুশ যেমনটি হুঙ্কার দিয়েছিলেন, ‘তুমি আমাদের বন্ধু না হলে, শত্রু নিশ্চিত।’ অর্থাৎ বিশ্বে কেউ নিরপেক্ষ অবস্থানে থাকুক তা যুক্তরাষ্ট্রের পছন্দনীয় নয়। বর্তমানে মার্কিন কংগ্রেস ও ওবামার মধ্যে স্বাস্থ্য বাজেট নিয়ে নজিরবিহীন অচলাবস্থা চলছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে ওবামা কংগ্রেসকে কোনো রাখঢাক ছাড়াই সাবধান করেছেন এই বলে যে, এহেন অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত হলে বহির্বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য ক্ষুণ্ন হবে। আধিপত্যবাদের অদ্ভুত মানসিকতা দীর্ঘায়িত হলে বহির্বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য ক্ষুণ্ন হবে। আধিপত্যবাদের কী অদ্ভুত মানসিকতা, তাই না?
বাংলাদেশেও আমরা গণতন্ত্র গণতন্ত্র খেলা খেলছি স্বাধীনতার অব্যবহিত পর থেকেই। আমাদের দেশে গণতন্ত্র মানে একদিন সারাদেশে জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচন_ ব্যস। পরবর্তী পাঁচ বছরে না জনগণের দায় আছে, না সংসদ সদস্যদের কোনো দায়িত্ব তথা দায়বদ্ধতা আছে। এ যেন সাপ-লুডু খেলার মতো। মই দিয়ে ওপরে উঠতে উঠতে প্রায় সব সরকারের পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হতে না হতেই সবসময়ই সাপের মুখে পড়া। অবশেষে যে তলানি, সেই তলানিতেই আমাদের অবস্থান। এ পর্যন্ত সব সরকারই এই খেলার কর্ণধার হওয়ার দৌড়ে একে অন্যের চেয়ে অগ্রগামী। যদিও সব সরকারই তাদের শাসনামলকে বারংবার গণতন্ত্রের স্বর্ণযুগ বলতে দ্বিধা করে না। আসলে এহেন দাবিটিই অগণতান্ত্রিক ও স্বৈরাচারী। কারণ, স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশে ক্ষমতাসীনরা ক্ষমতার বাইরের সবাইকে সবসময়ই অগণতান্ত্রিক আখ্যায়িত করে এসেছে। অর্থাৎ বাংলাদেশে খাঁটি গণতন্ত্রের ঠিকাদারি হলো শুধু ক্ষমতাসীনদের। ভিন্নমতের সবাই সবসময়ই অগণতান্ত্রিক হিসেবে আখ্যায়িত।
বিশ্বজুড়ে আসল বিষয়টি হলো_ ব্যক্তিস্বার্থ, পারিবারিক স্বার্থ, গোষ্ঠী স্বার্থ ও দলীয় স্বার্থ। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম কিছুই নয়। আর এহেন স্বার্থের মূলে রয়েছে ক্ষমতা কুক্ষিগত করার উদগ্র বাসনা ও ধন-সম্পদের সীমাহীন লালসা। তা না হলে উদার সংস্কৃতিমনা ও উদার গণতন্ত্রের একমাত্র দাবিদারদের দ্বারা বিশ্বজুড়ে একের পর এক মানবতা নির্বিচারে লাঞ্ছিত ও প্রাচীন থেকে প্রাচীনতম সভ্যতাগুলো সমূলে ধ্বংস করা হচ্ছে কেন? উদাহরণের জন্য আমাদের বেশি দূরে যেতে হবে না। কেন হিরোশিমা ও নাগাসাকি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল? সীমাহীন অমানবিক নির্যাতনের শিকার ভিয়েতনাম কেন এখনও তথাকথিত বিশ্ব মানবতাবাদীদের ধিক্কার জানায়? কেন সুদীর্ঘ ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিষাক্ত ক্ষতচিহ্ন ভিয়েতনামিরা আজও বয়ে বেড়াচ্ছে? মিসরে ‘আরব বসন্তের’ ফলাফল এত দ্রুত উবে যায় কেন? কে না জানে, এসবই হলো ক্ষমতা কুক্ষিগত করার নগ্ন প্রচেষ্টা এবং ধন-সম্পদের লালসা। বাংলাদেশও স্বাধীনতার পর থেকে অদ্যাবধি আইনের শাসনের নামে বস্তুত শাসনের আইন দ্বারা নিষ্পেষিত হয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশে প্রায় সব আইনই প্রণীত হয় জনগণকে তথা ভিন্নমতাবলম্বীদের শাসনের জন্য। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য নয়, অর্থাৎ তথাকথিত জনপ্রতিনিধিরা হলো শাসক। আর আমরা সাধারণজনেরা সবসময়ই শাসিত। অথচ গালভরা বুলি হলো, ‘জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস?’ পাঁচ বছর পরপর একটি সাধারণ নির্বাচন। আর নির্বাচনের ফল প্রকাশের পরদিন থেকেই শুরু হয় তথাকথিত মহাক্ষমতাধর জনগণের ক্রমেই ক্ষমতাচ্যুতির পালা। জনগণ তখন পরিণত হয় শাসিত নামক উদ্ভট এক গোষ্ঠীতে। বাংলাদেশের বর্তমান বিশৃঙ্খল রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং চলমান সামাজিক অপব্যবস্থায় এর শেষ কোথায় এবং কখন তা বোধ করি কেউই জানে না।
লেখাটি যখন শেষ করছি তখন একটি অত্যন্ত দুঃখজনক শোক সংবাদ হলো, ফ্রান্স ও যুক্তরাষ্ট্রকে পদানত করা ভিয়েতনামের মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি জেনারেল ভো নগুয়েন গিয়াপ ১০২ বছর বয়সে গত ৪ অক্টোবর হ্যানয়ের একটি সামরিক হাসপাতালে মারা গেছেন। আজ গণতন্ত্রের ঠিকাদারদের উচিত শিক্ষাদানকারী এক সময়ের প্রতিপক্ষ একই সঙ্গে ন্যাংটাপুটো ভিয়েতকংদের জনপ্রিয় নেতা জেনারেল গিয়াপ যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক ইরাক দখলের পরপরই এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে যা বলেছিলেন, আজ তাই বারবার মনে পড়ছে। সাংবাদিকদের প্রশ্নটি ছিল অর্থাৎ ‘এখন দখলকৃত ইরাকে কী ঘটতে যাচ্ছে?’ উত্তরে বয়সের ভারে নুয়ে পড়া সহাস্য জেনারেল গিয়াপ বলেছিলেন, ‘দেশের মানুষের বিরুদ্ধাচরণ করে কেউ কখনোই বিজয়ী হতে পারে না।’ বাংলাদেশে বর্তমান প্রেক্ষাপটে আমাদের নেতা-নেত্রীরা বিষয়টি একবার গভীরভাবে ভেবে দেখবেন কি?

স ব্রিগেডিয়ার মোহাম্মদ নুরাল হক পিএসসি (অবসরপ্রাপ্ত) :পেনশনার
haquenoor@yahoo.com